বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

প্রশাসন ক্যাডার সিনেমার পরিচালকের মতো

প্রশাসন ক্যাডার, তার কাজ ও দর্শনবছর দেড়েক আগে ইন্ডিয়ার একটি পুরষ্কার বিতরণী অনুষ্ঠান দেখার সৌভাগ্য আমার হয়েছিল যেখানে একজন নতুন পরিচালক সেরা ফিল্ম ডিরেক্টর পুরষ্কার পান। উপস্থাপিকা পুরষ্কার গ্রহন ও সম্মানিত উপস্থিতির উদ্দেশ্যে কিছু বলার জন্য পরিচালক কে মঞ্চে ডাকলেন। পরিচালক মঞ্চে এসে একটা ছোট্ট গল্প শেয়ার করেছিলেন। এই লেখাটা সেই গল্প দিয়েই শুরু করা যাক! অনুষ্ঠানের পূর্বেই পরিচালককে জানানো হয়েছিল যে তিনি সেরা পরিচালক নির্বাচিত হয়েছেন। তিনি তার এই খুশির খবর গ্রামে বসবাসরত অল্পশিক্ষিত মাকে প্রথম দেন।

মা খুব খুশি হলেন। কিন্তু সাথে সাথে জিজ্ঞেস করলেন বাবা তুই আসলে সিনেমাতে কি করিস? তোর ভুমিকা টা কি? তুই কি নায়ক? অভিনয় করিস? পরিচালক বললেনঃ না!

তুই কি গায়ক? গান করিস? পরিচালকঃ না তো মা!

তুই কি ক্যামেরা চালাস? নাচিস? গল্প লেখস? নায়ক নায়িকারে সাঁজায়ে দিস? পরিচালক বিব্রত হয়ে উত্তর দিলেন এইগুলোর একটাও আমি করি না। এসবের জন্য আলাদা আলাদা লোক আছে। নায়ক, গায়ক, ক্যামেরাম্যান, স্ক্রিনপ্লে লেখক, নৃত্যপরিচালক, মেকাপ ম্যান সবাই নিজের কাজটুকু করে!

মা জিজ্ঞেস করলেন “ তাহলে তুই কি? তোরে পুরষ্কার দিছে কেন?” পরিচালক বললেন “ আমি ওদের সবাইকে এক সুতোয় গাথি, সবাই যাতে তার কাজটুকু ঠিকমতো করেন সেটা দেখি, কারও কোন সমস্যা হলে সহযোগিতা করি”

প্রশাসন ক্যাডার এই দেশে বর্ণিত পরিচালকের কাজটুকু করে। সমন্বয়, পরামর্শ, সহযোগিতা নিয়ে একটা টিমের ম্যানেজার হিসেবে টিমের দেখভাল করাই আমাদের কাজ। কিন্তু এখনি আমার অন্য সকল ক্যাডার/ নন- ক্যাডার ভাই বোনেদের চোখে পড়বে যে কেন আমি আমাদেরকে পরিচালক বলেছি। হ্যাঁ, দেশের উন্নয়নে আমরা ম্যানেজার/ পরিচালকের ভুমিকায় নামি বটে কিন্তু আপনারাই হলেন আসল নায়ক। একজন ম্যানেজার এর কাজ কি আসলে? Getting Things Done By Others. আমাদের মালিক রাষ্ট্র যাকে যে দায়িত্ব দিয়েছে আমাদের সেটাই আমাদের আমানত!

