বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেলেন ৪১ বীরাঙ্গনা: ইতিহাসের অন্য দায়

Birangana_৪১ বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে গেজেট প্রকাশ করেছে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়। রাষ্ট্রপতির আদেশক্রমে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের উপসচিব রেজাউল ইসলাম স্বাক্ষরিত এ সংক্রান্ত একটি প্রজ্ঞাপনের মাধ্যমে সোমবার দুপুরে তালিকা প্রকাশ করা হয়। এর মধ্য দিয়ে দীর্ঘ ৪৫ বছর পর মুক্তিযুদ্ধে বিশেষ অবদান রাখা এসব বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।

এদিকে মুক্তিযুদ্ধ বিষয়কমন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক জানিয়েছেন আরো বীরাঙ্গনাকে সরকার মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিতে আগ্রহী।  মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দিতে আরও পাঁচশোজন বীরাঙ্গনার তালিকা এখন যাচাই-বাছাই করে দেখা হচ্ছে। এছাড়া, মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেতে বীরাঙ্গনারা আগামী বছরের জুন মাসের মধ্যে আবেদন করতে পারবেন বলেও তিনি জানান।

তালিকাভুক্ত হওয়া এই ৪১ নারীকে গত চুয়াল্লিশ বছর ধরে বীরাঙ্গনা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও এই প্রথমবারের মতো তাদের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি দেয়া হল।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী আ.ক.ম. মোজাম্মেল হক জানান, আরো বেশী সংখ্যক বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি সরকার দিতে চায়, তবে বিষয়টি স্পর্শকাতর হওয়ার কারণে তাদেরকে সতর্কতার সঙ্গে এগোতে হচ্ছে।

বাংলাদেশের ইতিহাস বলে, ১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধের সময় অন্তত দুই লক্ষ নারী পাকিস্তানি সেনাবাহিনী ও তাদের সহযোগীদের হাতে নিপীড়নের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীনতার পর এদের স্বীকৃতি মেলে বীরাঙ্গনা হিসেবে।

সরকারি তালিকায় অনেকের নামও উঠেছিল। সরাসরি যারা রণাঙ্গনে যুদ্ধ করেছিলেন কিংবা যুদ্ধে অন্য ভূমিকা রেখেছিলেন, এমন পুরুষ ও নারীদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে চিহ্নিত করা হলেও বীরাঙ্গনাদের মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি মেলেনি। তবে এই প্রথমবারের মতো ৪১ জন বীরাঙ্গনাকে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি দিয়ে সরকারি গেজেট প্রকাশ করা হল।

এদের একজন সিরাজগঞ্জের মোছাম্মৎ সূর্য বেগম। মাত্র ১৫ বছর বয়সে নিজ বাড়িতে পাক বাহিনীর হাতে নির্যাতনের শিকার হয়েছিলেন। স্বাধীনতার এতগুলো বছর পর আজ মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতি পেয়ে সূর্য বেগম এদিন খুবই আবেগ তাড়িত হয়ে পড়েছিলেন।

মুক্তিযুদ্ধের সময় নির্যাতনের শিকার নারীদের একটি বড় অংশ ছিলেন গ্রামাঞ্চলের। ফলে সেখানকার রক্ষনশীল সমাজে বিষয়টি খুবই স্পর্শকাতর হিসেবে বিবেচনা করা হয়, অনেক পরিবারে এ নিয়ে খোলাখুলি আলোচনাও হয় না।

কিন্তু সূর্য বেগমের চার সন্তানের সবাই তাদের মায়ের জন্যে গর্বিত বলেই জানান তাঁর ছেলে মোঃ হাফিজুর রহমান। একই সাথে তিনি খুশী মায়ের মুক্তিযোদ্ধার স্বীকৃতির পাওয়ার বিষয়টিতে।

বীরাঙ্গনাদের আত্মত্যাগের বিষয়টি নিয়ে বাংলাদেশে অনেক আবেগের বহিঃপ্রকাশ করা হলেও স্বীকৃতির ব্যাপারে দৃশ্যমান তেমন কোনও উদ্যোগ ছিল না।

৪১ জন বীরাঙ্গনা এখন মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়ার ফলে তাঁরা এখন সরকারি ভাতা ও অন্যান্য সুবিধা পাবেন।

তালিকা পর্যালোচনা দেখা যায়, সিরাজগঞ্জের সর্বোচ্চ ১৩ জন বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন। তারা হলেন-ফকিরপাড়া গ্রামের আয়মনা, চুলিয়াহাতির আছিয়া বেগম, রহমতগঞ্জের (নতুন ভাঙ্গাবাড়ি) সূর্য বেগম, বিন্দুপাড়া দত্তবাড়ির কমলা বেওয়া, তেঁতুলিয়া পশ্চিমপাড়ার জয়গন, পিটিআই স্কুলপাড়ার ছুরাইয়া খাতুন, সয়াধনগাড়া পূর্বপাড়ার মাহেলা বেওয়া, কান্দাপাড়ার ফকিরপাড়ার হামিদা বেওয়া, কান্দাপাড়ার হাসনা বেগম, চাঁদপুর ঝাউলের রাজুবালা দে, চককুবদাশপাড়ার রহিমা বেওয়া, সদরের ছামেনা খাতুন ও সয়াধনগাড়ার শামসুন্নাহার বেওয়া।

চাঁপাইনবাবগঞ্জের স্বীকৃতি পেলেন ১০ জন। তারা হলেন- নরশিরা গ্রামের রাবিয়া বেগম, রেনু বেগম, রাহেলা বেগম, চৌকামনাকষার মালেকা বেগম, লক্ষ্মীনারায়ণপুরের হাসিনা বেগম, লালাপুরের জালো বেগম, বড় বঙ্গেশ্বরপুরের সফেদা বেগম, আয়েশা বেগম, সাহাপুরের হাজেরা বেগম ও আরবী বেগম।

এছাড়াও ঠাকুরগাঁওয়ের ছয়জন, কুষ্টিয়ার চারজন এবং হবিগঞ্জ, সিলেট ও রংপুরের একজন করে বীরাঙ্গনা মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।

ঠাকুরগাঁওয়ের ছয়জন হলেন- রাউতনগর গ্রামের সুমি বাসুগী, মনি কিসকু, হাফেজা বেওয়া, নিয়ানপুরের মালেকা, শিদলীর নিহারানী দাস ও পকম্বার নূরজাহান বেগম। কুষ্টিয়ার চারজন হলেন- হাসিমপুর গ্রামের এলেজান বেগম, মটমালিয়াটের মোমেনা খাতুন, দোলাজান নেছা ও নাতুরিয়ার মজিরন নেছা। সিলেটের মনতৈল গ্রামের এশনু বেগম, হবিগঞ্জের বেলঘর গ্রামের মাজেদা বেগম ওরফে মাজেদা খাতুন ও রংপুরের কাছনা তকিয়ারপাড়ার মনছুরা বেগম মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে স্বীকৃতি পেলেন।

আরও পড়ুন