বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নেয়া কমিয়ে দিয়েছে ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম দেশ জার্মানি, নেদারল্যান্ডস, বেলজিয়াম, যুক্তরাজ্যসহ পশ্চিমা দেশগুলো। বাংলাদেশ ব্যাংকের এ সংক্রান্ত একটি গবেষণা প্রতিবেদনে দেখা গেছে, সম্প্রতি পশ্চিমা এই দেশগুলোতে বাংলাদেশের পোশাক রফতানি কমে গেছে।
কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সম্প্রতি প্রকাশিত এই গবেষণায় দেখা যায়, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে তৈরি পোশাক খাতের রফতানির লক্ষ্যমাত্রাও পূরণ হয়নি। রফতানি প্রবৃদ্ধির লক্ষ্য ছিল ৭ শতাংশ। সেখানে প্রবৃদ্ধি হয়েছে ৬ দশমিক ৬ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চের তুলনায় এপ্রিল-জুন প্রান্তিকে ওভেন গার্মেন্ট পণ্য রফতানি কমে গেছে। এ পণ্যটি রফতানি হয়েছে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৬ দশমিক ১৭ শতাংশ কম। এদিকে নিটওয়্যার গার্মেন্টস পণ্যেও লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে ৭ শতাংশ কম রফতানি হয়েছে।
গবেষণা পত্রের তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, চলতি বছরের জানুয়ারি থেকে মার্চ পর্যন্ত সময়ে জার্মানিতে তৈরি পোশাক রফতানি করে ১১২ কোটি ৩২ লাখ ডলার আয় হলেও এপ্রিল থেকে জুনে রফতানি আয় হয়েছে ১০৭ কোটি ডলার। অর্থাৎ তিন মাসে জার্মানিতে রফতানি আয়ের প্রবৃদ্ধি কমেছে চার দশমিক ১৯ শতাংশ। একইভাবে তিন মাসে নেদারল্যান্ডসে রফতানি প্রবৃদ্ধি কমেছে ১২ দশমিক ৬২ শতাংশ। জানুয়ারি-মার্চ মাসে নেদারল্যান্ডসে রফতানি হয়েছিল ১৭ কোটি ২৮ লাখ ডলারের তৈরি পোশাক। কিন্তু এপ্রিল-জুনে এসে রফতানি কমে দাঁড়িয়েছে ১৫ কোটিতে। বেলজিয়ামে প্রবৃদ্ধি কমেছে ৩ দশমিক ৬৯ শতাংশ। এছাড়া রফতানির ১ শতাংশও প্রবৃদ্ধি হয়নি যুক্তরাজ্যে। এর বাইরে অন্যান্য দেশে রফতানি কমেছে ৩ দশমিক ৭১ শতাংশ।
এ বিষয়ে বিজিএমইএর সাবেক প্রেসিডেন্ট আবদুস সালাম মুর্শেদী বলেন, ইউরোপীয় ইউনিয়নের দেশগুলোতে তৈরি পোশাক রফতানি কমলেও আতংকিত হওয়ার কিছু নেই। তিনি বলেন, জার্মানি ইউরোপীয় ইউনিয়নের অন্যতম শক্তিশালী দেশ হলেও তাদের ক্রয় ক্ষমতা কমে যাওয়ার কারণে বাংলাদেশের তৈরি পোশাক নেয়া কমিয়ে দিয়েছে। তবে সম্প্রতি বিদেশী হত্যাকাণ্ডের কারণে এ খাত অনেকটাই চাপের মুখে পড়েছে বলে মন্তব্য করেন তিনি।