জেনারেল ক্যাডার ও টেকনিক্যাল ক্যাডার বিতর্কঃ
যদিও বিসিএস এ দুই ধরনের ক্যাডার বিভাজন আছে কিন্তু সত্যিকার অর্থে জেনারেল ক্যাডার বলে কিছু নেই। সবাই স্পেশালিষ্ট। যে ভদ্রলোক আজকে পুলিশে যোগ দিলেন, সরকার তাঁকে ট্রেনিং দিয়ে আইনশৃঙ্খলা রক্ষার উপযোগী করে তৈরি করেছে সেও স্পেশালিস্ট। ফরেন সার্ভিসে যোগ দিলেন যিনি তিনি আগে কিসে পড়েছেন তা সাথে সাথেই গৌন হয়ে গেল। যোগ দেয়ার দিন থেকেই তিনি ক্যারিয়ার ডিপ্লোম্যাট বিবেচিত হবেন! আমার একটা জিনিস অদ্ভুত লাগে! সবাই কেন ভাবেন যে আমলাতন্ত্রের জন্য কোনও বিশেষায়িত জ্ঞানের প্রয়োজন নাই? একটা দেশের সবাই আমলা হবে? পাবলিক এডমিনিস্ট্রেশন ডিসিপ্লিন তাহলে সারা পৃথিবীতে শত বছর পূর্ব থেকে আলাদা করে গুরুত্ব পাচ্ছে কেন? যে অফিসারকে রাষ্ট্র নিয়োগ দিল আমলা বানানোর জন্য, দেশে বিদেশে ট্রেনিং দিল, যোগদানের পর থেকে জেলা উপজেলায় বিভাগে যে সমন্বয় শিখল, ফিল্ড ব্যুরোক্রেসি শিখে শিখে তিলে তিলে নিজেকে তৈরি করল সে আমলা হবে না? তার জন্ম যেখানে, যা সে শিখেছে জীবনভর সে তা করবে না? আপনি করবেন? কি অদ্ভুত চিন্তা! You people have to think Administration cadre is specialist in coordination, Bureaucracy and Public Policy.

উপ-সচিব পুল, সুপ্রিম কোর্টের রায় ও আমাদের জ্ঞানের দৌড়:
স্পেশালিষ্ট বনাম জেনারেল ক্যাডার দ্বন্দ্ব এই দেশে নতুন না। ইতিহাস সম্পর্কে, প্রশাসনিক ব্যাবস্থা সম্পর্কে না জানা এটাতে ইন্ধন যুগিয়েছে। অনেকের ধারনা উপসচিব ও তার উপরের পদ গুলোতে যে ৭৫ ভাগ প্রশাসন ক্যাডার থেকে নিয়োগ হয় এটা মনে হয় আমরা ইচ্ছামত জোর করে নিয়ে নেই। কিন্তু আসল ঘটনা হল এটা হওয়ার কথা ছিল ১০০ ভাগ প্রশাসন ক্যাডারের। সচিবালয় বাংলাদেশ এডমিনিস্ট্রেটিভ ক্যাডারের লাইন প্রমোশন। প্রত্যেকের লাইনে প্রত্যেকে পদোন্নতি ঠিক ঠিক পান। জুনিয়র অবস্থায় একজন এডমিন অফিসার যে যন্ত্রণা, কষ্ট, পরিশ্রম ভোগ করেন এসব বলে বুঝানো যাবে না। কিন্তু একটু সিনিয়র হয়ে তারাই আবার এডমিন ক্যাডারের পদের দিকে তাকিয়ে থাকেন। কিন্তু এটা তো হওয়ার কথা ছিল না। আপনি যখন ক্যাডার চয়েস দিয়েছেন তখনি আপনি জানেন আপনার পদ সোপান কি? আপনি হয় বিসিএস মেরিট অনুযায়ী পিছনে ছিলেন অথবা বুঝে শুনেই এডমিন চয়েস দেন নি? সেক্ষেত্রে দায় কার?

মহামান্য সুপ্রিম কোর্টের রায়ের সারমর্ম:
যারা আজকে শুধু ফেসবুকে আক্রমন ও গালাগালির মাঝে আন্দোলন সীমাবদ্ধ রেখেছেন আপনাদের পূর্ব পুরুষেরা আরও একটু বেশিই চেষ্টা করে গেছেন। নিজেদের দাবী আদায়ে যতরকম অস্ত্র ছিল ব্যাবহার শেষে এই বিষয়টি শেষ আশ্রয়স্থল সুপ্রিম কোর্টে নিস্পত্তি হয়েছে। যার মামলা নম্বরঃ সিভিল আপিল নং-২৯৪-৯৮/২০০৩। একটি চূড়ান্ত নিস্পত্তি হয়ে যাওয়া বিষয় নিয়ে আদালতের আদেশের বিরুদ্ধে আন্দোলন আসলে কি ফল দেবে আমি জানি না। অথবা এই বিষয়টি নতুন প্রজন্ম হয়তো অবগত নয়!

