জঙ্গিবাদের উত্থান, বিস্তার, প্রসার, জঙ্গি কর্মকাণ্ডে অর্থায়ন, সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড রোধ, জঙ্গি দমন ও নির্মূলের জন্য কাউন্টার টেরোরিজম ব্যাটেলিয়ন গঠনের জন্য সরকারের কাছে একটি প্রস্তাব পাঠিয়েছে পুলিশ।
প্রস্তাব অনুযায়ী, আলাদা এধরনের ব্যাটালিয়নে সদস্য সংখ্যা হবে প্রথমে এক হাজার। পরে প্রয়োজন বিবেচনা করে সংখ্যা বাড়ানো হবে। এই ব্যাটেলিয়নের প্রধান হিসাবে থাকবেন একজন আইজি, তিনজন এডিশনাল আইজি, ৮০ জন এসপি ও কয়েকজন এডিশনাল এসপি ও তিনজন এএসপি। তাদেরকে দায়িত্ব দিয়ে পুলিশ থেকে অন্যান্য সদস্য নিয়ে এটা গঠন করার জন্য বলা হয়েছে। এটা করা হলে বাংলাদেশে জঙ্গি নির্মূলের গতি আরো বাড়বে এবং সফলভাবে কাজ করা যাবে। সরকারপ্রধান শেখ হাসিনা এখনও এর সম্মতি দেননি।
সংশ্লিষ্ট একটি সূত্র জানায়, জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটছে দিনে দিনে। এছাড়াও বর্হিবিশ্বের কিছু সক্রিয় গোষ্ঠী নানাভাবে বাংলাদেশে জঙ্গিবাদের প্রসার ঘটানোর চেষ্টা করছে। এখান থেকে তারা প্রায়ই সদস্য সংগ্রহ করার চেষ্টা করে। অনেককে তারা সংগ্রহও করে। সিরিয়াতে যুদ্ধে নিয়ে যেতে চায়। এছাড়াও বেশ কয়েকটি দেশ আছে যারা এই ব্যাপারে আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে তাদের আধিপত্য বিস্তার ও কর্মকান্ডের প্রসার ঘটাতে চাইছে। এই জন্য নতুন নতুন সদস্য সংগ্রহ করছে। বাংলাদেশ থেকেও এই ধরনের চেষ্টা রয়েছে। বাংলাদেশ থেকে যে কাউকে বললেই তারা চলে যায় এমন নয়। কিছু কিছু তরুণ আছে যারা এনিয়ে প্রশ্ন তুলে। যারা তাদেরকে উদ্বুদ্ধ করে তাদের কাছে জানতে চায় জেএমবিতো এখন বাংলাদেশে নেই তাহলে কে এটা চালায়। তখন তাদেরকে নানা রকম আশ্বাস দেওয়া হয়। আবার প্রমাণও দেওয়া হয়। এই তরুণ সমাজকে যাতে কেউ টার্গেট করে সিরিয়া নিয়ে যেতে না পারে সেই জন্য প্রতিরোধ ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে। সমাজেও সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। সেটা করার জন্য কেবল আইন শৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করলে হবে না। তাদের দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট করে সেল গঠন করা ছাড়াও এই জন্য সমাজের সকল মানুষের সচেতনতা তৈরি করা প্রয়োজন। সম্মিলিত ভাবেই জঙ্গি প্রসার ও দমন করতে হবে।
এই ব্যাপারে সূত্র জানায়, গত তিন চার বছর ধরেই জঙ্গী দমনের জন্য বিশেষ বাহিনী করার জন্য আলোচনা চলছে। ওই সময়ে প্রস্তাব করা হয় ব্যুরো অব পুলিশ কাউন্টার টেরোরিজম নামে সংস্থা করার জন্য। ওই সময়ে বিষয়টি আলোচনা হলেও পরে আর সেটা এগুয়নি।
এই ব্যাপারে বিশেষজ্ঞদের মতে, বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা চাড়া দিয়ে ওঠার চেষ্টা করছে। যখনই উঠছে তখনই নির্মূল করার চেষ্টা করা হয়েছে। বাংলা ভাই ও শায়খ আব্দুর রহমান সহ জেএমবির শীর্ষ নেতাদের ফাঁসি হওয়ার পর তাদের সব এলোমেলো হয়ে যায়। অনেকেই এলাকা ছেড়ে যায় আবার কেউ কেউ নতুন করে সংগঠিত হওয়ার চেষ্টা করে। এই জন্য মাঝে মাঝেই যারা পরিকল্পনা করেছে সেগুলো ব্যর্থ করে দিয়েছে।
