মিয়ানমারে সেনা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল থেইন সেইনের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থবির ছিল।রোহিঙ্গা ও নিরাপত্তাসহ কোনো ইস্যুতেই দু’দেশের মধ্যে সম্পর্ক অগ্রসর হয়নি। ফলে বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল যাতে গণতান্ত্রিক শক্তি মিয়ানমারে ক্ষমতায় যায়। এখন তেমন ফলাফল দেখে বাংলাদেশ বেশ আশ্বস্ত হলেও এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।
কূটনৈতিকরা বলছেন, রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দু’দেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এতে করে সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে। বিশেষ করে সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং উগ্রবাদী তৎপরতা বন্ধে চেষ্টা চালাতে হবে। মিয়ানমারে নোবেল বিজয়ী অং সান সুচির দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি (এনএলডি) বিজয়ী হওয়ায় দেশটির সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কে গতি আসতে পারে। যদিও এনএলডি ক্ষমতায় গেলেও মিয়ানমারের ওপর থেকে রাতারাতি সেনাবাহিনীর প্রভাব দূর হয়ে যাচ্ছে না। তবে গণতান্ত্রিক শক্তির ক্ষমতা নেয়ার ফলে দেশটি নিজেদের স্বার্থেই সুশাসন, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠার কাজ শুরু করবে। গণতন্ত্রের এসব প্রাতিষ্ঠানিক কার্যক্রম শুরু হলে পরোক্ষভাবে হলেও তার সুফল পাবে বাংলাদেশ।
মিয়ানমারে ৬৬৪ আসনের পার্লামেন্টে ২৫ শতাংশ আসন সেনাবাহিনীর জন্য বরাদ্দ থাকে। ফলে সেখানে ৪৯০ আসনে ভোট হয়েছে। তার মধ্যে ৩৩৩ আসন পেলে সরকার গঠন সম্ভব। সেনা সমর্থিত ক্ষমতাসীন দল ইউনিয়ন সলিডারিটি ডেভেলপমেন্ট পার্টি (ইউএসডিপি) প্রত্যাশার চেয়ে কম আসন পেয়েছে। ফলে সেনাবাহিনীর জন্য সংরক্ষিত আসন যোগ করেও তাদের দলের সরকার গঠন সম্ভব হচ্ছে না।
অপরদিকে, সুচির এনএলডি পেয়েছে প্রত্যাশার চেয়ে বেশি আসন। ফলে এটা স্পষ্ট যে, সুচির দলই সরকার গঠন করতে যাচ্ছে। যদিও সুচি দেশটির প্রেসিডেন্ট হতে পারবেন না। বিদেশী বিয়ে করায় সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতার কারণেই প্রেসিডেন্ট হতে পারছেন না তিনি। তবে তিনি এরই মধ্যে ঘোষণা করেছেন, তার ক্ষমতা প্রেসিডেন্টের ওপরেই থাকবে। এ নিয়ে তার পরিকল্পনা অবশ্য তিনি খোলাশা করেননি।
কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মিয়ানমারে নিযুক্ত বাংলাদেশের রাষ্ট্রদূত সুফিউর রহমান নির্বাচনের আগেই অং সান সুচির সঙ্গে সাক্ষাৎ করেছেন। নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা নোবেল বিজয়ী এই নেত্রীর কাছে চিঠি পাঠিয়ে অভিনন্দন বার্তা পৌঁছে দেবেন। সেনা সমর্থিত প্রেসিডেন্ট জেনারেল থেইন সেইনের সরকারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক স্থবির ছিল। রোহিঙ্গা ও নিরাপত্তাসহ কোনো ইস্যুতেই দুদেশের মধ্যে সম্পর্ক অগ্রসর হয়নি। ফলে বাংলাদেশের অপেক্ষা ছিল যাতে গণতান্ত্রিক শক্তি মিয়ানমারে ক্ষমতায় যায়। এখন তেমন ফলাফল দেখে বাংলাদেশ বেশ আশ্বস্ত হলেও এই সুযোগ কতটা কাজে লাগানো যাবে সেটাই এখন বিবেচ্য বিষয়।
