বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপি চলবে কার নেতৃত্বে?

Khaleda-Jobaidaমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে।

একসময়ের শক্তিশালী রাজনৈতিক দল বিএনপির কেন আজ এই করুন অবস্থা? এভাবেই কি তাহলে দলটি ধীরে ধীরে বিলীন হয়ে যাবে? না কি আসবে এক নুতন রূপে? বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া কি তাহলে রাজনীতি থেকে অবসরে যাচ্ছেন? না কি সুস্থ হয়ে শীঘ্রই দেশে ফিরে আসবেন? আর কতদিন থাকবেন তিনি লন্ডনে? শুধুই কি চিকিত্সার জন্য তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন? দলের এই সংকট মুহুর্তে এত দীর্ঘ সময় তার বিদেশ অবস্থান নিশ্চই দলের জন্য শুভ নয়? তবুও তিনি কেন আছেন লন্ডনে? এই প্রশ্নগুলো আজ দেশ বিদেশে সকলের মুখে মুখে। এদিকে সরকারের কয়েকজন মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের কিছু কিছু নেতারা বেগম খালেদা জিয়া আর দেশে ফিরে আসবেন না বলে জানিয়েছেন। আসলেই কি তিনি আর বাংলাদেশে ফিরে আসবেন না? তাহলে কি সত্যি সত্যি গ্রেফতারের ভয়ে তিনি দেশে ফিরে আসছেন না? তবে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন খালেদা জিয়ার দেশে ফিরে আসা শুধু সময়ের বেপার। বিএনপি নেত্রী আবার দেশে ফিরে আসবেন এবং দলকে নুতন করে পুনর্গঠিত করবেন।

এদিকে খালেদা জিয়ার অনুপুস্থিতিতে মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠনে তৎপর হয়েছেন বিএনপির ভেতরে থাকা অনেক নেতারা। তারা আগামী ২০১৯ নির্বাচনকে লক্ষ্য করে ইতিমধ্যে নতুন দল গঠন অনেকদুর এগিয়েছেন বলে একটি সূত্র জানিয়েছে। সম্প্রতি শমশের মবিন চৌধুরীর পদতেগ এই ইঙ্গিতই কি তাহলে দিচ্ছে? বিএনপির কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতারা বর্তমান বিএনপি জিয়ার আদর্শে চলছে না বলে অভিযোগ করছেন। অন্যদিকে খালেদা তারেক ভক্তরা বলছেন বিএনপি ঠিকই আছে। যারা একথাগুলো প্রচার করছেন তারা আসলে দলের ভেতরে ও বাহিরে থাকা সুবিধাবাদী শ্রেণী। বিএনপি আছে বিএনপি থাকবে। দল থেকে বেরিয়ে অন্য কোনো দল গঠন করা হলেও তাতে কোনো লাভ হবে না। কারণ বিএনপি থাকবে জিয়া পরিবারের কাছে যেমনটি আছে আওয়ামী লীগ শেখ পরিবারের কাছে।

কথাটার যুক্তিকতা নিয়ে প্রশ্ন আসতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। বঙ্গবন্ধু পরিবারের সাথে জিয়া পরিবারের কোনো তুলনা করা ঠিক হবে না। কারণ বঙ্গবন্ধুর আগমন ও সৃষ্টি রাজনীতির মাধ্যমে আর জিয়ার আগমন সামরিক বাহিনী থেকে এসে ক্ষমতা দখলের মধ্য দিয়ে। আওয়ামী লীগ বঙ্গবন্ধুর আদর্শে বিশ্বাসী একটি বিশাল রাজনৈতিক দল। দলটি এককভাবে বাংলাদেশের স্বাধীনতা সংগ্রামে নেতৃত্ব দিয়েছে। অন্যদিকে দীর্ঘ ২১ বত্সর ক্ষমতার বাহিরে থেকেও তারা প্রমান করেছে দলটির শক্ত অবস্থান। সেদিক দিয়ে তুলনা করলে বিএনপির ক্ষমতার বাহিরে থাকার সময় মাত্র সাত বত্সর। এরশাদের সময়ের নয় বছর ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন পরিস্থিতি।এই সময় আওয়ামী লীগের অবস্থানও ছিল সরকার বিরোধী। তাই বিএনপি এখন একটি বড় রাজনৈতিক পরীক্ষার সন্মুক্ষীন বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকেরা মনে করেন। পর্যবেক্ষক মহলের মতে এই পরিস্থিতিতে বিএনপি খালেদা তারেকের কাছে থাকলেও তারা আগের অবস্থানে আর ফিরে আসতে পারবে না।