চলুন দেখি মহামান্য সুপ্রিম কোর্ট কি বলেঃ
• “ উল্লেখ্য যে সিভিল সার্ভিসের মোট ২৯ টি ক্যাডারের মধ্যে সর্বউচ্চ স্থানে বিসিএস প্রশাসন অবস্থিত অর্থাৎ যেসকল প্রার্থী মেধাতালিকার উপরের দিকে স্থান অধিকার করিয়াছেন এবং প্রশাসন ক্যাডার এ যদি পছন্দ জ্ঞাপন করিয়া থাকেন তাহা হইলে বিসিএস প্রশাসন এর শুন্য পদসমুহে তাহাদিগকে নিয়োগের জন্য পিএসসি সুপারিশ করিবে। যে সকল প্রার্থী মেধা তালিকায় উচ্চতর স্থান প্রাপ্ত হইতে ব্যর্থ হইয়াছেন তাহারা তাহাদের পছন্দ সাপেক্ষে পরবর্তী বা তৎপরবর্তী ক্রমান্বয়ে ২৮ টি ক্যাডারে নিয়োগের জন্য যোগ্য হইতে পারেন।”

• আবার সকলের সমান সুযোগ বিষয়ে আদালত বলছেনঃ “এইভাবে সকল প্রার্থীগণ পিএসসি দ্বারা অনুষ্ঠিত পরিক্ষায় অবতীর্ণ হইবার সমান সুযোগ পান। তৎপর, প্রতিযোগিতামূলক পরিক্ষায় তাহাদের নিজ নিজ ফলাফল ও পছন্দের ভিত্তিতে বিভিন্ন ক্যাডারে নিয়োগ প্রাপ্তিতে সমান সুযোগ থাকে।”

• এভাবে প্রার্থীগণ নিজ মেধা ও পছন্দ অনুযায়ী বিভিন্ন শ্রেণিতে বিভক্ত হয়ে যায়!এ বিষয়ে আদালত বলেন “ উক্ত শ্রেণীতে বিভক্তিকরন যৌক্তিক ছিল এবং উহার যথাযথ ভিত্তি নিকষ (rational basis) রহিয়াছে বিধায় এইরুপ বিভিন্ন শ্রেণীতে বিভক্তিকরন আইন সঙ্গত।” “১৯৮১ সনের রুলস এর ২য় তফসিলে ২৯ টি পৃথক ক্যাডারের জন্য পৃথক পৃথক নিয়োগ/পদোন্নতির বিধান রহিয়াছে। এই শ্রেণীকরণ মোটেই অবৈধ নহে, বরঞ্চ সংবিধান সম্মত।”

• রাষ্ট্রের নির্বাহী বিভাগ, সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও যুগ্ম সচিবের দায়িত্ব সম্পর্কে আদালত বলেন “ প্রতিটি মন্ত্রনালয়ে একজন সচিব/ অতিরিক্ত সচিব থাকেন। তিনি মন্ত্রণালয়ের Principal Accounts কর্মকর্তা ও প্রধান নির্বাহী। তাহার প্রধান কার্য হইতেছে মাঠ পর্যায়ে সংগৃহীত তথ্য উপাত্তের উপর ভিত্তি করিয়া সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রিকে যথাযথ কর্ম-পন্থা নির্ধারণ করত; সিদ্ধান্ত লইতে (Policy Decisions) সহায়তা করা। / এইরুপ কর্ম পন্থা নির্ধারণ ও তাহা কাজে পরিণত করিতে সচিবের সহিত যুগ্ম সচিব ও উপসচিব সহায়ক ভুমিকা পালন করেন এবং তাহারা নির্বাহী সরকারের নির্বাহী অঙ্গ হিসেবে পরিচিত।”

• বিভিন্ন পর্যায়ে সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে ইউ এন ও থেকে বিভাগীয় কমিশনারের উপর। এঁরাই সচিবালয়ের সহিত সেতুবন্ধের মত কাজ করে! আদালত বলেন “ বিভিন্ন সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের দায়িত্ব থাকে বিভিন্ন পর্যায়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হইতে বিভাগীয় কমিশনার পর্যন্ত সকল কর্মকর্তাগণের উপর। প্রকৃতপক্ষে মাঠ পর্যায়ে প্রশাসন এবং নির্বাহী বিভাগের সর্বউচ্চ পর্যায়ের সহিত উপসচিব, যুগ্ম সচিব, অতিরিক্ত সচিব ও সচিবগন সেতুবন্ধের মত কাজ করেন। এই কারনেই ব্রিটিশ আমল হইতেই সচিবালয়ের উপসচিব ও তৎঊর্ধ্ব পদে সব সময়েই প্রশাসনিক কর্মকর্তাগন নিয়োগ ও পদোন্নতি পাইতেন।/ যেহেতু পিএসসি এর সুপারিশ পর্যায় হইতেই কর্মকর্তাগন বিভিন্ন ক্যাডারে শ্রেণীভুক্ত হইয়া যায় সেই হেতু সচিবালয়ে প্রশাসনিক উপসচিব পদে প্রশাসনিক কর্মকর্তাগণ ব্যাতিরেকে অন্য ক্যাডারের কর্মকর্তাগণের পুনরায় নিয়োগ বা পদোন্নতি প্রাপ্ত হইবার কোন সহজাত অধিকার নাই।”

• এরুপ অবস্থায় সিভিল সার্ভিস (প্রশাসন)এর জন্য ৭৫% সংরক্ষণ যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও সংবিধানসম্মত হইয়াছে! আদালতের মতে, “এইরুপ আইনত অবস্থায় ১৯৯৮ সনের উপসচিব পদে নিয়োগ/ পদোন্নতির নীতিমালায় বা ২০০২ সনের বিধিমালায় ৫ বিধি এবং তৎসংশ্লিষ্ট প্রথম তফসিলে বর্ণিত পদ্ধতি যে ৭৫% পদ সিভিল সার্ভিস প্রশাসন এবং অবশিষ্ট ২৫% পদ অন্যান্য সকল ক্যাডারের সিনিয়র স্কেল পদে কর্মরত কর্মকর্তাগণের মধ্য হইতে পদোন্নতির মাধ্যমে উপসচিব পদে নিয়োগ প্রদানের বিধি প্রণয়নকে অযৌক্তিক বা যথাযথ ভিত্তি নিকষ বহির্ভূত হইয়াছে তাহা বলা যায়না, বরঞ্চ উক্ত বিধান যৌক্তিক, বাস্তবসম্মত ও সংবিধান সম্মত হইয়াছে বলিয়া প্রতীয়মান হয়।”

• তবে এই পর্যায়ে এসে অন্য ক্যাডার থেকে আসা ২৫ ভাগ উপসচিবসহ সকলের ক্যাডার পরিচয় থাকবে না। সকলেই বাংলাদেশ সরকারের উপসচিব হইবেন এবং যুগ্ম সচিব ও উপরের পদে আর কোন কোটা থাকবে না! আদালতে ভাষ্যমতে “ যখনই কোন কর্মকর্তা ২০০২ সনের বিধিমালা অনুসারে উপসচিব পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হইলেন, তাহা যে কোন ক্যাডার হইতেই হউক না কেন তিনি তখন একজন পরিপূর্ণ উপসচিব। তাহার পূর্বের ক্যাডার পরিচয় তখন বিলুপ্ত হইবে। তিনি সচিবালয়ের উচ্চতর উপসচিব পদে তখন অধিষ্ঠিত। সেই স্ট্যাটাস লইয়াই তিনি পরবর্তী উচ্চতর যুগ্ম সচিব পদে বা পরবর্তীতে অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি প্রাপ্ত হইবার জন্য বিবেচিত হইবেন” মহামান্য সুপ্রীম কোর্টের রায়ের অনুবাদ।

লেখাটিতে সম্পূর্ণভাবে প্রকৃত রেফারেন্স ব্যবহার করা হয়েছে। এটি জেনে অনেকের প্রশাসন ক্যডারের প্রমোশন ও পদায়ন নিয়ে ভ্রান্ত ধারণা কেটে যাবে।

(বাংলাদেশ অ্যাডমিনিস্ট্রেটিভ সার্ভিসের সৌজন্যে)

আরও পড়ুন