নোবেল পুরস্কার দেয়ার মওসুম চলছে। সংবাদমাধ্যমে বেশ গুরুত্ব দিয়ে পুরস্কার বিজয়ীদের কথা বলা হচ্ছে। বিশ্বের সেরা পুরস্কার নিয়ে আলোচনা হবে, এটা খুবই স্বাভাবিক ব্যাপার। এই পুরস্কার সাধারণভাবে অত্যন্ত ভালো একটি কাজ। তবে শুরু থেকেই এ নিয়ে নানা প্রশ্ন ছিল। কাদের দেওয়া হচ্ছে এই পুরস্কার, তা-ও একটি বড় প্রশ্ন। সমসাময়িককালের অনেক নোবেল বিজয়ীদের দিকে তাকালে বিষয়টি পরিষ্কার হয়ে যাবে। শুরু থেকেই নোবেল পুরস্কারের সাথে রাজনীতিসহ বিভিন্ন স্বার্থ আষ্টেপৃষ্ঠে বাঁধা পড়ে আছে।
১৯০১ সালে প্রথম নোবেল সাহিত্য পুরস্কারটি লিও টলস্টয় পাবেন বলে ব্যাপকভাবে ধারণা করা হচ্ছিল। কিন্তু তা দেয়া হয় ফ্রান্সের কবি সালি প্রুধোমকে, যিনি তার নিজ দেশেই ছিলেন অখ্যাত। এতে ব্যাপক সমালোচনা হয় এবং ১৯০২ সালে সুইডেনের একটি পত্রিকায় সমালোচনা করে বলা হয়, ‘একাডেমির অধিকাংশ সদস্য অসৎ কসরতবাজ ও শখের সাহিত্যিক। তারা ছড়াকে কবিতা হিসেবে গণ্য করেন।’ তাছাড়া শান্তি পুরস্কারের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক দিকটি বিশেষভাবে বিবেচনা করা হয়। নেলসন ম্যান্ডেলা ২৭টি বছর কারাগারে ছিলেন বর্ণবাদী আচরণের প্রতিবাদ করতে যেয়ে। তখন কিন্তু তাকে নোবেল পুরস্কার দেওয়া হয়নি। যখন তিনি সাবেক বর্ণবাদী শ্বেতাঙ্গ শাসক এফ.ডব্লিউ.ডি-ক্লার্কের সাথে ক্ষমতা ভাগাভাগি করলেন, তখন তাকে উক্ত পুরস্কার দেওয়া হলো। আবার যুক্তরাষ্ট্রের হেনরি কিসিঞ্জার (ভিয়েতনামে, ১৯৭৩ সালে পুরস্কার লাভ), ইসরায়েলের মেনাহেম বেগিনের (ফিলিস্তিনে, ১৯৭৮ সালে পুরস্কার লাভ) মতো নৃশংস গণহত্যার সাথে সরাসরি সম্পৃক্তদেরও নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয়েছে।
আবার বিশ্ব সাহিত্যের দিকপাল হিসেবে পরিচিত লিউ টলস্টয় (১৯০১ সালে তাকে বঞ্চিত করা হলেও ১৯০৫ সালে ‘গ্রেট সিন’ এর জন্য পুরস্কারটি পেতে যাচ্ছিলেন টলস্টয়, তবে তিনি নিজেই আগেভাগেই এর বিরুদ্ধে অভিমত প্রকাশ করেছিলেন), অন্তন চেখভ, ম্যাক্সিম গোর্কি, দস্তয়ভস্কি, মার্ক টোয়েন, ল স্যুন, ইবসেন, স্ট্রিন্ডবার্গ, ইকবাল, নজরুল প্রভৃতি লেখক নোবেল পুরস্কার পাননি। তারা পুরস্কার পেলে পুরস্কারটির মর্যাদাই বাড়তো। কালের কষ্টিপাথরে তারা কালজয়ী লেখক।
অন্যদিকে ১৯০৭ সালে রুডিয়ার্ড কিপলিং পান নোবেল সাহিত্য পুরস্কার।
তিনি তার জঙ্গল বুকে আদিবাসীদের দেখিয়েছেন মানবেতর প্রাণী হিসেবে। ১৯১৩ সালের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের নোবেল পুরস্কার পাওয়া একটি ব্যতিক্রমই ছিল। শুধু উপমহাদেশের নয়, এশিয়ার প্রথম লেখক হিসেবেও তিনি উক্ত পুরস্কার পেয়েছিলেন। তার ইংরেজিতে অনূদিত তার গীতাঞ্জলীর ভূমিকা লিখে দিয়েছিলেন আইরিশ কবি ইয়েটস। একটি সমীকরণ এখানে অনেকেই দেখে থাকেন। ১৯১১ সালে বঙ্গভঙ্গ রদের ঘোষণা দিতে ইংল্যান্ড থেকে সম্রাট আসলে রবীন্দ্রনাথ বৃটিশ-রাজের প্রশংসা করে কবিতা রচনা করেছিলেন। পঞ্চম জর্জকে তিনি ‘জনগণ মন অধিনায়ক জয় হে’ বলে অভিহিত করেছিলেন। পরে এই গানটিই ভারতের জাতীয় সঙ্গীত হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করে। তার দুবছরের মধ্যেই তিনি নোবেল পুরস্কারটি পেয়ে গেলেন। অবশ্য কবি হিসেবে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মর্যাদা খাটো করা যায় না কোন মতেই।
ভারতীয় বংশোদ্ভূত ভিএস নাইপলও নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। তার বিষয়বস্তুও ছিল মুসলিম বিদ্বেষ। মিসরের নাগিব মাহফুজ নিজের দেশেই বেশ বিতর্কিত। নোবের পুরস্কার পাওয়া বিশ্ব রাজনীতির বাইরের কোনো ঘটনা নয়। তাছাড়া পশ্চিমাদের পছন্দীয় কাজ করতে পারলে নোবেল পুরস্কার সহজেই পাওয়া যেতে পারে। নাইপলের নোবেল পাওয়ার ঘটনা সেটাই নতুন করে প্রমাণ করেছে। বলা হয়ে থাকে, তিনি মুসলিম এবং প্রাচ্য বিদ্বেষ সংক্রান্ত ‘নোবেল পাওয়ার সহজপন্থা’ অনুসরণ করেই পুরস্কারটি পেয়েছেন। রাশিয়ার কয়েকজন লেখকের এই পুরস্কারটি পাওয়ায় প্রশ্নটি আরো বড় করে দেখা দেয়। ইভান বুনিন, বোরিস পস্টারনাক, মিখাইল শলোকভ, আলেক্সান্ডার সোলঝেনিৎসিন, যোশেফ ব্রডস্কি-যারা সমাজতান্ত্রিক আমলে নোবেল পুরস্কারটি পেয়েছেন, তারা সবাই বিতর্কিত। তারা হয় রাশিয়া থেকে বিতাড়িত কিংবা কমিউনিজমের বিরুদ্ধে প্রচ- রকমের সরব ছিলেন। ইভান বুনিন রাশিয়ার এক জমিদার পরিবারে জন্মগ্রহণ করলেও তিনি ‘মেমোরিস এন্ড পোট্রের্ট’ গ্রন্থে রুশ বিপ্লবের বিরুদ্ধে লিখেছেন। তিনি রুশ বিপ্লবের ভয়াবহতা দেখেই নাকি দেশ ত্যাগ করেছিলেন।
১৯৯৪ সালে ফিলিস্তিনি নেতা ইয়াসির আরাফাতকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করা হয় ইসরাইলি প্রধানমন্ত্রী আইজ্যাক রবিন ও পররাষ্ট্রমন্ত্রী শিমোন পেরেসের সাথে। খবরে প্রকাশ পুরস্কারটি প্রথমে প্রদান করা হচ্ছিল রবিন ও আরাফাতকে। কিন্ত এতে ইহুদি মহল ক্ষেপে যায়। এমনকি নোবেল শান্তি পুরস্কার কমিটির এক নরওয়েজীয় আরাফাতকে পুরস্কৃত করার প্রতিবাদে পদত্যাগ পর্যন্ত করেন। ফলে পেরেসকে অন্তুর্ভূক্তি করা হয়। কিন্তু আরাফাতকে কিভাবে দেওয়া হয়েছিল পুরস্কারটি? তিনি প্রথম ফিলিস্তিনি নেতা হিসেবে ইসরায়েলকে স্বীকার করে নিয়েছিলেন। ফিলিস্তিনিদের জমি ইহুদিদের হাতে তুলে দেওয়ার পুরস্কার ছিল এটি।
