বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের রমরমা বাণিজ্য!

jahangir-nagar-universityসান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্সের নামে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষা নিয়ে রমরমা ব্যবসা শুরু করেছেন শিক্ষকরা। প্রথমদিকে দু-একটি বিভাগ এ কোর্স চালু করলেও আস্তে আস্তে তা প্রায় ১০টি বিভাগে ছড়িয়ে পড়েছে। এ কোর্সের মাধ্যমে কিছু শিক্ষক হাতিয়ে নিচ্ছে লাখ লাখ টাকা। এভাবে চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যেই পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

শিক্ষকদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রথম সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালু করে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যামিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ)। পরে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগ (ফিন্যান্স অ্যান্ড ব্যাংকিং বিভাগ, মাকের্টিং বিভাগ, একাউন্টিং অ্যান্ড ইনফরমেশন সিস্টেমস বিভাগ, ম্যানেজমেন্ট স্টাডিজ বিভাগ), ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি), ইংরেজি বিভাগ, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ, সরকার ও রাজনীতি বিভাগ এবং গণিত বিভাগে অধীনে সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালু করে।

কোর্স চালু রয়েছে এমন কয়েকটি বিভাগ ঘুরে জানা যায়, সাধারণত এ কোর্সগুলো ১০ মাস থেকে দুবছর মেয়াদি হয়ে থাকে। ইংরেজি বিভাগের অধীনে এ কোর্স শেষ করতে একজন শিক্ষার্থীকে ২ লাখ ১৫ হাজার টাকা গুনতে হয়। একইভাবে ইনস্টিটিউট অব বিজনেস অ্যামিনিস্ট্রেশন (আইবিএ-জেইউ)-এর অধীনে ১ লাখ ৭২ হাজার টাকা, ইনস্টিটিউট অব ইনফরমেশন টেকনোলজি (আইআইটি) বিভাগের অধীনে ১ লাখ ৫২ হাজার টাকা, কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের অধীনে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৫০০ টাকা, সরকার ও রাজনীতি বিভাগের অধীনে ৮০ হাজার টাকা এবং বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে চারটি বিভাগে প্রায় দেড় লক্ষাধিক টাকা গুনতে হয়। এই সকল কোর্সে সাধারণত চাকরিজীবীদের গুরুত্ব দেয়া হয়।

সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালু রয়েছে এমন বিভাগগুলোর শিক্ষকরা মোটা অঙ্কের টাকা পাওয়ায় অন্যান্য বিভাগের শিক্ষকরাও লোভে পড়ে সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালুর চিন্তাভাবনা করছেন। এর মধ্যে রয়েছেন লোক প্রশাসন বিভাগ। বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে সান্ধ্যকালীন কোর্স ইএমবিএ প্রোগ্রামের প্রতি কোর্সের জন্য একজন প্রভাষক প্রতি সেমিস্টারে আয় করেন প্রায় ৬৩ হাজার এবং একজন অধ্যাপক আয় করেন ৮১ হাজার টাকা। প্রতিজন শিক্ষক প্রত্যেক সেমিস্টারে একাধিক কোর্স পড়ান।
এ মোটা অঙ্কের টাকার লোভে আস্তে আস্তে অন্যান্য বিভাগগুলোও সান্ধ্যকালীন কোর্স চালু করতে চেষ্টা করছেন।

বিশ্ববিদ্যালয়ে প্রশাসনও অদৃশ্য কারণে বিভাগগুলোকে সান্ধ্যকালীন কোর্স চালুর অনুমতি দিচ্ছেন। এভাবে চলতে থাকলে আগামী কয়েক বছরের মধ্যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় তার স্বাতন্ত্র্য হারিয়ে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যালয়ে পরিণত হবে।

এদিকে শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বাভাবিক শিক্ষা কার্যক্রম বন্ধ রেখে বিজনেস স্টাডিজ অনুষদের অধীনে সান্ধ্যকালীন কোর্স ইএমবিএ প্রোগ্রাম চালাচ্ছেন ঐ অনুষদভুক্ত শিক্ষকরা। ফলে অনুষদের প্রতিটি বিভাগে ৬ মাস থেকে ১ বছর পর্যন্ত সেশনজটে পড়েছে শিক্ষার্থীরা।

এছাড়া সাপ্তাহিক বন্ধের দিন শুক্রবার শিক্ষকদের বিশ্রামের জন্য দেয়া হলেও সেদিন শিক্ষকরা সব থেকে বেশি পরিশ্রম করছেন। ফলে অন্যান্য দিনে নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ওপর তেমন মনোযোগ দিতে পারছেন না বলে মনে করছেন শিক্ষার্থীরা।