তারা মনে করছেন, জঙ্গীবাদের প্রসার রোধ ও তাদেরকে নির্মূল করার জন্য কাউন্টার টেরোরিজম এর যে সব সংস্থার সেল করছে সেই সব সেল ও সংস্থাগুলোকে আরো শক্তিশালী করতে হবে। পাশাপাশি বাংলাদেশের প্রতিটি থানায় একটি করে কাউন্টার টেরোরিজম সেল (সিটি সেল) গঠন করা প্রয়োজন। অন্তত প্রতিটি থানায় এই জন্য তিনজন করে পুলিশ সদস্যকেও যদি দায়িত্ব দেওয়া যায় সেটা কার্যকর করা যাবে। কারণ এখন জঙ্গী দমনের জন্য বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থা কাজ করছে। র্যাব পুলিশও কাজ করছে। তবে সেই সব কাজগুলো যথাযথভাবে সমন্বিত হচ্ছে না। এই কারণে সাফল্য আসাও কঠিন।
সূত্র জানায়, জঙ্গীবাদ দমনে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থাও কাজ করছে। তবে এই কাজগুলোতে আরো বাড়ানো দরকার। গোয়েন্দারা বিভিন্ন বিষয়ে কাজ করছে। তারপরও জঙ্গী ও সন্ত্রাস দমনের জন্য জেলা পর্যায়ে ও থানা পর্যায়েও তাদের কর্মকান্ডের প্রসার ঘটানো প্রয়োজন। সেটা করে এরপর তাদেরকে সুনির্দিষ্ট করে দিতে হবে তাদের কোন টিম এই ব্যাপারে কাজ করবে। যারা জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদ দমনে কাজ করবেন তারা এই বিষয়ে দায়িত্ব পালন করবেন। সেটা করা গেলে সব সংস্থার ওই সব নির্দিষ্ট সদস্যরা যদি কাজ করেন তাহলে গ্রামেগঞ্জে, উপজেলা ও জেলা পর্যায়ে এবং বিভাগে পর্যায়ে যে সব তৎপরতা চালাবে সেটা তারা দমন করতে পারবে। এই জন্য ওই সব বাহিনীকে সব কিছুই ঢাকার সদর দপ্তর থেকে নিয়ন্ত্রণ করা হবে কিংবা এখান থেকে নির্দেশনা দেওয়ার পর তারা কাজ করবেন বিষয়টি এমন হবে না। বরং ওখানে তারা যখন ওই ধরনের খবর পাবেন তখন তারা সাথে সাথে অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থার কাউন্টার টেরোরিজম সেলের সঙ্গে কথা বলবেন, পুলিশেরও র্যাবের যারা কাজ করবেন ওই সব সেলের সঙ্গে কাজ করবেন। এই জন্য অভিযান পরিচালনা থেকে শুরু করে সব কিছুই করবেন। তথ্য আদান প্রদানের মাধ্যমেও কাজটা করা অনেক সহজ হবে।
এখন নতুন করে যদি কাউন্টার টেরোরিজম এর জন্য আলাদা করে ব্যাটেলিয়ন করা হয় তাহলে তাদের সদস্য সংখ্যা ১০০০ জন হলেও সেটা তেমনভাবে কার্যকর করা যাবে না। কারণ এখন যে শূণ্যতা রয়েছে সেটা রয়েই যাবে। এক হাজার জনকে ভাগ করলে এক এক উপজেলায় দুই জন করে হয়তো দায়িত্ব পাবেন। কিন্তু সেটা করে এটা ঠেকানো যাবে না। এই কারণে নতুন করে ব্যাটেলিয়ন না করে বরং এখন আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এরমধ্যে র্যাব, পুলিশ, গোয়েন্দা সংস্থার মধ্যে ডিজিএফআই, এনএসআই, ডিবি, এসবিসহ সকল গোয়েন্দা সংস্থার সকল বিভাগ, সকল জেলা, উপজেলা, থানা, প্রয়োজনে ইউনিয়ন পর্যায়েও সেল করা যেতে পারে। এছাড়াও অন্যান্য যে সব বাহিনীর গোয়েন্দা সেল রয়েছে তারাও কাজ করবে। তবে সেখানে সুনিদিৃষ্ট করে এই ব্যাপারে দায়িত্ব দিতে হবে তাহলে এই ব্যাপারে তাদের কাজ করা সহজ হবে। এখন ঢাকা থেকেই এই ব্যাপারে বেশির ভাগ কাজ হচ্ছে।
সূত্র জানায়, এখন সব সংস্থা ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সব বাহিনী এই ব্যাপারে কাজ করছে। কিন্তু কাজটা আরো সমন্বিতভাবে করা দরকার। সেটা করার জন্য প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে। এখন যথাযথ সমন্বয় হচ্ছে না। এর পেছনে রয়েছে দায়িত্বগুলো সুনির্দিষ্ট নয়। কোন কোন সংস্থার কি কি দায়িত্ব এই ব্যাপারে তারা কি করবেন সেটাও ঠিক করে দিতে হবে। তখন সব বাহিনীর একটা দায়িত্ব থাকবে।
