কিশোরগঞ্জে একজন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অভিনব জালিয়াতির আশ্রয় নিয়ে মুক্তিযোদ্ধার ভুয়া সনদের মাধ্যমে শিক্ষক পদে ১৫৮ জন প্রার্থীকে চাকরি পাইয়ে দেওয়ার অভিযোগ উঠেছে। অভিযোগে বলা হয়, এ কাজে প্রত্যেক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে তিনি এক থেকে তিন লাখ টাকা খেয়েছেন। তাঁর কার্যালয়ের দুজন অফিস সহকারী তাঁকে এ কাজে সহযোগিতা করেন।
ঘটনাটি কয়েক বছর আগের হলেও পরে তা দুর্নীতি দমন কমিশনের (দুদক) তদন্তে উঠে এসেছে। এই জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদক আজ সোমবার এসব কর্মকর্তা ও কর্মচারীর বিরুদ্ধে মামলা করার অনুমোদন দিয়েছে।
দুদক সূত্র জানায়, ঘটনাটি ২০০৮ ও ২০০৯ সালে ঘটে। কিশোরগঞ্জ জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের অধীনে ওই জেলার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে দেড় শতাধিক শিক্ষক নিয়োগ করার সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। আবেদন যাচাইবাছাই শেষে যোগ্য প্রার্থীদের তালিকা পাঠিয়ে দেওয়া হয় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরে। পরবর্তী সময়ে লিখিত পরীক্ষা শেষে প্রাথমিকভাবে নির্বাচিত প্রার্থীদের মৌখিক পরীক্ষার জন্য বাছাই করা হয়। সংক্ষিপ্ত তালিকাটি জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার কার্যালয়ে পাঠানো হয়। সেখানেই কারসাজির শুরু বলে অভিযোগ রয়েছে। জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা মোদাচ্ছের হোসেন তাঁর দুই অফিস সহকারীকে নিয়ে শুরু করেন তাঁর কর্মকাণ্ড।
২০১০ সালে ঘটনাটি ফাঁস হয়। ওই সময় প্রাথমিক ও গণশিক্ষা মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়। কমিটি মোদাচ্ছের হোসেনকে দোষী সাব্যস্ত করে তাঁকে বরখাস্ত ও তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার সুপারিশ করে। মন্ত্রণালয়ের পক্ষ থেকে অভিযোগটি দুদকে পাঠানো হলে দুদকের ময়মনসিংহ সমন্বিত জেলা কার্যালয় এর অনুসন্ধান শুরু করে।
পরবর্তী সময়ে এর অনুসন্ধানের দায়িত্ব নেয় দুদকের প্রধান কার্যালয়। দুদকের অনুসন্ধানে দেখা যায়, মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় আবেদনকারী চাকরিপ্রার্থীদের আবেদনপত্র থেকে মুক্তিযোদ্ধা সনদের কপিগুলো ফেলে দেওয়া হয়। অন্যদিকে সাধারণ আবেদনকারী কিছু প্রার্থীর আবেদনপত্রের সঙ্গে যোগ করে দেওয়া হয় কম্পিউটারে তৈরি করা ভুয়া সনদের অনুলিপি। নিজেদের কম্পিউটারে বসে এসব অনুলিপি তৈরি করেন প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তার দুই অফিস সহকারী। আবেদনকারীরা অবশ্য কারসাজির বিষয়ে কিছুই জানতেন না।
দুদকের অনুসন্ধানে পাওয়া যায়, পরবর্তী সময়ে নির্দিষ্ট আবেদনকারীদের মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য পরিচয় দেখিয়ে তালিকা তৈরি করে প্রাথমিক ও গণশিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠান ওই শিক্ষা কর্মকর্তা। সেখান থেকে মুক্তিযোদ্ধার পোষ্য কোটায় এসব চাকরিপ্রার্থীকে নিয়োগের অনুমতি দেওয়া হয়। এভাবে ২০০৮ সালে ৭৫ জন সহকারী শিক্ষক, ২০০৯ সালে ৮২ জন সহকারী শিক্ষক ও একজন প্রধান শিক্ষকসহ মোট ১৫৮ জনকে নিয়োগ দেন মোদাচ্ছের হোসেন। বিনিময়ে প্রত্যেক প্রার্থীর কাছ থেকে এক লাখ থেকে তিন লাখ টাকা নেন।
এই জালিয়াতি ও দুর্নীতির অভিযোগে দুদকের উপসহকারী পরিচালক নেয়ামুল আহসান গাজী তাঁদের বিরুদ্ধে মামলার সুপারিশ করেছেন। তাঁর সুপারিশের পরিপ্রেক্ষিতে কমিশন আজ মামলার অনুমোদন দেয়। যাঁদের বিরুদ্ধে মামলা হচ্ছে তাঁরা হলেন কিশোরগঞ্জের সাবেক জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা (বর্তমানে বরখাস্ত) মোদাচ্ছের হোসেন এবং দুজন অফিস সহকারী আবুল কালাম ও আবদুল হক। শিগগিরই কিশোরগঞ্জ থানায় মামলাটি করা হবে বলে জানা গেছে।