নির্বাচনের ফলে বাংলাদেশের সীমান্তবর্তী রাখাইন রাজ্যে উগ্রপন্থী আরাকান ন্যাশনাল পার্টি বেশি আসন পাওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদারে চ্যালেঞ্জও রয়ে গেছে। এই উগ্র বৌদ্ধ জাতীয়তাবাদী দলটি রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের চরম বিদ্বেষী। এই শক্তির উত্থানে বাংলাদেশের সামনে উদ্বেগ রয়েই গেছে। এর ফলে রোহিঙ্গা সমস্যার সমাধান কঠিন হবে। রোহিঙ্গা সমস্যা ছাড়াও মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্কের আরেকটি ইস্যু হল নিরাপত্তা।
বিশেষ করে সীমান্তে স্থায়ীভাবে শান্তির অবস্থা সৃষ্টি করা। অং সান সুচি এই দুটি ইস্যুতে নির্বাচনের আগে কোনো কথাই বলেননি। নির্বাচনে রোহিঙ্গা সংখ্যালঘুদের ভোটাধিকার না থাকা এবং বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের ভোট বেশি থাকায় তিনি ভোটের বিষয় বিবেচনায় রেখে কিছু বলেননি। তবে পর্যায়ক্রমে গণতান্ত্রিক সংস্কার বিশেষ করে সুশাসন, আইনের শাসন ও মানবাধিকার প্রতিষ্ঠিত হলে এ দুই ইস্যু নিষ্পত্তির বিষয়টি উঠে আসতে পারে। তাছাড়া, মিয়ানমারে সামরিক জান্তার সরকারের আমলে সেখানে প্রতিষ্ঠান বলতে ছিল সেনাবাহিনী। অন্যসব প্রতিষ্ঠান দুর্বল ছিল। ফলে বাংলাদেশ প্রতিবেশী হয়েও বাণিজ্য, কানেকটিভিটি ইত্যাদি কোনো বিষয়েই অগ্রগতি করতে পারেনি।
এ বিষয়ে সাবেক পররাষ্ট্র সচিব হেমায়েত উদ্দিন বলেন, সামরিক জান্তার বদলে গণতান্ত্রিক শক্তি বিজয়ী হওয়াকে সাধুবাদ জানাই। বাংলাদেশের সঙ্গে প্রতিবেশী মিয়ানমারের সম্পর্ক জোরদারের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। ভারত, চীন ও পশ্চিমারা যেভাবে মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ককে কাজে লাগাচ্ছে, একইভাবে বাংলাদেশকেও নতুন সুযোগ কাজে লাগাতে হবে। এই লক্ষ্যে সব কূটনৈতিক প্রচেষ্টা চালিয়ে যেতে হবে। রাজনৈতিক পর্যায়ে সম্পৃক্ততা বাড়িয়ে দুদেশের মধ্যে আস্থার পরিবেশ সৃষ্টি করতে হবে। এতে করে সমস্যা সমাধান সম্ভব হবে। বিশেষ করে সীমান্তে মাদক ও অস্ত্র চোরাচালান বন্ধ, মানব পাচার প্রতিরোধ এবং উগ্রবাদী তৎপরতা বন্ধে চেষ্টা চালাতে হবে।
তিনি বলেন, সমুদ্রসীমা চিহ্নিত হয়ে যাওয়ায় মিয়ানমারের সঙ্গে একটা বড় অমীমাংসিত ইস্যু নিষ্পত্তি হয়ে গেছে। এখন রোহিঙ্গা ইস্যু নিয়েও আস্তে আস্তে অগ্রসর হতে হবে। তাছাড়া, আসিয়ানের সঙ্গে সম্পর্ক গড়ে তোলা এবং পূর্বের সঙ্গে কানেকটিভিটি গড়তে যতসব সুযোগ তা খুঁজে বের করতে হবে।
সাবেক রাষ্ট্রদূত এম হুমায়ুন কবির বলেন, মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াতে ফিরে আসাটা ইতিবাচক অগ্রগতি। এখন মিয়ানমারের সঙ্গে বাংলাদেশের সম্পর্ক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে। এই সুযোগকে যথাযথভাবে কাজে লাগাতে হবে। রোহিঙ্গা জনগোষ্ঠীকে কীভাবে ফেরত পাঠানো যায় সেই চেষ্টা অব্যাহত রাখতে হবে। পাশাপাশি, মিয়ানমারের সঙ্গে সম্পর্ক জোরদার করলে জনগণের অর্থনৈতিক উন্নয়নের সুযোগ সৃষ্টি হবে।
বিশেষ প্রতিবেদক,ঢাকা
নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডটকম


