নানামুখী চাপ ও অভ্যন্তরীণ কোন্দলে কুপোকাত বিএনপি। মামলা ও গ্রেফতার আতঙ্ক, দল পুনর্গঠনের ঘোষণা দিয়েও এখনো দৃশ্যমান কোনো পরিবর্তন নেই। ফলে কঠিন সংকটময় সময় পার করছে দলটি। দলটির নেতাকর্মীদের সঙ্গে কথা বলে এবং তাদের সাংগঠনিক কার্যক্রম বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, চার দেয়ালেই যেন বন্দী হয়ে গেছে বিএনপির রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড। অভ্যন্তরীণ কোন্দলসহ নানামুখী চাপে কোণঠাসা হয়ে মাঠের রাজনীতি থেকে অনেকটাই ছিটকে পড়েছে দলটি। এ ছাড়া মামলা, জেল-জুলুম ও শারীরিক অসুস্থতার কারণে নীতি-নির্ধারণী ফোরামের পাশাপাশি শীর্ষ নেতাদের মধ্যে এখন বেশীরভাগই নিষ্ক্রিয় হয়ে পড়েছেন। এর মধ্যে কেউ কেউ কয়েক দফা কারাভোগের পর রাজনীতিতে নিষ্ক্রিয় হয়েছেন। অনেকেই আবার কারাগারে আছেন। কেউবা দীর্ঘদিন আত্মগোপনে রয়েছেন। সীমিত পরিসরে কেউ কেউ রাজনীতিতে সক্রিয় থাকলেও অনেকেই সময় পার করছেন নীরবে-নিভৃতে।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্যের মধ্যে মহাসচিব খোন্দকার দেলোয়ার হোসেন ২০১১ সালে ইন্তেকাল করেন। এদিকে দীর্ঘদিন বার্ধক্যজনিত রোগে ভুগছেন নীতি-নির্ধারণী কমিটির সিনিয়র সদস্য ড. আর এ গনি। দলীয় সভা ছাড়া কোনো কর্মকাণ্ডে তাকে দেখা যায় না। কমিটির আরেক সিনিয়র সদস্য ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন কারাগারে। মানি লন্ডারিং মামলায় ২০১৪ সালের ১৩ মার্চ গ্রেফতার হন তিনি। কাশিমপুর কারাগারে বন্দী আছেন এই নেতা। অসুস্থ অবস্থায় কারাগারে দিন কাটছে তার। ব্যারিস্টার মওদুদ আহমদ স্থায়ী কমিটির প্রভাবশালী সদস্য। সম্প্রতি তার ছেলের মৃত্যুতে তিনি শোকাহত। স্থায়ী কমিটির সদস্য তরিকুল ইসলামের বিরুদ্ধে রয়েছে একাধিক মামলা। তা ছাড়া তিনি শারীরিকভাবেও তেমন সুস্থ নন। ফলে দলের জন্য তিনিও তেমন সময় দিতে পারছেন না। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এম শামছুল ইসলাম অসুস্থ। দীর্ঘদিন তিনি দলের নীতি-নির্ধারণী ফোরামরে বৈঠকেও অংশ নিতে পারছেন না। আরেক সদস্য বেগম সারোয়ী রহমানও বয়সের ভারে ন্যুব্জ।
লে. জে. (অব.) মাহবুবুর রহমান, ব্রিগেডিয়ার জেনারেল (অব.) আসম হান্নান শাহ, নজরুল ইসলাম খান, গয়েশ্বর চন্দ্র রায় স্বল্প পরিসরে ঘরোয়া অনুষ্ঠানগুলো যোগ দিচ্ছেন। স্থায়ী কমিটির আরেক সদস্য এম কে আনোয়ারও আছেন কারাগারে। কমিটির আরেক সদস্য ব্যারিস্টার জমিরউদ্দিন সরকার নীতি-নির্ধারণী বৈঠকে অংশগ্রহণ ও উচ্চ আদালতে দলের নেতাকর্মীদের মামলায় সহযোগিতা করছেন। স্থায়ী কমিটির সদস্য ব্যারিস্টার রফিকুল ইসলাম মিয়া দলীয় কর্মসূচিতে সরব উপস্থিতি থাকলেও মামলায় থাকায় প্রকাশ্যে আসতে পারছেন না। কমিটির আরেক সদস্য ড. আব্দুল মঈন খান ফোরামের বৈঠকের বাইরে ঘরোয়া আলোচনা সভাগুলো ও বিএনপির কূটনীতিক উইংয়ের মধ্যেই সীমাবদ্ধ। গ্রেফতার আতঙ্কে দীর্ঘদিন প্রকাশ্যে আসেন না স্থায়ী কমিটির সদস্য মির্জা আব্বাস।