বিএনপির এই সংকট মুহুর্তে দলের ভেতরে থাকা একটা অংশ বেরিয়ে গিয়ে আরেকটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠার কাজ অনেকদুর এগিয়ে এনেছে বলে মিডিয়ায় প্রকাশ হয়েছে। এখন শুধু সময়ের বেপার। আগামী বছরের কোনো এক সময়ে আনুষ্ঠানিকভাবে ঘোষণা আসতে পারে বলে তারা মনে করছেন। বিএনপি থেকে বের হয়ে গঠন করা এই নতুন দলে সংস্কারপন্থি নেতারা সহ বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতৃত্ব থেকে কয়েকজনের বেরিয়ে আসার সম্ভবনা রয়েছে। একই সঙ্গে এরশাদের জাতীয় পার্টি, এল ডি, পি ও বিকল্প ধারা সহ বিভিন্ন ছোটো ছোটো রাজনৈতিক দল, সাবেক সামরিক কর্মকর্তা ও সুশীল সমাজের একটা অংশ এই নতুন দলে যোগ দেবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে নতুন দল গঠনের কথা স্বীকার করেছেন বিএনপির কয়েকজন সাবেক নেতা। গণতন্ত্রের স্বার্থে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন বর্তমান সরকারের বিরুদ্ধে একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন অত্যন্ত জরুরি হয়ে পরেছে বলে তারা মনে করেন। আপাতত তারা বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভবিষ্যত পরিকল্পনা পর্যবেক্ষণ করছেন। তবে নুতন প্রতিষ্ঠিত এই দলটি মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীদের নিয়ে প্রতিষ্ঠা করা হবে বলে তারা দাবি করেন। কারণ মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে আওয়ামীকে এককভাবে আর রাজনীতি করতে দিতে তারা নারাজ। মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস টেনে আওয়ামী লীগকে তারা আর খোলা মাঠে রাজনীতি করতে দিবেন না বলে জানিয়েছেন।

এদিকে বিএনপি থেকে বহিষ্কৃত কেন্দ্রীয় নেতা ও সাবেক হুইপ শহিদুল হক জামাল জানান বিএনপির মধ্যে কোনো গণতন্ত্র নেই। পরিবারের স্বার্থ রক্ষার চেষ্টা করা হয় সব সময়। তাদের দিয়ে কীভাবে দেশে প্রজাতন্ত্র কায়েম হবে। তাই দেশের জনগণের কল্যাণে তারা নতুন একটি রাজনৈতিক দল প্রতিষ্ঠা করার চেষ্টা করছেন। তিনি বলেন বিএনপি ভাঙলে এজন্য খালেদা জিয়া নিজেই দায়ী থাকবেন অন্য কেউ নয়। তবে বিএনপি চেয়ারপারসনের সাবেক উপদেষ্টা মেজর জেনারেল (অব.) জেড এ খান বলেছেন তিনি শেষ পর্যন্ত বিএনপিতে ফেরার অপেক্ষা করবেন। তারপর যদি ডাক না আসে তাহলে অন্য কিছু করার চিন্তা ভাবনা করবেন। অন্যদিকে বিএনপির চেয়ারপারসনের উপদেষ্টা ও সাবেক শিক্ষামন্ত্রী ড. ওসমান ফারুক বলেন বিএনপিকে চাইলেই ভেঙে ফেলা যাবে না। দল ভাঙার যে গুজবের কথা বলছেন, সেটা আমিও শুনি। কিন্তু এসব বাস্তব নয়, আমার কাছে গুজবই মনে হয়।

