বেশ ক’দিন বাদে দিল্লিবাসী অর্থনীতিবিদ প্রবীর দে ফিরেছিলেন কলকাতায়। দমদমের বাড়িতে এসে মন আনচান করে উঠল। বদলে গেছে পাড়াটা। ছেলেবেলায় কত বন্ধুবান্ধব ছিল। প্রায় সবাই এখন অন্যত্র। ফাঁকা বাড়িগুলো পাহাড়া দিচ্ছেন বয়স্ক বাবা-মায়েরা। ঝড়ঝড় করে প্রবীরবাবু ফেসবুকে লিখে ফেললেন ওঁর অনুভবের কথা। দ্রুত মতামত আসতে লাগল সেই পোস্টে।
এটা কি নিছকই ব্যক্তিগত অনুভূতি? নাকি গভীর বাস্তব? কেবলই কি দমদম? সল্ট লেক থেকে যোধপুর পার্ক, আলিপুর থেকে লেকটাউন— প্রায় সর্বত্র কিন্তু এই চিত্র। কলকাতা যেন হয়ে উঠেছে বৃদ্ধাবাস! জনগণনার সর্বশেষ রিপোর্টেও ফুটে উঠেছে এই সরল সত্যটা— গোটা দেশের বড় শহরগুলোর মধ্যে সবচেয়ে বেশি প্রবীণ এই কলকাতাতেই।
কী বলছে রিপোর্ট? বেঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতা— এই পাঁচ শহরে মোট বাসিন্দার মধ্যে ষাটোর্ধ্ব মানুষ রয়েছেন যথাক্রমে ৭.৭%, ৭.৮%, ৮.৯%, ৯.৯% এবং ১১.৭৬%।
কেন এই অবস্থা? জনগণনার ওই সমীক্ষা চলাকালীন ভারতের ডেপুটি রেজিষ্ট্রার জেনারেল ছিলেন দীপক রায়চৌধুরী। এখনও তিনি জনবিজ্ঞান-চর্চায় রত। সমীক্ষা প্রসঙ্গে বলেন, ‘‘অনেকটা আমার তদারকিতেই হয়েছিল ওই সমীক্ষা। কিন্তু এর সঠিক কারণ নিরূপণ করার কাজ আমাদের ছিল না। মাথা ঘামালে দু’টি কারণ রয়েছে এর নেপথ্যে। এক: জন্মহার কমে যাওয়া। দুই: পড়াশোনা বা কাজের সূত্রে কলকাতা-ত্যাগ। তবে, কোনওটাই প্রমাণ করা যাবে না।’’
বয়স্ক ব্যক্তিদের নিয়ে দীর্ঘকাল গবেষণা করছেন ইন্দ্রানি চক্রবর্তী। কেন্দ্রীয় সরকার ও রাষ্ট্রপুঞ্জের বেশ কিছু কমিটির সঙ্গে তিনি জড়িয়ে আছেন। তাঁর মতে, ‘‘আমার তো মনে হয় কলকাতার গুরুত্ব ক্রমেই কমে যাওয়ায় এই হাল। উচ্চশিক্ষার জন্য অর্ধেক অভিভাবক ছেলেমেয়েদের ভিন রাজ্যে বা বিদেশে পাঠিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করেন। যে সব পড়ুয়া থেকে যায়, তারাও অধিকাংশই কলকাতায় কাজ পাচ্ছেন না। পড়ে থাকছেন কেবল তাঁদের বাবা-মায়েরা।’’
জনগণনার রিপোর্টও কিন্তু সায় দিচ্ছে ইন্দ্রানি চক্রবর্তীর অভিজ্ঞ ধারণাকে। বাঙ্গালুরু, দিল্লি, মুম্বাই, চেন্নাই ও কলকাতা— এই পাঁচ শহরের মধ্যে, মোট জনসংখ্যার নিরিখে ২০ থেকে ২৪ বছর বয়সীদের অনুপাত সবচেয়ে কম এ শহরেই। বেঙ্গালুরুতে ১১.১২, দিল্লিতে ১০.৩৩, মুম্বইতে ১০.৭, চেন্নাইতে ৯.৩ এবং কলকাতায় ৮.৯ শতাংশ নাগরিকের বয়স ২০ থেকে ২৪-এর মধ্যে। উচ্চশিক্ষার সঙ্গে যুক্তদের একটা বড় অংশ এই বয়সের মধ্যে পড়েন।