এ বিষয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের একাধিক শিক্ষক জানান, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয় হিসেবে পরিচিত হলেও আজ কিছু অসাধু শিক্ষকের কারণে তা প্রাইভেট কোচিংয়ে পরিণত হচ্ছে। এভাবে সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্সের নামে কোচিং ব্যবসা চলতে থাকলে কয়েক বছরের মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ের স্বতন্ত্র শিক্ষা কাঠামো ভেঙে প্রাইভেট বিশ্ববিদ্যলয়ে পরিণত হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একাধিক শিক্ষার্থী অভিযোগ করে মানবজমিনকে বলেন, বিশ্ববিদ্যালয়ে সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালু হওয়ার পর থেকেই বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষকদের ঝোঁক ঐ কোর্সের শিক্ষার্থীদের প্রতি বেড়ে গেছে। কারণ এখান থেকে তারা লাখ লাখ টাকা আয় করছে। নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্লাস-পরীক্ষা মিস হলেও তাদের ক্ষেত্রে তা হয় না। যার কারণে আমরা ভয়াবহ সেশনজটের সম্মুখীন হচ্ছি।

এ বিষয়ে ডেপুটি রেজিস্ট্রার (শিক্ষা) মোহাম্মদ আলীর কাছ থেকে জানতে চাইলে তিনি বলেন, এ কোর্সগুলো যেহেতু বিভাগের অধীনে হয়ে থাকে সুতরাং তারাই এ বিষয়ে ভাল বলতে পারবেন। বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনকে তারা কোর্স থেকে আয়ের শতকরা ২৫ ভাগ অর্থ দিয়ে থাকে। তাই আমরা তাদেরকে বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্টিফিকেট দিয়ে থাকি।

বাংলাদেশ ছাত্র ইউনিয়ন জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয় সংসদের সভাপতি তন্ময় ধর বলেন, সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ের সঙ্গে পুরোপুরি সাংঘর্ষিক। শিক্ষকদের পকেট ভরানোর জন্য পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়কে শিক্ষা বাণিজ্যিক কেন্দ্রে পরিণত করবে এটা কাম্য হতে পারে না।

বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রলীগের সভাপতি মাহমুদুর রহমান জনি বলেন, অধিকাংশ বিভাগে একাডেমিক তহবিল বাড়ানো জন্য এ কোর্সগুলো চালু করা হচ্ছে। এ কোর্সগুলোতে অর্থনৈতিক বিষয় জড়িত থাকার কারণে সম্মানিত শিক্ষকমণ্ডলী তাদের বিষয়ে যতটা যত্নশীল নিয়মিত শিক্ষার্থীদের ক্ষেত্রে ততটা নয়। তাছাড়া বিশ্ববিদ্যালয়ের যে নিজস্ব পরিবেশ ও ঐতিহ্য রয়েছে এই কোর্সের শিক্ষার্থীদের কারণে তা অনেকটা নষ্ট হচ্ছে। সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্সগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ের সার্বিক পরিবেশকে হুমকির মুখে ফেলে দিচ্ছে বলে মনে করছেন ইতিহাস বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক গোলাম রব্বানী। এছাড়া শিক্ষক মঞ্চের মুখপাত্র রায়হান রাইন মনে করেন, একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে দ্বৈতনীতি চলতে পারে না। একই জায়গায় কেউ পড়বে টাকা দিয়ে আবার কেউ পড়বে বিনামূলে যার কারণে স্বাভাবতই একমুখী ভাব তৈরি হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকদের নিয়োগ দেয়া হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষার্থীদের পড়ানোর জন্য বিশ্ববিদ্যালয়কে প্রাইভেটে রূপান্তর করার জন্য নয়।

বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক মো. খবির উদ্দিন বলেন, সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্সের কারণে যদি শিক্ষার্থীরা ক্ষতিগ্রস্ত হয় তাহলে অবশ্যই এ কোর্সগুলো বাতিল করা হবে। বিশ্ববিদ্যালয় উপউপাচার্য অধ্যাপক মো. আবুল হোসেন বলেন, গত কয়েক মাস যাবৎ এই বিষয়টি আমরা পর্যবেক্ষণ করছি। আমরা বলেছি, নিয়মিত শিক্ষার্থীদের অবহেলা করে সান্ধ্যকালীন ও সাপ্তাহিক কোর্স চালানো যাবে না। বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়মিত শিক্ষা কার্যক্রম পরিচালনার পর যদি সময় থাকে তবে এ ধরনের কোর্স চালাতে পারে।

আরও পড়ুন