২০০৩ সালে ইরানের শিরিন ইবাদির শান্তি পুরস্কার প্রাপ্তি ছিল প্রায় সবার কাছেই অপ্রত্যাশিত ঘটনা। প্রথম মুসলিম মহিলা হিসেবে তিনি এই পুরস্কারটি পান। নোবেল শান্তি পুরস্কার জয়ী মহিলা হিসেবে তিনি ছিলেন ১১তম। আর আফ্রিকার প্রথম মহিলা হিসেবে শান্তি পুরস্কার পান ওয়ানগারি মাথাই। সার্বিকভাবে মাদাম কুরি থেকে শুরু করে এ পর্যন্ত (২০০৫) ৩৩জন মহিলা নোবেল পুরস্কার পেয়েছেন। ২০০৩ সালের নোবেল পুরস্কার পাওয়ার সবচেয়ে বড় দাবিদার ছিলেন পোপ জন পল দ্বিতীয় এবং চেক রাষ্ট্রনায়ক ভ্যাকলাভ হেভেল। পোপ গত ২৫ বছর ধরে প্রত্যক্ষ এবং পরোক্ষভাবে পশ্চিমা স্বার্থে কাজ করছিলেন। তার জীবনও ঘনিয়ে আসছিলো। তাই শেষ পুরস্কার হিসেবে তিনি নোবেল পাবেন বলে আশা করা হচ্ছিল। অন্যদিকে হেভেল কমিউনিজমের বিরুদ্ধে নিরন্তর সংগ্রাম করেছিলেন।
কিন্তু শিরিন ইবাদিকে এমন এক সময়ে পুরস্কারটি দেওয়া হলো, যখন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র আফগানিস্তান ও ইরাকের মতো ইরানের উপরও হামলার পায়তারা করছিল, পারমাণবিক প্রযুক্তি নিয়ে নানা চক্রান্ত চলছিল। এমতাবস্থায় ইরানে এক বিশেষ প্রেক্ষাপট তৈরির জন্যই তাকে এই পুরস্কার দেওয়া হয়েছে বলে ধারণা করা হয়। ইরানে গণতন্ত্র এবং মানবাধিকার বিকাশে প্রচেষ্টা চালানোর জন্য তাকে এই পুরস্কার দেয়া হয়েছে বলে স্বয়ং নোবেল কমিটি জানিয়েছে।
রাশিয়ার ভিন্নমতালম্বী নেতা আন্দ্রে শাখারভ (১৯৭৫), পোলিশ সলিডারিটি আন্দোলন নেতা লেস ওয়ালেসা (১৯৮৩) পুরস্কারটি পেয়েছেন কমিউনিজম বিরোধী ভূমিকার জন্যই। সোভিয়েত ইউনিয়নকে ছিন্ন বিচ্ছিন্ন করার জন্য মিখাইল গর্বাচেভ পুরস্কার পেয়েছেন ১৯৯০ সালে। তিব্বতের দালাইলামা (১৯৮৯) চীনের বিরুদ্ধে যে ভূমিকা রাখছেন, তার স্বীকৃতিই ছিল ওই পুরস্কারের মাধ্যমে। মায়ানমারের আন সাং সুকির স্বামী একজন বৃটিশ।
আবার পূর্ব তিমুরের রোমান ক্যাথলিক বিশপ বেলো ও রাজনৈতিক নেতা রামোস হর্তাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৮৯ সালে পোপ জন পলের পূর্ব তিমুর সফরের পর থেকেই সেখানে নুতন করে আন্দোলন শুরু হয়। তারা ক্যাথলিক তাই তারা স্বাধীনতা পেতেই পারে মুসলমানদের অধীনতা থেকে। ফিলিস্তিন, চেচনিয়া, কাশ্মির প্রভৃতি স্থানে শান্তির কথা কেউ যেন বলছে না।
ভারতে মানবতার সেবা করার জন্য মাদার তেরেসাকে নোবেল শান্তি পুরস্কার দেওয়া হয় ১৯৭৯ সালে। অনেকেই মনে করছেন, তেরেসা সেবা তৎপরতার আড়ালে খৃস্টধর্মই প্রচার করছেন। এই পুরস্কারের মাধ্যমে তার প্রতি পশ্চিমাদের সমর্থন ঘোষিত হয়েছে। বার্মার আংসান সুকিকে ১৯৯১ সালে নোবেল পুরস্কার দেয়ার নেপথ্যে ছিল দেশটিতে আরো অস্বস্তি সৃষ্টি করা। বার্মার সামরিক জান্তা আমেরিকার তেমন তাবেদার নয়। অন্যদিকে আংসান সুকি পাশ্চাত্যের অনুরাগী। তার স্বামীও ছিলেন ব্রিটিশ।
উপমাহদেশের স্বাধীনতার আন্দোলনের নেতা (মহাত্মা) করমচাঁদ গান্ধী, (কায়েদে আযম) মোহাম্মদ আলী জিন্নাহ, (পণ্ডিত) জওহেরলাল নেহরুও বিবেচিত হননি নোবেল পুরস্কারের জন্য। তবুও নোবেল পুরস্কার একটি স্বপ্ন অনেকের জন্য। অনেকে এই সোনার হরিণের জন্য জীবনই শেষ করে দিচ্ছেন।



Leave a Reply