১৯৭১-এ মুক্তিযুদ্ধে মানবতাবিরোধী অপরাধের অভিযোগ মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত নীতি-নির্ধারণী ফোরামের আরেক সদস্য সালাউদ্দিন কাদের চৌধুরী দীর্ঘদিন কারাগারে আটক আছেন। দলের সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান হিসেবে স্থায়ী কমিটির সদস্য তারেক রহমান ওয়ান-ইলেভেনের পর দীর্ঘদিন কারাভোগ শেষে চিকিৎসার জন্য লন্ডনে অবস্থান করছেন।
এদিকে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া চিকিৎসার জন্য লন্ডনে আছেন। ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর শারীরিক অসুস্থতার কারণে দলকে পুরোপুরি সময় দিতে পারছেন না।
এ ছাড়া বিএনপি চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা মধ্যে খন্দকার মাহবুব উদ্দিন আহমেদ, সাঈদ এস্কান্দার ও মুহাম্মদ মোশাররফ হোসেন মারা গেছেন। বার্ধক্যজনিত কারণে হারুনার রশিদ খান মুন্নু, উকিল আব্দুস সাত্তার, ফজলুর রহমান পটল রাজনীতিতে সক্রিয় নয়।
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও ঢাকা জেলা বিএনপির সভাপতি আব্দুল মান্নান অকেনটাই নীবর। আরেক উপদেষ্টা গাজীপুর সিটি করপোরেশনের মেয়র অধ্যাপক এম এ মান্নান কারাগারে। খালেদা জিয়ার ছোট ছেলের মৃত্যুর পর মোসাদ্দেক আলী ফালুর সরব দেখা যায়। পরবর্তীকালে কারাভোগ পর এখন অনেকটাই নীরব তিনি।
চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে— আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, এ্যাডভোকেট আহমদ আজম খান, ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন তারাও সক্রিয় ভূমিকা রাখতে পারছেন না। বিদেশে অবস্থান করছেন ড. ওসমান ফারুক। শওকত মাহমুদ কারাগারে, আব্দুল আউয়াল মিন্টু প্রকাশ্যে নেই। এ ছাড়া নূরুল ইসলাম দাদু ভাই, ইকবাল হাসান মাহমুদ টুকু, অধ্যাপক মাজেদুল ইসলাম, এ এস এম আব্দুল হালিম, জহুরুল ইসলাম, ব্যারিস্টার মুহাম্মদ হায়দার আলী, খন্দকার শহিদুল ইসলাম, ক্যাপ্টেন সুজাউদ্দিন ও আব্দুল মান্নানের সাংগঠনিক, রাজনৈতিতে উপস্থিতি নেই বললেই চলে। আদালত অঙ্গনে আছেন এ্যাডভোকেট খন্দকার মাহবুব হোসেন, এ জে মোহাম্মদ আলী, জয়নাল আবেদীন। চেয়ারপারসনের নিরাপত্তা সংক্রান্ত দেখভালে এম এ কাইয়ূম সক্রিয় রয়েছেন। এ ছাড়া মীর মোহাম্মদ নাসির উদ্দিন, মেজর জেনারেল (অব.) মাহমুদুল হাসান, মেজর জেনারেল (অব.) রুহুল আলম চৌধুরী, শাহজাহান ওমর বীরউত্তম, ইনাম আহমেদ চৌধুরী, মুশফিকুর রহমান, মনজুর আলম প্রমুখ চেয়ারপারসেন উপদেষ্টা।