প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত অর্থবছরে নিটওয়্যার ও ওভেন মিলে পোশাক শিল্পে রফতানি আয়ের লক্ষ্যমাত্রা ছিল ২ হাজার ৬৮৯ কোটি ৭২ লাখ ২০ হাজার ডলার। এর বিপরীতে আয় হয়েছে ২ হাজার ৫৪৯ কোটি ১৪ লাখ ডলার। নিট ও ওভেন খাত মিলে লক্ষ্যমাত্রার চেয়ে আয় কম হয়েছে ১৪০ কোটি ৫৮ লাখ ২০ হাজার ডলার। টাকার অঙ্কে যা ১০ হাজার ৯৬৫ কোটি ৩৯ লাখ ৬০ হাজার টাকা (১ ডলার ৭৮ টাকা হিসাবে)। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বাংলাদেশের মোট রফতানি আয়ের ৮১ দশমিক ৬৪ শতাংশই এসেছে তৈরি পোশাক খাত থেকে। চলতি বছরের এপ্রিল থেকে জুন পর্যন্ত সময়ে এ খাতে রফতানি প্রবৃদ্ধি হয়েছে মাত্র ৪ শতাংশ।
ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, ২০১২-১৩ অর্থবছরে দেশে তৈরি পোশাকের কারখানা ছিল ৫ হাজার ৬০০টি। ২০১৩-১৪ অর্থবছরে ১৩৭৮টি কারখানা বন্ধ হয়ে দাঁড়ায় ৪২২২টিতে। আর ২০১৪-১৫ অর্থবছরে ৭৪টি নতুন কারখানা যোগ হয়ে বর্তমানে ৪ হাজার ২৯৬টি কারাখানা চালু আছে। এতে আরও বলা হয়েছে, ৪ বছর ধরে তৈরি পোশাক খাতে ৪০ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও শ্রমিক কাজ করছে।
এদিকে বিদেশী দুই নাগরিকের হত্যাকাণ্ডের সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচারের দাবিতে বিদেশী ক্রেতারা তৈরি পোশাক শিল্প মালিকদের ওপর চাপ প্রয়োগ করতে শুরু করেছেন। এ ঘটনায় শিল্প মালিকরা একদিকে আতংকিত হয়ে পড়ছেন, অন্যদিকে রফতানি আদেশ বাতিল ও ক্রেতা হারানোর আশংকায়ও ভুগছেন তারা। ইতিমধ্যে অনেক বিদেশী ক্রেতা তাদের নির্ধারিত সফর বাতিল করছেন। জানা গেছে, নেদারল্যান্ডসের ক্রেতা প্রতিষ্ঠান সিঅ্যান্ডএর সদর দফতর জার্মানিতে। পোশাক ক্রেতা এ প্রতিষ্ঠানটির এনভায়রনমেন্টাল ম্যানেজমেন্টের ইউনিট লিডার অ্যাডাম ব্রেনানের বাংলাদেশ সফরের কথা ছিল আগামী ১৫ অক্টোবর। কিন্তু দুজন বিদেশী নাগরিক হত্যাকাণ্ডের পর নির্ধারিত সফর তিনি বাতিল করেছেন।
একইভাবে যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক বিশ্বখ্যাত লিভাইস ব্র্যান্ডের দুই ক্রেতা প্রতিনিধির বাংলাদেশে আসার কথা ছিল ৫ অক্টোবর। এর মধ্যে একজনের আসার কথা ছিল যুক্তরাষ্ট্র থেকে ও অন্যজনের নয়াদিল্লি থেকে। দুবাই পর্যন্ত এসে ফিরে গেছেন যুক্তরাষ্ট্র থেকে আসা প্রতিনিধি। নয়াদিল্লি থেকে যার আসার কথা ছিল তিনিও সফর বাতিল করেছেন।
এ প্রসঙ্গে বিকেএমইএর সাবেক প্রথম সহসভাপতি মোহাম্মদ হাতেম বলেন, এমনিতেই পোশাক খাতে রফতানি কমে যাচ্ছে। তার ওপর নিরাপত্তার ইস্যুতে অনেক ক্রেতা বাংলাদেশে আসতে চাইছেন না। এটা মোটেও ভালো লক্ষণ নয়।


