বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

ভুল হলেও ভুলো না স্বপ্ন: জুকেরবার্গ

jukarতাঁর মাইনে মাসে এক ডলার। আর সম্পত্তির মূল্য তিন হাজার আটশো ষাট কোটি ডলার। পৈতৃক সূত্রে পাওয়া নয়, স্বোপার্জিত। একত্রিশ বছর বয়সের মধ্যে এমন অতিলৌকিক ঘটনা যিনি ঘটাতে পারেন, তাঁর নাম মার্ক জুকেরবার্গ। দেবদেবীরা মর্ত্যে আনাগোনা করেন মাঝে মাঝে। ধূসর টি শার্ট আর কালচে জিনস পরে জুকেরবার্গও চলে এলেন আইআইটি-র পড়ুয়াদের সামনে। ফেসবুকের জনককে হাতের নাগালে পেয়ে বুধবার আইআইটি দিল্লির টাউন হলকে ভাবতে হল, এ কোনও দিবাস্বপ্ন নয় তো?

স্বপ্ন মনে হওয়াটা অস্বাভাবিক নয়। মাত্র কয়েকটা বছর আগেই এই পড়ুয়াদের মতোই ছিলেন জুকেরবার্গ। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে পড়তেই ফেসবুক তৈরির কাজ শুরু হয়েছিল। দশ বছর বয়সে যে ছেলেটা বাড়ির কম্পিউটার আর বাবার অফিসের কম্পিউটারের মধ্যে যোগসূত্র গড়ে তুলতে পেরেছিল, সেই ছেলেটাই হার্ভার্ড ক্যাম্পাসে বসে বন্ধুদের সঙ্গে পিৎজা খেতে খেতে ভাবছিল, একটা সোশ্যাল নেটওয়ার্ক তৈরি করলে কেমন হয়! তার সামনে তখন বিল গেটস-এর কথামালা শোনার অনুপ্রেরণা! এর কিছু দিন পরেই ফেসবুকের আত্মপ্রকাশ ঘটবে, ২০০৬ সালের সেপ্টেম্বর মাসে তার ‘দেওয়াল’ সবার জন্য খুলেও যাবে। জুকেরবার্গ হার্ভার্ডের পড়া ছেড়ে দেবেন আর ফেসবুকের সঙ্গে গাঁটছড়া বাঁধতে চেয়ে মাইক্রোসফ‌্ট-এর কাছ থেকে আসা একশো কোটি ডলারের প্রস্তাবও ফিরিয়ে দেবেন!

জুকেরবার্গ নিজে অবশ্য এ দিন বললেন, ‘‘সংবাদমাধ্যমের একচোখামিতে মানুষের মনে ধারণা হয়েছে যে আমি বা স্টিভ জোবস একলাই যেন ফেসবুক বা অ্যাপ‌্ল-এর স্রষ্টা। কিন্তু সত্যিটা হল, অনেকে মিলে একসঙ্গে কাজ করে ওই সাফল্য এসেছে। একটি সংস্থা তৈরিতে যত বেশি জন সঙ্গে থাকবে, সমস্যা সমাধান করা তত সোজা হবে।’’ কেন? ‘‘কারণ এক জন সব সমস্যার সমাধান করতে পারে না। প্রতিটি মানুষ ভুল করে। আমিও করেছি। সব রকম ভুল করেছি।’’ কিন্তু সেই সব ভুলের পাহাড় ঠেলে এগিয়ে চলার মন্ত্রটি কী? স্বপ্নের সওদাগর জুকেরবার্গ স্বপ্নেই আস্থা রাখতে বলছেন। তাঁর বক্তব্য, ‘‘কোনও কিছু শুরু করার জন্য স্বপ্ন দেখাটা জরুরি। বিশেষ করে কেউ যখন কোনও সংস্থা শুরু করার কথা ভাবছে, তখন সবার আগে ঠিক করে নিতে হবে ঠিক কী করতে চায়। আর সেটাই মন দিয়ে করে যেতে হবে।’’
স্টিভ জোবস-ও তো এমন কথাই বলতেন। বলে থাকেন বিল গেটস-ও। এই দিক থেকে গেটস, জোবস আর জুকেরবার্গের মধ্যে মিল অনেক। প্রত্যেকেই নিজের জমি নিজে গড়েছেন। প্রত্যেকেই এমন সব জিনিস নিয়ে কাজ করেছেন, যা মানুষের জীবনযাপন বদলে দিয়েছে। প্রত্যেকেই তাঁদের নিজের জায়গায় পথিকৃৎ। এবং প্রত্যেকেই বিশ্ববিদ্যালয়ের গণ্ডি পার না-করেই বারবার বদলে দিয়েছেন সাফল্যের সংজ্ঞা। জোবস তাঁর জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত কিছু না কিছু নতুন উদ্ভাবনের কথা ভেবে গিয়েছেন। জুকেরবার্গের মাথাতেও অজস্র ভাবনা কিলবিল করছে!