আর ২৫ থেকে ২৯ বছর? সেই তালিকাতেও কলকাতা সবচেয়ে তলানিতে। ওই পাঁচ শহরের সংশ্লিষ্ট শতাংশগুলো হল যথাক্রমে ১২.৪, ৯.৯, ১০.৫৩, ১০.২ এবং ৯.৩।
এমনিতে সার্বিকভাবেই গোটা দেশে বৃদ্ধ নাগরিকদের অনুপাত বাড়ছে। ‘ইউনাইটেড ন্যাশনস পপুলেশন ফান্ড’ এবং নয়াদিল্লির ‘ইন্সটিট্যুট অব ইকোনমিক গ্রুপ’-এর সহযোগিতায় বেঙ্গালুরুর ‘ইনস্টিটিউট ফর সোসাইটি অ্যান্ড ইকোনমিক চেঞ্জ’ কিছুকাল আগে একটি সমীক্ষা করেছিল। তাতে দেখা যাচ্ছে, ২০০৯-এ যেখানে দেশবাসীর মধ্যে ষাটোর্ধ্ব ছিলেন ৭ শতাংশ, ২০৫০-এ তা বেড়ে ২০ শতাংশ হয়ে যেতে পারে।
কিন্তু কলকাতায় বাড়তি সমস্যাটা কী? ‘ইনস্টিটিউট অব ডেভলেপমেন্ট স্টাডিজের’ সমাজবিজ্ঞানী শাশ্বত ঘোষের মতে, ‘‘বিষয়টা নিয়ে আমি দীর্ঘদিন কাজ করছি। বেশ কয়েক দশক ধরে ভারতের অন্য বড় শহরের তুলনায় কলকাতায় সন্তান ধারণের হার দ্রুত কমেছে। সন্তান হবে কম, ওকে ভাল করে মানুষ করব— এই বোধটা এ শহরের লোকের মধ্যে অপেক্ষাকৃত বেশি। ফলে, এ শহরে কম বয়সীর সংখ্যা কম।’’ এ ব্যাপারে কী বলছে জনগণনার সমীক্ষা? ১৯৭১ সালে ১৫ থেকে ৪৯ বছরের মহিলাদের সন্তান ধারণের হার ছিল ২.১। সেটা এখন কমে দাঁড়িয়েছে ১.২-তে। চেন্নাই ও মুম্বাইতে এটা ১.৪। হায়দরাবাদ, বেঙ্গালুরু এবং দিল্লিতে সন্তান ধারণের হার যথাক্রমে ১.৬, ১.৭ এবং ২.২।
শাশ্বতবাবু অবশ্য স্বীকার করেন, কলকাতায় কম বয়সীদের সংখ্যা কমে যাওয়ার আর একটা কারণ কাজের অনিশ্চয়তা। তাঁর কথায়, ‘‘যাঁরা কর্মসূত্রে এ শহরে আছেন, তাঁদের একটা বড় অংশের আয় কম। আর একটা অংশ এমন কাজ করেন, যাতে ভবিষ্যতের অনিশ্চয়তায় ভোগেন। এই দুর্বল পরিস্থিতিতে অনেকেরই সন্তান ধারণে অনীহা।’’
বয়স্কদের সংখ্যাবৃদ্ধিতে সমস্যা কী হতে পারে? ‘অপটিমাম পপুলেশন ট্রাস্টের’ প্রাক্তণ কর্তা রোজামুন্ড ম্যাগডুগালের কথায়, ‘‘বয়স্কের সংখ্যা দ্রুত বাড়লে তাকে বলে ‘হাইপারএজিং’। সেক্ষেত্রে কম সংখ্যক পরবর্তী প্রজন্মের উপর বেশি সংখ্যায় বয়স্কদের দায়িত্ব এসে পড়বে। বয়স্করা অর্থনীতির সমস্যার কারণ হয়ে উঠতে পারেন।’’ এই মন্তব্যে সায় দিয়েছেন ইন্দ্রানি চক্রবর্তী। তাঁর মতে, ‘‘আগে থেকে সরকারকে সতর্ক ও সচেতন হতে হবে। কর্মসূত্রে যাঁরা বাইরে চলে যাচ্ছেন, তাঁদের অভিভাবকদের দেখার কেউ না থাকলে সামাজিক নিরাপত্তার ব্যবস্থা করতে হবে। কাজটা করতে হবে যত্ন নিয়ে, পরিকল্পনামাফিক।’’



