বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

পুলিশ কেন টার্গেটে?

savar-police-murder

ঢাকার আশুলিয়ায় বুধবার পুলিশ চেকপোস্টে তল্লাশির সময় দুর্বৃত্তরা কুপিয়ে এক পুলিশ সদস্যকে হত্যা করেছে৷ এ নিয়ে গত একমাসে চেকপোস্টে তিন পুলিশকে হত্যা করা হয়েছে৷

বিশ্লেষকরা বলছেন, “পুলিশের ওপর এই হামলা পরিকল্পিত৷ যারা হামলা করছে তারা পুলিশের মেরুদণ্ড ভেঙে দুর্বল করে দিতে চাইছে৷ তারা দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়। আর এর থেকে পরিত্রাণ পেতে হলে সরকারকে সিরিয়াস হতে হবে।”

বুধবার আশুলিয়ার বাড়ইপাড়া চেকপোস্টে সকাল আটটার কিছু আগে দুটি মোটরসাইকেল থামিয়ে তল্লাশি করতে গেলে সঙ্গে সঙ্গে দুই মোটরসাইকেলে থাকা ছয় জন নেমে তাদের ব্যাগে থাকা চাপাতি দিয়ে পাঁচ পুলিশ সদস্যকে এলোপাতাড়ি কুপিয়ে পালিয়ে যায়৷ তাদের মধ্যে শিল্প পুলিশের কনস্টেবল মুকুল হোসেন ঘটনাস্থলেই নিহত হন৷

হাসপাতালে চিকিৎসাধীন পুলিশ কনস্টেবল পিনাকুজ্জামান বলেন, ‘‘আমাদের সবার হাতেই অস্ত্র ছিল, কিন্তু আমরা কিছু বুঝে ওঠার আগেই দুর্বৃত্তরা হামলা চালায়৷ প্রতিরোধেরও সুযোগ পাইনি৷”

এদিকে, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল ঘটনাস্থল পরিদর্শন শেষে সাংবাদিকদের জানান, ‘‘এটা পরিকল্পিত হত্যাকাণ্ড৷ আগে যারা পুলিশ হত্যা করেছে এটা তাদেরই কাজ৷ তারা পুলিশের মনোবল ভেঙে দিয়ে দেশে অস্বাভাবিক পরিবেশ তৈরি করতে চাইছে৷”

শনিবার ঢাকার আজিজ সুপার মার্কেটে জাগৃতি প্রকাশনীর কার্যালয়ে প্রকাশনীর কর্ণধার ফয়সাল আরেফিন দীপনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে দুর্বৃত্তরা৷ শনিবার তার দাফন সম্পন্ন হয়৷ এই ঘটনার কিছুক্ষণ আগেই ঢাকার লালমাটিয়ায় ‘শুদ্ধস্বর’ প্রকাশনী কার্যালয়ে ঢুকে প্রকাশক আহমেদুর রশীদ চৌধুরী টুটুলসহ তিনজনকে এলোপাতাড়ি কোপায় দুর্বৃত্তরা। এখন তারা চিকিৎসাধীন।

মানবাধিকার নেতা এবং আইন ও সালিশ (আসক) কেন্দ্রের পরিচালক নূর খান বলেন, ‘‘এটা নিশ্চিত যে পুলিশের ওপর এই হামলা পরিকল্পিত৷ যারা হামলা করছে তারা পুলিশের মেরুদণ্ড ভেঙে দুর্বল করে দিতে চাইছে৷”

তাদের উদ্দেশ্য কী? জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘‘তারা দেশে একটা নৈরাজ্যকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতে চায়৷ এটা দিয়ে কাদের লাভ হবে বা কারা এর নেপথ্যে আছে তা এখনো নিশ্চিত করে বলা মুশকিল৷ তবে আমি মনে করি ব্লগার হত্যা, বিদেশি হত্যা এবং পুলিশ হত্যা আলাদাভাবে দেখার কোনো সুযোগ নেই৷ এগুলো কোনো বিচ্ছিন্ন ঘটনা নয়৷”

‘‘এরা প্রমাণ করতে চাইছে সাধারণ মানুষ তো দূরের কথা, আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদেরও তারা পরোয়া করেনা৷ হত্যা করতে পিছপা হয়না৷ আর এটা দিয়ে তারা চূড়ান্তভাবে ভয়ের পরিবেশ সৃষ্টি করতে চাইছে৷ এটা সরকার যতো হালকাভাবে নেবে ততো পরিস্থিতি খারাপের দিকে যাবে৷”

খান বলেন, ‘‘দেশে অরাজক পরিস্থিতির সৃষ্টি হলে কোনো কোনো পক্ষের যেমন রাজনৈতিক লাভ আছে, তেমনি বিদেশি কোনো কোনো শক্তি লাভবান হবে৷ আর এটা থামাতে হলে সরকারকে রাজনৈতিক সমাধানের দিকে যেতে হবে৷ দেশে যে গণতন্ত্রহীনতা এবং রাজনীতিতে বিচ্ছিন্নতা চলছে তা দূর করতে হবে৷”

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্তর্জাতিক সম্পর্ক বিভাগের অধ্যাপক আমিনা মোহসিন নিউজওয়ার্ল্ডবিডি.কমকে বলেন, পুলিশ শুধু একটি প্রতিষ্ঠান নয়; এরা রাষ্ট্রের প্রতিক। তাদের ওপর হামলা, হত্যা এটা সত্যিই দুঃখজনক। দেশে ভীতিকর পরিস্থিতি সৃষ্টি করতেই পুলিশের ওপর হামলা চালানো হচ্ছে, হত্যা করা হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে দেশের পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করতে পারে।

“এসব হত্যাকাণ্ড ঘটার পর একে অন্যকে কাউন্টার ব্লেম না করে রাষ্ট্রকে বিষয়টির প্রতি গভীর মনোযোগ দিতে হবে। এরজন্য সরকারকে সিরিয়াস হওয়া দরকার।”

তিনি মনে করেন, এসব হত্যাকাণ্ড-হামলা নিয়ন্ত্রণে দ্রুত একটি শক্তিশালী অ্যান্টি টেররিজম সেল গঠন করতে হবে। পাশাপাশি একটি শক্তিশালী ও নির্ভরযোগ্য তদন্ত কমিটি গঠন করা উচিত। যাদের কাজ থাকবে শুধু এসবের মোকাবেলা করা।

আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য নিয়ে আওয়ামী লীগের যুগ্ম-সাধারণ সম্পাদক মাহাবুব-উল আলম হানিফের মন্তব্যের বিষয়টির ওপর দৃষ্টি আকর্ষণ করা হলে অধ্যাপক আমিনা মোহসিন বলেন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সামর্থ্য নেই আমি তা মনে করি না। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠান। রাষ্ট্র যারা পরিচালনা করেন, তারা যেভাবে তাদেরকে রাখবেন তারা সেভাবেই থাকবে। সুতরাং আমি মনে করি, ব্যর্থতা আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর নয়; ব্যর্থতা রাষ্ট্রের পরিচালকদের (সরকার)।

আরও পড়ুন