অভিযোগ রয়েছে, এখন গোয়েন্দা সংস্থার কাছ থেকে প্রাপ্ত তথ্যের ভিত্তিতেই বেশিরভাগ সময় জঙ্গীদের ব্যাপারে অভিযান পরিচালিত হয়। কিন্তু অভিযান যারা চালায় তারা অপরাধীকে ধরতে পারলে বাহাবা নেওয়ার জন্য মিডিয়ার সামনে উপস্থিত করে। এই ব্যাপারে একজন কর্মকর্তা বলেন, জঙ্গি কর্মকান্ড পরিচালনা করতে চান এমন কাউকে গ্রেপ্তার করা হলে সেটা মিডিয়ার সামনে প্রচার না করে বরং এর সঙ্গে আরো যেসব সিন্ডিকেট রয়েছে সেটা ধরার চেষ্টা করা উচিত। জঙ্গি কর্মকান্ড করার প্রচেষ্টায় জড়িত থাকার অভিযোগে যখন কাউকে ধরা হয় এটা জানাজানি হয়ে গেলে তখন আর অন্যান্য সঙ্গিরাও বিষয়টি জেনে যায় এর পর তারা সচেতন হয়ে যায়। সেটা হলো পুরো গ্রুপটাকে ধরা সম্ভব হয় না। কিন্তু ধরার পর প্রচার করা না হলে নীরবে তাদেরকে কারাগারে পাঠিয়ে রাখলে অনেক সময় জানতেও পারবে না কোন কোন সদস্য গ্রেপ্তার হয়েছে। এবং তারা গ্রেপ্তার হয়েছে এটা না জানলে বুঝতেও পারবে না গ্রেপ্তারের পর কি তথ্য দিয়েছে।
সূত্র জানায়, জঙ্গীবাদের প্রচারণার কারণে দেশের ভাবমুর্তিও নানা সময়ে নষ্ট হয়েছে। এই বিষয়টাকে সামনে রেখে আন্তর্জাতিক মহলে কেউ কেউ এই দেশে জঙ্গিবাদ আছে সেটাও বলছে। এতে আমাদের লাভ হচ্ছে না লোকসানই বেশি হচ্ছে।
সূত্র জানায়, একই বিষয়ে সবাই কাজ করতে চাইলে হবে না। এতে সময় ও শ্রম দুটোরই অপচয় হয়। এই কারণে সবাই একই কাজ করার কারণে কোন কোন বাহিনীর মধ্যে এই ব্যাপারে প্রচারণা নিয়ে প্রতিযোগিতাও রয়েছে। এই প্রতিযোগিতাটি বন্ধ করতে হবে। সেটা বন্ধ করতে হলে সরকারকে ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কেই ঠিক করে দিতে হবে কোন কোন বাহিনীর কোন কোন সেল কি কি কাজ করবে। এই জন্য সব বাহিনীর সঙ্গে বসেই এটা ঠিক করা যেতে পারে। দায়িত্ব সুনির্দিষ্ট না হলে সমস্যা থাকবেই।
স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে এর আগের সরকারের আমলে সিটির বিশেষ ব্যুরো গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। এরপর এটা নিয়ে আলোচনা হলেও পরে সেটা আর এগোয়নি। সম্প্রতি নানা ধরনের গুপ্ত হামলা, বিদেশি হত্যা, ব্লাগার হত্যা, পীর হত্যাসহ এই ধরনের হত্যাকান্ড বেড়ে যাওয়ার কারণে আবার বিষয়টি সামনে আসে। এখন সেটাকে পুলিশের বিশেষ ব্যাটেলিয়ন করার প্রস্তাব দেওয়া হয়। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী এই ব্যাপারে ইতিবাচক মত দেননি।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল বলেন, জঙ্গী, সন্ত্রাসবাদ আমাদের দেশে তেমনভাবে নেই। তবে যারা এই ধরনের কাজ করার পরিকল্পনা করছে ও মাথা চাড়া দিয়ে উঠার চেষ্টা করছে তাদেরকে আমরা নির্মূল করছি। সাম্প্রতিককালে যে সব ঘটনা ঘটেছে এই সব ঘটনার প্রেক্ষিতে আমরা আরো কার্যকর ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা কেমন করে নেওয়া যাবে সেটা নিয়ে আলোচনা করছি। ইতোমধ্যে নানা পদক্ষেপও নেওয়া হয়েছে। তিনি বলেন, এই ধরনের ঘটনা ঘটিয়ে কেউ পার পাবে না। আমরা অপরাধীদের ধরতে পারবো বলে আশা করছি। এই জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনী কাজ করছে। গোয়েন্দারাও সতর্ক রয়েছে। জঙ্গী ও সন্ত্রাসবাদের বিস্তার, প্রসার রোধে ও এই ধরনের সকল কর্মকান্ড বন্ধে আরো কার্যকরী পদক্ষেপ নেব।