যেমন ধরা যাক, আর্টিফিশিয়াল ইনটেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধি। যা কম্পিউটারকে করে তুলবে আরও বুদ্ধিমান। আরও মানবিক। অন্ধ ব্যক্তিও যাতে কম্পিউটারের মাধ্যমে ফটোগ্রাফি বুঝতে পারেন, সেই কাজ চলছে। সঙ্গে আছে টেলিপোর্টেশন! গুগাবাবা যেমন হাততালি দিয়ে নিমেষে হাল্লা বা শুন্ডি পৌঁছে যেত, টেলিপোর্টেশনও অনেকটা তাই। শুধু এখানে সরাসরি চলে যাওয়ার বদলে ভার্চুয়াল স্থানান্তর। কলকাতার সেক্টর ফাইভে বসে কানে হেডফোন গুঁজলেই সোজা সানফ্রান্সিসকো! কল্পবিজ্ঞানের এই গল্পকে বাস্তব করে তোলার চেষ্টাই চালাচ্ছেন জুকেরবার্গ। আইআইটি-র মঞ্চে দাঁড়িয়ে বলে গেলেন, ‘‘কাজ চালু রয়েছে। অকুলাসের সঙ্গে হাত মিলিয়ে টেলিপোর্টেশন নিয়ে গবেষণা এগোচ্ছি আমরা!’’ মূলত ভার্চুয়াল রিয়েলিটি (পরাবাস্তবতা) নিয়েই কাজ করে অকুলাস বলে সংস্থাটি।

কম্পিউটার সায়েন্সের দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী শ্রেয়া এ কথা শুনে উত্তেজিত গলায় বলে উঠলেন, ‘‘ভাবুন তো! টেলিপোর্টেশন হলে গোটা পৃথিবীর যোগাযোগ ব্যবস্থা কী ভাবে পাল্টে যাবে!’’ জুকেরবার্গের সঙ্গে ছবি তোলার সুযোগ পেয়ে আনন্দে লাফাচ্ছিলেন ওই তরুণী!

পাল্টে দেওয়াই তো জুকেরবার্গদের ধর্ম। ২০০৪ সালে ফেসবুকের জন্মলগ্নে কেউ কি ভেবেছিল, আগামী এক দশকে এক মালায় গাঁথা হয়ে যাবে একশো কোটিরও বেশি লোক? যেখানে মানুষ একসঙ্গে হাসবে, কাঁদবে, পুরনো বন্ধুকে খুঁজে পাবে, এমনকী অন্যায়ের প্রতিবাদ জানাবে সমস্বরে! এ দিন জুকেরবার্গের অকপট স্বীকারোক্তি, ‘‘শুরুর দিনে কেবল কলেজ-বন্ধুদের মধ্যে যোগাযোগের জন্যই ফেসবুক বানিয়েছিলাম। এর প্রভাব যে এত সদূরপ্রসারী হবে, আমিও ভাবিনি।’’

