বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

উপজেলা পরিষদে ১৭ বিভাগ: আন্দোলনের যৌক্তিকতা নিয়ে ওঠা প্রশ্নের জবাব

(নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কমে প্রকাশিত ঢাকার কেরাণীগঞ্জ উপজেলার ইউএনও এবিএম ফখরুজ্জামান বিলাসের বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিত নিজেদের অবস্থান সম্পর্কে লিখেছেন ডা. মো. আনিছুর রহমান)

Upazila_১। ১৭ দপ্তর প্রধানগণ প্রত্যেককেই Self Drawing Officer, সরকারের যাবতীয় অর্থ ব্যয় হয় ট্রেজারী রুলস আনুসারে। ট্রেজারী রুলস হলো মহামান্য রাষ্ট্রপতির আদেশ। নিয়মানুযায়ী (ট্রেজারী রুল পারট-২, টিআর ১৬ এর অধীনে সাবসিডিয়ারী রুল ৫৬ এর টীকা ১, এস আর ১৩৯ (১), জিএফআর১১ নম্বর ধারা এবং জিএফআর রুল ২৫০) গেজেটেড সরকারী অফিসারগণকে নিজেদের বক্তিগত আর্থিক দাবী (যেমনঃ বেতন-ভাতাদি, ভ্রমণভাতা, অগ্রীম প্রভৃতি) নির্ধারিত ফরমে (টিআর-১৩) উত্তোলনের ক্ষমতা প্রদান করা হয়েছে। হস্তান্তরিত দপ্তর প্রধানগণকেই আর্থিক স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে হবে এবং নিরীক্ষা কার্যাদির দায়ভার বহন করতে হবে। কাজেই গেজেটেড অফিসারগণের বেতন-বিলে অন্যকোনও কর্মকর্তার কাছে প্রদান বিধি পরিপন্থী, অমর্যাদাকর ও অগ্রহণযোগ্য। উল্লেখ্য যে গেজেটেড অফিসারের বেতন-বিলে নিয়ন্ত্রকারী অফিসারও স্বাক্ষর করেন না। বেতন বিলে UNO-র Involvement হলে স্ব-স্ব বিভাগের চেইন অব কমান্ড ভেংগে পড়বে সেটা যে নিশ্চিত তা বলা যায়।

২। মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তা/করমচারীদের বেতন বিল নিশ্চয়ই মাননীয় মন্ত্রী এবং সচিব মহোদয় যৌথভাবে পরিচালনা করেন না। সেখানে প্রত্যেক ক্যাডার অফিসার নিজেই নিজের বেতন বিল স্বাক্ষর করেন। মন্ত্রণালয়ে এমনটি হলে উপজেলা পর্যায়ের কর্মকর্তা/কর্মচারীদের মর্যাদা হরণ করার উদ্দেশ্য কি?

৩। কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রকল্পে কেন শুধু ইউএনও স্বাক্ষর করবেন, উপজেলা চেয়ারম্যান নয় কেন? এটা কি উপজেলা পরিষদ আইনের পরিপন্থী নয়?

৪। পূর্বে কেন্দ্রীয়ভাবে পরিচালিত প্রকল্পে ইউএনও ও দপ্তর প্রধানের যৌথ স্বাক্ষর ছিল না, বিচ্ছিন্ন দু’একটি প্রকল্প ছাড়া।

৫। ইউএনও হলেন উপজেলা পরিষদের সচিব অর্থাৎ পরিষদের কাজে সাচিবিক দায়িত্ব পালন করাই তার কাজ (উপজেলা পরিষদ আইন ১৯৯৮/বিধি-৩৩)। যেমনটি করেন ইউনিয়ন পরিষদের সচিব। তিনি কাগজপত্র, নথি ইত্যাদি অনুমোদনের জন্য উপজেলা চেয়ারম্যানের নিকট উপস্থাপন করবেন (এস,আর,ও-৪৪ আইন/২০১০, বিধি-১৪)।

৬। তিনি যেহেতু উপজেলা পরিষদের সচিব, বিধায় উপজেলা নির্বাহী অফিসারের কার্যালয় লেখার কোনও অধিকার কি তার রয়েছে? তিনি শুধু তাই লেখেননা, তিনি তার অফিসের সামনে /উপজেলার মূল ফটকে লেখেন- ‘‘উপজেলা প্রশাসন”। সরকারী কর্মচারী কখনো শাসক হতে পারেন না। এটা লেখা কি আদৌ বিধি সম্মত? (স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের ৬ ফেব্রূয়ারী/২০১২ তারিখের ৪২৯ নং স্মারক)।

৭। উপজেলা পরিষদে হস্তান্তরিত একজন কর্মকর্তা হওয়া সত্ত্বেও উপজেলা নির্রাহী কর্মকর্তার ক্ষমতা ৯৮% এবং পরিষদের চেয়ারম্যানের ক্ষমতা ২% যা উপজেলা পরিষদের সরবশেষ আইনের পরিপন্থি এবং উন্নয়ন বিরোধী অসাংবিধানিক ব্রিটিশ ব্যবস্থা থেকেও নিকৃষ্ট।

৮। সংবিধানের ৫৯ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী নির্বাচিত প্রতিনিধিদের নিকট সরকার শাসনভার প্রদান করবে, কোনও কর্মকর্তার নিকট নয় এবং ৬০ অনুচ্ছেদ অনুযায়ী পরিষদ শুধুমাত্র নিজস্ব তহবিল রক্ষণাবেক্ষণের ক্ষমতা পাবে, সরকারের প্রদত্ত অন্য কোনও দপ্তরের তহবিল নয়।

৯। বেতন ভাতাদি প্রদানের যে নিয়মটি (৪০২ নং স্মারক অনুযায়ী) বর্তমানে হতে যাচ্ছে তা মোটামুটি এরকমঃ
ফাইল অনুমোদনঃ সংশ্লিষ্ট দপ্তর প্রধান করতৃক ফাইল ইনিশিয়েট > হিসাব রক্ষণ অফিস > এসি (ফাইন্যান্স) > ইউএনও > উপজেলা চেয়ারম্যান > হিসাব রক্ষণ অফিস > এসি(ফাইন্যান্স) > বেতন ভাতা। এবার বলুন কেন এই দীর্ঘসূত্রতা? এতে উন্নয়ন বাধাগ্রস্ত হবে এবং মধ্যস্বত্যভোগীদের দ্যৌরাত্ম বাড়বে। প্রতি মাসের ১ তারিখে বেতন পাওয়ার সুযোগ থাকবে কি?
বর্তমান নিয়মঃ দপ্তর প্রধান > হিসাব রক্ষণ অফিস > বেতন-ভাতা।

১০। বেসরকারী সংস্থায় কর্মচারীদের বেতন-ভাতা প্রতিমাসের ০১ তারিখে স্বয়ংক্রিয়ভাবে তাদের একাউন্টে জমা হয়। অথচ আমাদের ক্ষেত্রে একটি সহজ পদ্ধতিকে জটিল থেকে জটিলতর করা হচ্ছে। এটি কার স্বার্থে ? এটি কি উপজেলা চেয়ারম্যানকে ক্ষমতায়ন করার পদ্ধতি? সরকার যেখানে সবকিছু ডিজিটালাইজড করতে যাচ্ছে (One Stop Service) সেখানে আমরা যাচ্ছি এনালগ পদ্ধতিতে। কারা এই বিধিগুলি প্রণয়ন করছে? কি উদ্দেশ্যে এগুলি করা হচ্ছে?

১১। ২৬ ক্যাডারের প্রসংগে নেতিবাচক কথা বলেছেন। ২৬ ক্যাডার জেনে বুঝেই প্রতিবাদে শরীক হয়েছে। কারণ টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড সবার প্রয়োজন। এছাড়া পদ আপগ্রেডেশনও ২৬ ক্যাডারের দীর্ঘ দিনের দাবী। পদোন্নতির ব্যবস্থা না করেই বিদ্যমান টাইম স্কেল/সিলেকশন গ্রেড রহিত করা হয়েছে। এর উদ্দেশ্য যে অশুভ চিন্তার বহিঃপ্রকাশ তা এখন সবার জানা।

১২। উপজেলায় বিদ্যমান ব্যবস্থায় যেসকল বিভাগের কার্যক্রমে ইউএনও যৌথ স্বাক্ষর/সভাপতিত্ব করেন সেসকল কার্যক্রম সম্পাদনের জন্য ইউএনও অফিসে দীর্ঘ সময়/দীর্ঘদিন ধর্ণা দিতে হয় যা ভূক্তভোগীরাই জানেন। সেটা যে কতটা অস্বস্তিকর তা বোঝানো যাবে না। তিনি তো পরিষদের সচিব, তিনি কেন ২৫-৩০টি কমিটির সভাপতি? এগুলোর সভাপতি তো উপজেলা চেয়ারম্যানের হওয়া উচিত। উপজেলা চেয়ারম্যানেকে ক্ষমতায়ন করতে হলে সর্বত্র তাকেই মূল্যায়ন করতে হবে পরিষদের সচিবকে নয়।

১৩। আপনি যা লিখেছেন তা তো উপজেলা পরিষদ ম্যানুয়ালেরই বহিঃপ্রকাশ। যার প্রণেতা আপনারা। আইন জনগণের কল্যাণের জন্য, বিশেষ কাউকে ক্ষমতায়ন করার জন্য নয়। জনস্বার্থে আইন সংশোধন যোগ্য। মজার বিষয় হলো আপনি কিন্তু ট্রেজারি রুলসের কথা বেমালুম ভুলে গেছেন অথবা ‘হাইড’ করেছেন।

১৪। অর্থ কর্তন ও অগ্রিম আদায়ের অর্থ একত্র করে প্রতিমাসে ইউএনও সাহেব ট্রেজারিতে জমা দিবেন। এখন কি এটা হচ্ছে না? Personal Ledger Account যৌথভাবে পরিচালনা মূল উদ্দেশ্য কি? হঠাৎ করে ইউএনও’র Involvement এর কি প্রয়োজনীয়তা দেখা দিল তা বোধগম্য নয়। এ আইন তো হয়েছে ১৯৯৮ সালে।

১৫। আপনি বলেছেন প্রশাসনের কর্মকর্তারা মাত্র ৫-৭% সচিব হওয়ার সুযোগ পায়, অন্যরা ১%ও নয় কেন? সচিব পদটি তো আপনাদের জন্য ফিক্সড নয়। সিলেকশন গ্রেড রহিত করে, আমাদের মহাপরিচালক মহোদয়ের পদকে গ্রেড-১ করে আপনারা সেখানে বসতে চান। কারণ আমাদের তো পদোন্নতি/সুপারনিউমেরারী পদ নেই।

১৬। আপনার নিশ্চয়ই মনে আছে, যখন বিচার বিভাগ আলাদা হয় তখন আপনারা কি করেছিলেন। কেন করেছিলেন? সরকারের সিদ্ধান্তের বাহিরে আপনারা অবস্থান নিয়েছিলেন। যেটা প্রজাতন্ত্রের কর্মে নিয়োজিত একজন সরকারী কর্মচারী করতে পারে না। আমাদের অবস্থান সরকারের বিরুদ্ধে নয়। ২৬ক্যাডার ক্ষমতা চায় না, আমরা আমাদের ন্যায্য অধিকার ও মরযাদা চাই অর্থাৎ পূর্বের নিয়মগুলি বহাল থাকুক আমরা শুধু তাই চাই।

১৭। ৪ঠা জুনের যে স্মারকে সহকারী কমিশনারগণ (ভূমি) কে উপজেলা ফাইন্যান্স অফিসারের দায়িত্ব প্রদান করা হয়েছে তা বাতিল করার জন্য মাননীয় অর্থ মন্ত্রী জনপ্রশাসন মন্ত্রী মহোদয়কে একটি ডিও লেটার দিয়েছিলেন তার কার্যকারিতা নেই কেন? উক্ত ডিও লেটারে মাননীয় অর্থ মন্ত্রী যা আশংকা করেছিলেন এখন তো তাই হচ্ছে। বিধায় এই নৈরাজ্য যাদের কারণে সৃষ্টি হচ্ছে তাদেরকেই মোকাবেলার পন্থা খুঁজতে হবে বলে মাননীয় অর্থমন্ত্রী মহোদয়ের সাথে আমরাও একমত পোষণ করছি।

১৮। আপনি বলেছেন কিছু না বুঝে সরকারকে বিব্রত করতেই এগুলি করা হচ্ছে। আপনি কি মন থেকে একথা বলছেন? সরকারকে বিব্রত ২৬ ক্যাডার করেনি, করেছেন আপনারা। জনতার মঞ্চে ২৬ ক্যাডারের কেউ যায়নি। যত বিশৃঙ্খলা সৃষ্টি হয় তার আতুর ঘর কিন্তু ওই মন্ত্রণালয়। এটা আপনাকে মানতে হবে। হঠাৎ করে এতগুলি ইস্যু কেন আপনারা তৈরী করলেন? উপজেলা তো ভালই চলছিল। কোন সমস্যা কি ছিল? পুরো উপজেলা কে দু’ভাগ কেন করলেন? স্থানীয় সরকারকে শক্তিশালী করার যদি কোনও চাপ থেকে থাকে তাহলে উপজেলা চেয়ারম্যানকে শক্তিশালী করা দরকার। এই আইনগুলি এতদিন পর কেন কার্যকর করার চেষ্টা হচ্ছে? আগে করেননি কেন? বিদ্যমান আইন অনুযায়ী উপজেলা চেয়ারম্যানের কি কোনও ক্ষমতা আছে? সত্য স্বীকার করার মানসিকতা সবার থাকা উচিত। আশা করি আপনারাও তা স্বীকার করবেন। মাননীয় প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে দেশ যখন মধ্যম আয়ের দেশে পরিণত হতে যাচ্ছে ঠিক সেসময়ে এতগুলো ইস্যুর সৃষ্টি কার স্বার্থে?

আশা করছি প্রকৃচি-বিসিএস, নন-ক্যাডার ও ফাংশনাল গ্রুপের এই প্রশ্নগুলোর জবাব দিবেন।

ডা. মো. আনিছুর রহমান: উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা, গাবতলি, বগুড়া।

৫ নভেম্বর ২০১৫।

 O কেরানীগঞ্জের ইউএনও’র লেখা: উপজেলা পরিষদে ১৭ বিভাগ হস্তান্তর: আন্দোলনের যৌক্তিকতা

আরও পড়ুন