বিএনপির ভেতরে চলা এধরনের ষড়যন্ত্রের কথা বেগম খালেদা জিয়া নিজেও অবগত। লন্ডনের এক নাগরিক সমাবেশে সরকার বিএনপিকে ভাঙার চেষ্টা করছে বলে তিনি অভিযোগ করেছেন। তিনি বলেন সামরিক বাহিনী সমর্থিত ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকার ক্ষমতায় থাকাকালীন বিএনপি ভাঙার চেষ্টা করে ব্যর্থ হয়েছেন। তবে পর্যবেক্ষক মহল তার এই বক্তব্যের সাথে একমত নয়। ঐ সময় বিএনপির অবস্থা ছিল সম্পূর্ণ ভিন্ন। আর বর্তমানে দল কি পর্যায়ে আছে তা বিএনপি নেত্রী ভালো করেই জানেন। ডক্টর ফখরুদ্দিন আহমেদের অস্থায়ী সরকারের সময় ভাঙ্গেনি বলে যে এখনও ভাঙবে না এমন কোনো কথা নয়। বিএনপির অবস্থা সুসংঘটিত থাকলে গত আন্দোলন কখনই বের্থ হওয়ার কথা ছিল না। খালেদা জিয়ার মার্চ ফর দা ডেমোক্রেসি আন্দোলনে তিনি কোনো নেতাকেই সাথে পাননি। শুধু নেতা কেন কর্মীরাও আসেনি বাহিরে। এই সময় নেতাদের তিনি পার্টি অফিসে আসার আহবান জানালে একমাত্র তার উপদেষ্টা ইনাম আহমেদ চৌধুরী ছাড়া আর কেউই গ্রেফতারের ভয়ে সেখানে যাননি। ইনাম আহমেদ চৌধুরী বিএনপির বড় কোনো নেতা নয়। তিনি একজন উপদেষ্টা মাত্র। তবু তিনি সেদিন বিএনপি নেত্রীর ডাকে সারা দিয়ে দলের কেন্দ্রীয় অফিসে গিয়ে পুলিশের হাতে গ্রেফতার হয়েছিলেন। এইসময় দলের বড় বড় নেতারা বেগম খালেদা জিয়ার ডাকে সারা না দিয়ে আত্বগোপনে ছিলেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের নেতারা অহরহ দাবি করে আসছেন বিএনপি অচিরেই ভেঙ্গে যাবে বলে। বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান শমসের মবিন চৌধুরী তার ইঙ্গিত বহন করছে বলে আওয়ামী লীগ নেতারা মনে করছেন। কারণ বিএনপির ভেতরে থাকা মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসীরা জামায়াতের সাথে না থাকার পক্ষপাতি। বিষয়টি তারা পরোক্ষভাবে বেগম খালেদা জিয়াকে বার বার ইঙ্গিতও দিয়েছেন। কিন্তু খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান জামায়াত ছাড়তে রাজি নয়। তাছাড়া বিএনপির অনেক সিনিয়ার নেতারা তারেক রহমানের নেতৃত্ব মানতে রাজি নয়। বিএনপি ভাঙ্গার পেছনে এটাকেও একটা বড় কারণ বলা যেতে পারে। শেষ পর্যন্ত বিএনপি এইবার ভাঙনের মুখে পড়বে বলেই পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন। মুক্তিযুদ্ধের চেতনায় বিশ্বাসী একটি নতুন রাজনৈতিক দল গঠন নিয়ে পর্দার আড়ালে চলছে জোর তৎপরতা। ইতিমধ্যে দফায় দফায় গোপন বৈঠকও হয়েছে বলে জানা যায় । এদিকে বিএনপির সর্বোচ্চ নীতি নির্ধারণী ফোরাম জাতীয় স্থায়ী কমিটির সদস্য নজরুল ইসলাম খান তারেক রহমান লন্ডনে অবস্থান করে রাষ্ট্রের দায়িত্ব পালনের জন্য প্রস্তুতি নিচ্ছেন বলে মন্তব্য করেছেন।