এ দিন সকাল থেকে আইআইটি দিল্লিতে ছিল সাজোসাজো রব। প্রেক্ষাগৃহে খুব বেশি হলে মাত্র এগারোশো লোকের বসার জায়গা। যার মধ্যে পড়ুয়াদের জন্য সংরক্ষিত ছিল ন’শো আসন। অন্যদের জন্য জায়ান্ট স্ক্রিন। গোটা অনুষ্ঠানটি সঞ্চালনার দায়িত্বে ছিল টিম ফেসবুক। প্রথমে জুকেরবার্গের সংক্ষিপ্ত বক্তব্য। তার পর ভোটের মাধ্যমে নির্বাচিত প্রশ্ন। সবচেয়ে বেশি ভোট পেয়ে এক নম্বর প্রশ্নই এল, ‘অনবরত ক্যান্ডি ক্রাশ-এর আমন্ত্রণ আসা বন্ধ হতে পারে না?’ জুকেরবার্গ তৈরি হয়েই এসেছিলেন। সহাস্যে বললেন, ‘‘দেখলাম এই প্রশ্নটা সবথেকে বেশি ভোট পেয়েছে। আমি আমার সফ‌্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারদের জানিয়ে দিয়েছি, এই প্রশ্নোত্তর পর্ব চলতেই যেন এর সমাধান খুঁজে বের করে ফেলা হয়!’’ প্রবল হাততালিতে ফেটে পড়ল টাউন হল!

পড়ুয়াদের সরাসরি প্রশ্নও ছিল। ‘‘সত্যি করে বলুন তো, ভারতের প্রতি কেন এত আগ্রহ আপনার?’’ অঙ্কিত নামে এক ছাত্রের প্রশ্নে আবার হেসে ফেললেন জুকেরবার্গ। তিনি এমন একটি ওয়েবসাইটের মালিক, যার সদস্যসংখ্যা, বিশ্বের জনসংখ্যার নিরিখে তৃতীয়। চিন ও ভারতের ঠিক পরেই। ফেসবুক পরিবারে ভারত থেকে রোজ বহু মানুষ নাম লেখাচ্ছেন। অথচ ভারতের জনসংখ্যার বিরাট অংশের কাছে এখনও ইন্টারনেট সংযোগই নেই। জুকেরবার্গ বললেন, ‘‘ফেসবুকের লক্ষ্যই হল পৃথিবীর প্রতিটি মানুষকে জোড়া। ভারত পৃথিবীর বৃহত্তম গণতন্ত্র। তাই ভারতবাসীকে জুড়তে না-পারলে আমাদের স্বপ্ন সত্যি হবে না।’’

এ-ও বোধহয় এক মিল। জোবস, জুকেরবার্গ আর গেটস-এর মধ্যে। ভারতকে ভালবাসেন তিন জনই। ভারতে জনসেবার কাজে টাকা দেয় মাইক্রোসফ‌্ট। নিজে এসে বিহারের গ্রাম ঘুরে দেখে গিয়েছিলেন বিল গেটস। নৌকায় চড়েছিলেন, কুঁড়েঘরের দাওয়ায় বসে গ্রামের মহিলাদের সঙ্গে গল্প করেছিলেন। আর অ্যাপ‌্ল-এর কর্ণধার হওয়ার অনেক আগেই আধ্যাত্মিকতার টানে ভারতে এসেছিলেন স্টিভ জোবস! ঠিক একই কাজ করেছিলেন জুকেরবার্গ-ও। গত মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর সিলিকন ভ্যালি সফরে ডিজিটাল ইন্ডিয়ার সমর্থনে ফেসবুকে প্রোফাইল ছবি তেরঙায় রাঙিয়ে নিয়েছিলেন। এ দিন বলে গেলেন, ‘‘ইন্টারনেটের সঙ্গে ১০ জন যুক্ত হলেই একটা করে চাকরি তৈরি হয়। এক জন মানুষ দারিদ্রসীমার উপরে উঠে আসেন। তাই ভারত আমার কাছে এত গুরুত্বপূর্ণ।’’ প্রায় সওয়া ঘণ্টার আলাপচারিতা যখন শেষ হল, তখন নতুন কিছু করার স্বপ্নে বুঁদ আইআইটি-র পড়ুয়ারাও। হার্ভার্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের ডর্মিটরিতেই তো এক দিন ফেসবুক আলো দেখেছিল! আজকের অঙ্কিত-শ্রেয়াদের মধ্যে সেই স্বপ্নটাই ছড়িয়ে দিয়ে গেলেন জুকেরবার্গ। -আনন্দবাজার।

আরও পড়ুন