ইচ্ছা ছিল চুপচাপ থাকব; কারো সাথে কথায় জড়াবো না। কারণ, ফেসবুকে এই পাল্টাপাল্টি কথা বলায় অন্য সার্ভিসের কারো কিছু না হলেও আমাদের উপরে ঝুলে থাকে চাকুরিবিধির খড়গ। তবু কিছু বিষয়ে অবস্থান পরিস্কার করার জন্য লিখতেই হচ্ছে।
১) বেতন ভাতায় ইউএনও’র স্বাক্ষর:
উপজেলা পরিষদ আইনানুযায়ী উপজেলায় ন্যস্ত ডিপার্টমেন্টগুলোর বেতন-ভাতা সংশ্লিষ্ট উপজেলা পরিষদ থেকে দিতে হবে আর এরজন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের সাথে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তারও স্বাক্ষরের প্রয়োজন হবে। তবে বিষয়টা যেভাবে ফলাও করে প্রচার করা হচ্ছে এবং শত্রু বানানো হচ্ছে ইউএনওদেরকে সেটার আদৌ ভিত্তি কতটুকু? প্রথমত, এই আইনটা এবং স্বাক্ষরের এই ব্যবস্থা এরশাদের সময়ের উপজেলা পরিষদ ব্যবস্থায় এভাবেই ছিল এবং এভাবেই তখন চলেছে। সেই আইনটাই হয়ত পরিমার্জিতরূপে এখন আবার নতুন করে পাশ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, এই আইনটা যখন হয় তখন প্রশিক্ষণে আমরা সবাই এর অনেক বিষয় নিয়েই স্যারদের সাথে একাডেমিক বিতর্ক করেছি। এখানে ইউএনওরা কর্তৃত্ব করার জন্যে এরকম করেছে এধরনের কথা বলা কতটুকু যুক্তিযুক্ত? আমার ব্যক্তিগত মত হচ্ছে, একজন বিসিএস ক্যাডার সেল্ফ ড্রয়িং অফিসার হিসাবে নিজের বেতন নিজের স্বাক্ষরেই তুলবে। এটা তাঁর ডিগনিটির একটা অংশ। তবে আপনাদের উচিত ছিল আইনের যখন খসড়া হয় তখনই এটা নিয়ে কথা বলা এবং পরিবর্তনের জন্য সরকারকে অনুরোধ করা।
২) টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড:
৩০০ জনের একটা ব্যাচ থেকে সচিব হতে পারে ৬-৮ জন। আমাদের সার্ভিস থেকেই সবচাইতে বেশী নজির থাকে প্রমোশন বঞ্চিত হবার। এমনো ঘটনা এখনো আছে, সার্ভিস প্রায় শেষের দিকে কিন্তু এখনো সহকারী সচিব অথবা উপ সচিব। এই যে ৩০০ জনের মাঝে বাকী ২৯৩ জন যারা সচিব হতে পারবে না, তাদের মাঝে উল্লেখযোগ্য সংখ্যকের ক্যারিয়ার শেষ হয়ে যাবে উপ-সচিব, যুগ্ম-সচিব পর্যায়েই। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড থাকলে তারাও হয়ত বেতন বেশী পাবে।
টাইম স্কেল থাকলে পরবর্তী বছরের জুনে আমাদের (৩০তম ব্যাচ) স্কেল হত ২৯০০০ টাকা কিন্তু এখন আমাদের হবে ২৬০০০ এর একটু বেশী। এটা সব ব্যাচের, সব ক্যাডারের জন্যই সমানভাবে সত্য। আপনারা ব্যাচভিত্তিক প্রশাসনের আপনার ব্যাচমেটদের কাছে জানলেই পরিস্কার হবে। এটা সরকারের সিদ্ধান্তের ব্যাপার; সরকারের ব্যায়বহনের সক্ষমতার ব্যাপার কারন বর্তমান পে-স্কেলে আমাদের বেতন প্রায় দ্বিগুণ করা হয়েছে। এখানে প্রশাসন বান্ধব পে-স্কেলের বিষয় এল কিভাবে?
৩) সার্ভিসে আসার পরে একটু ঈর্ষাবোধ করতাম, জেনারেল ক্যাডারগুলোতে বিশেষ করে প্রশাসন, পুলিশ, কাস্টমস, ট্যাক্সে এত কৃষিজীবী আর প্রকৌশলী ক্যাডার কেন? আমাদের প্রশাসনেও বিশ্ববিদ্যালয় হিসাবে মনে হয় ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়, বুয়েট তারপর অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রতিনিধিত্ব। তাহলে কেন মেধাবী, মেধাহীনের তর্ক। বুয়েটের টেকনিক্যাল জ্ঞানলাভের পাশাপাশি সে বিসিএস-এও প্রথম দিকেই অবস্থান করেছে যেখানে আপনি তাদের পেছনে পড়ে গেছেন। প্রতিযোগিতায় পেছনে পড়ার পরও তারা আপনাকে মেধাহীন বলছে না কিন্তু আপনি তাদেরকে মেধাহীন বলছেন। ব্যাপারটা কিছুটা হাস্যকর সাথে অবমাননাকরও বটে। কাউকে সম্মান দিতে না পারলেও অসম্মান করা উচিত নয়।
৪) আরেকটা বিষয় ওইদিন ফেসবুকে দেখলাম উপজেলায় সিদ্ধান্ত হয়েছে যে, কোনও ক্যাডার অফিসার নাকি সত্যায়ন না করে পাঠাবে ইউএনও-এর কাছে। গত পরশুদিন দেখলাম কয়েকজন এসেছে। ভারপ্রাপ্ত ইউএনও’র দায়িত্বের পাশাপাশি নিয়মিত এসি ল্যান্ডের দায়িত্ব নিয়ে খুবই ব্যস্ত ছিলাম। তাদেরকে সত্যায়ন করে দিলাম কাজের ফাকেই। কাগজপত্র সঠিক থাকলে সত্যায়নকারীকে ফিরাই না কখনো কারন মনে পড়ে টেবিলের ওপাশে একদিন আমাকেও দাঁড়াতে হয়েছে। আর আমাদেরকে এই ঝামেলার ভয় দেখিয়ে কোন লাভ নেই। সাগরে সাঁতরে অভ্যাস যাদের তাদেরকে পুকুরের ভয় দেখিয়ে কি হবে।
৫) সিভিল সার্ভিসের যেকারও যেকোনও দাবির ভিত্তি হবে যুক্তির; গালি-গালাজের নয়। গালি-গালাজ আপনার যৌক্তিকতাকে দুর্বল করে দেয়। কারণ মানুষের মস্তিস্ক থেমে গেলেই তখন মুখের ব্যবহার জোড়ালো হয়। আপনাদের দাবি-দাওয়ার ব্যাপারে অনেকেরই ব্যক্তিগত মত হয়ত আমার মতই কিন্তু আপনাদের মাঝে অনেকের রুচিহীন ভাষার কারণে তারাও হয়ত বিপক্ষে বলছে।
সবশেষে প্রত্যাশা, আমরা যেন আমাদের সংকীর্ণতাকে অতিক্রম করতে পারি; অন্যকে সম্মান দিতে না পারলেও অসম্মান যেন না করি। সকলেরই মঙ্গল হোক।
আশরাফুল আলম ইকবাল: প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তা।