দলের এই কঠিন মুহুর্তে বিএনপির চেয়ারপারসনের দীর্ঘ সময় লন্ডনে অবস্থান এখন শুধু কেন্দ্রীয় নেতৃত্বেই নয় এমনকি তৃণমূলেও পরেছে নেতিবাচক প্রভাব, বিরাজ করছে হতাশা। চিকিত্সার কারণে তারেক রহমান যেভাবে বছরের পর বছর লন্ডনে পরে আছেন বেগম খালেদা জিয়াও কি তাহলে একই পথের পথিক? অন্যদিকে তারেক রহমানের দেশে না ফিরে আসার কারণ গ্রেফতারের ভয় বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করছেন।কারণ তিনি এখন সম্পূর্ণ সুস্থ।দেশে আসলে ততক্ষনাত গ্রেফতার হওয়ার ভয়েই মূলত তিনি লন্ডনে অবস্থান করছেন। তাহলে কি খালেদা জিয়াও গ্রেফতারের ভয়ে এখন লন্ডনে? তিনি কি তাহলে তার মামলার রায়ের অপেক্ষায় আছেন? ইতিমধ্যে খাদ্যমন্ত্রী অ্যাডভোকেট কামরুল ইসলাম বলেছেন, জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট ও জিয়া চ্যারিটেবল ট্রাস্ট দুর্নীতি মামলায় বিএনপি চেয়্যারপারসন বেগম খালেদা জিয়ার সাজা হতে পারে বলেই তিনি বার বার দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিলেও পরিবর্তন করছেন। নৌ পরিবহন মন্ত্রী শাজাহান খান এম পি বলেছেন খালেদা জিয়া জেলকে ভয় পান, তাই বিদেশে পালিয়েছেন। এখন আর দেশে ফিরবেন না।

বিএনপির ভবিষ্যত কি তাহলে এখন অন্ধকারে? সূত্র মতে দলের এই সংকট উত্তরণে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের অবর্তমানে এখন সামনে আসছে পরিবারের বধু ডাক্তার জুবায়দার নাম। এসম্পর্কে অনেক আগে আমি একটি লেখা লিখেছিলাম। খালেদার অনুপুস্থিতিতে একমাত্র ডাক্তার জুবায়দাই পারবেন দলকে সামনের দিকে নিয়ে যেতে। শিক্ষিত, মার্জিত, ভদ্র এবং সিলেটের এক সম্ভ্রান্ত পরিবার থেকে তার আগমন। জিয়া পরিবারের মধ্যে বিএনপিকে রাখতে হলে তারেক পত্নী ডাক্তার জুবায়দাই একমাত্র যোগ্য বেক্তি। অতীতের দিকে তাকালে দেখা যায় বিএনপির দু:সময়ে গৃহবধু হিসেবে বেগম খালেদা জিয়া সামনে এসে বিএনপির হাল ধরেছিলেন। বিএনপির বর্তমান অবস্থাটা একই না হলেও অনেকটা নেতৃত্ব শূন্য বলা যেতে পারে। অন্যদিকে সরকারের মন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের নেতারা বলেছেন খালেদা তারেক বিহীন বিএনপি আসলে তাদের কোনো আপত্বি নেই। কারণ খালেদা জিয়ার জামায়াত প্রীতি ও ১৫ আগস্ট জাতীয় শোক দিবসে মিথ্যা জন্মদিন পালন ও অন্যদিকে তারেক রহমান কর্তৃক বঙ্গবন্ধুকে নিয়ে অপমানজনক বক্তব্য এবং স্বাধীনতার ইতিহাসকে বিকৃতভাবে তুলে ধরার কারণে তারা এই দুইজনের উপর ক্ষিপ্ত। ডাক্তার জুবায়দা যদি সত্যি সত্যি এখন বিএনপির হাল ধরেন তাহলে সরকার, আওয়ামী লীগ ও দেশের মানুষ বিষয়টিকে কিভাবে গ্রহণ করবে? পর্যবেক্ষক মহলের মতে বিএনপির জন্য এই মুহুর্তে ডাক্তার জুবায়দার বিকল্প নেই। দলকে রক্ষা করতে হলে বিএনপির নেতৃত্ব তারেক পত্নী ডাক্তার জুবায়দার উপর ছেড়ে দিতে হবে। দলের এই সংকট মুহুর্তে এখন একটি প্রশ্নই সকলের কাছে, বিএনপি এখন চলবে কার নেতৃত্বে? খালেদা, তারেক না জোবায়দা?

আরও পড়ুন