দলের ভাইস চেয়ারম্যান বিচারপতি টি এইচ খান বার্ধক্যজনিত কারণে নিষ্ক্রিয়। বিএনপিপন্থী আইনজীবীদের আইনী পরামর্শ দিয়ে যাচ্ছেন। এম মোরশেদ খান ও হারুন অর রশীদ অসুস্থতায় রাজনীতিতে সক্রিয় নয়। ভাইস চেয়ারম্যান কাজী শাহ মোফাজ্জল হোসেন কায়কোবাদ। ২১শে আগস্ট গ্রেনেড হামলা মামলার চার্জশিটে তার নাম অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে। তিনি এখন দেশের বাইরে আছেন। ভাইস চেয়ারম্যান সাদেক হোসেন খোকাও চিকিৎসার জন্য অবস্থান করছেন যুক্তরাষ্ট্রে। সম্প্রতি তাকে ১৩ বছরের কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে।
ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল্লাহ আল নোমান, সেলিমা রহমান, শাহ মোয়াজ্জেম হোসেন, আলতাফ হোসেন চৌধুরী, চৌধুরী কামাল ইবনে ইউসুফ, মেজর (অব.) হাফিজউদ্দিন আহমেদ বীরবিক্রম স্বল্প পরিসরে সক্রিয়। শমসের মবিন চৌধুরী বীরবিক্রম কারাভোগ পর মুক্তি পেয়ে নিজেকে গুটিয়ে রেখেন। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুস সালাম পিন্টু কারাগারে আছেন। মহিলা ভাইস চেয়ারম্যান রাবেয়া চৌধুরী কুমিল্লায় অবস্থান করছেন। আরেক ভাইস চেয়ারম্যান রাজিয়া ফয়েজ মৃত্যুবরণ করেন।
অবশ্য শামসুজ্জামান দুদুকে নয়াপল্টনে সংবাদ সম্মেলনে দেখা যায়। এ ছাড়া, চেয়ারপারসনের উপদেষ্টাদের মধ্যে রিয়াজ রহমান, সাবিহ উদ্দিন কূটনীতিকদের নিয়ে কাজ করেন। যুগ্ম-মহাসচিবদের মধ্যে মোহাম্মদ শাহজাহান সাংগঠনিক কর্মকাণ্ড নিয়ে কাজ করছেন।
এদিকে আমানউল্লাহ আমান কারাগারে, বরকতউল্লাহ বুলু আত্মগোপনে, মিজানুর রহমান মিনু মুক্তি পেয়ে নীবর আছেন। দফায় দফায় কারাভোগ করেছেন আরেক যুগ্ম-মহাসচিব এ্যাডভোকেট রহুল কবির রিজভী আহমেদ। দীর্ঘদিন নিখোঁজ থাকার পর রহস্যজনভাবে ভারতে সন্ধান মিলে সালাহউদ্দিন আহমেদের। অবৈধ অনুপ্রবেশের দায়ে কয়েকদিন কারাভোগের পর বর্তমানে তিনি টাউন জামিনে (শিলং শহর না ছাড়ার শর্ত) রয়েছেন। আইনী জটিলতা কাটিয়ে কবে তিনি আপাতত দেশে ফিরতে পারছেন না।
সাংগঠনিক সম্পাদকদের মধ্যে এম ইলিয়াস আলী প্রায় চার বছর ধরে নিখোঁজ রয়েছেন। এদিকে ফজলুল হক মিলন, মজিবুর রহমান সারোয়ার, হারুনুর রশীদ ও আসাদুল হাবিব দুলু, গোলাম আকবর খন্দকার কৌশলে গ্রেফতার এড়িয়ে চলছেন। এ ছাড়া জাতীয় নির্বাহী কমিটির অধিকাংশ সদস্যই গা বাঁচিয়ে চলছেন।


