মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে
বাংলাদেশ স্বাধীনতা লাভের পর পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে শূণ্য ভূমিতে পা রেখেছিলেন আমাদের মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান। শূন্য থেকে বিত্ত গড়ে তুলার স্বপ্ন নিয়ে সংগ্রামে নেমেছিলেন বঙ্গবন্ধু। বাংলাদেশের চারিদিকে তখন শুধু হাহাকার আর যুদ্ধবিদ্ধস্ত ধ্বংসের নিদর্শণ। যেদিকেই চোখ যায় শুধু নাই নাই আর নাই। এমন এক পরিস্থিতির মধ্যে বাঙালি জাতিকে রক্ষার করার লক্ষে বঙ্গবন্ধু বিশ্বের দরবারে সাহায্যের হাত বাড়াতে বাধ্য হয়েছিলেন। বঙ্গবন্ধুর আহবানে সমাজতান্ত্রিক দেশ সহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ থেকে আসতে থাকে সাহায্য। কিন্তু জাতির এতই দুর্ভাগ্য যে সেই সাহায্যের অনেকাংশ গরীবের ঘরে না গিয়ে উঠেছিল আওয়ামী লীগ নামধারী কিছু সংখ্যক সুযোগ সন্ধানী ও সুবিধাবাদীদের হাতে। দুর্নীতিপরায়ন এসকল ব্যক্তিরা বিদেশী সাহায্য কালোবাজারে বিক্রয় করে রাতারাতি বনে যায় বিত্তশালী। তাই একদিন বঙ্গবন্ধু বলেছিলেন আমার কম্বল আমি পায়নি। কোথায় গেল আমার কম্বল? আমি এত কষ্ট করে বিদেশ থেকে আমার দেশের মানুষকে রক্ষার জন্য ভিক্ষা করে সাহায্য নিয়ে আসি আর সেই সাহায্য চোরেরা সব চুরি করে নিয়ে যায়| এই চোরেরা অন্য কেউ ছিল না, ছিল আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ ও সুবিধাবাদী ব্যক্তি।
দেশের এমনি এক দুরবস্থার সময় একদিন তৃণমূল থেকে একজন আওয়ামী লীগ নেতা ঢাকায় গণভবনে বঙ্গবন্ধুর সাথে দেখা করতে এলে বঙ্গবন্ধু তাকে আর্থিক সাহায্য দেওয়ার জন্য তার রাজনৈতিক সচিব তোফায়েল আহমেদকে (তোফায়েল ভাই) নির্দেশ দেন। বঙ্গবন্ধুর নির্দেশে পরবর্তীতে সেই তৃণমূলের নেতার কাছে আর্থিক সাহায্য প্রেরণ করা হয়। কয়েক মাস পরে সেই নেতা বঙ্গবন্ধুর কাছে দেখা করে সাহায্যের জন্য কৃতজ্ঞতা জানাতে এলে বঙ্গবন্ধু আওয়ামী লীগ নেতাকে প্রেরণ করা অর্থ পেয়েছেন কি না জিজ্ঞাসা করলে তিনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করে পাওয়া অংকের কথা বলেন। বঙ্গবন্ধু তা শুনে রেগে গিয়ে চিৎকার করে তোফায়েল আহমেদকে ডাকলেন।
নেতার ডাক শুনে দৌড়ে কাছে এলেন তোফায়েল আহমেদ। বঙ্গবন্ধু তখন বললেন আমার গণভবন থেকে তৃণমূলে যেতে যদি অর্থের অংকের পরিমাণ এভাবে উধাও হয়ে যায় তাহলে দেশের অন্য জায়গার অবস্থাটা কি হতে পারে? এভাবে দেশ চলবে কি করে? কার এতবড় সাহস হলো এখান থেকে অর্থ মেরে খাওয়ার? জানি না পরবর্তীতে আসল চোর ধরা পরেছিল কি না! তবে একথা সত্য যে সেদিন আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা কিছু সংখ্যক দুর্নীতিবাজরা বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন স্বনির্ভর বাংলাদেশ গড়তে সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করেছিল। দলের নাম ভাঙ্গিয়ে কেউ কেউ করেছে ক্ষমতার অপব্যবহার আর সন্ত্রাসী। দেশের এই ক্রান্তিলগ্নে ঢাকার রমনার বটমূলে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ আয়োজিত এক সভায় তখন আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজদের একটি নামের তালিকা প্রকাশ করে বঙ্গবন্ধুকে তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য দাবি জানানো হয়েছিল। আজকের ছাত্রলীগের কাছ থেকে কি আমরা এধরনের একটা কিছু আশা করতে পারি না?
বাংলাদেশে আজ আবার একইভাবে সামনে আসছে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসীদের কথা| আসছে সাধারণ জনগণের নিরাপত্তা নিয়ে প্রশ্ন। আসছে সরকারের ছত্রছায়ায় সন্ত্রাসীদের লালন পালনের অভিযোগ। বঙ্গবন্ধুর কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার স্বপ্ন একটি সুখী সমৃদ্ধশালী বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠার লক্ষে এরাই এখন বড় বাধা হয়ে দাড়িয়েছে। আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা এসকল দুর্নীতিবাজ ও সন্ত্রাসীদের জন্য শেখ হাসিনার অগ্রযাত্রার পথে সৃষ্টি হচ্ছে প্রতিবন্ধকতা। যারা আজ আওয়ামী লীগের নাম ভাঙ্গিয়ে ক্ষমতার অপব্যবহার, সন্ত্রাসী ও দুর্নীতি করে কালো টাকার পাহাড় গড়ছে তারা কখনো দলের জন্য শুভ হতে পারে না। এদের নির্মূলে সময় থাকতে সরকারকে আরো কঠোর ব্যবস্থা গ্রহণ করতে হবে। আওয়ামী লীগের ভেতরে থাকা এক শ্রেণির লোকেরা যখন দলের ভেতরে দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি. সন্ত্রাসী ও ক্ষমতার লড়াই করছে ঠিক এইসময় জাতির জনকের কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা ঢাকার ধানমণ্ডি বত্রিশ নাম্বার রোডে অবস্থিত পরিবারের অতি মূল্যবান বাড়িটি দান করে দিয়ে দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। এই বাড়িটি এখন বঙ্গবন্ধু জাদুঘর বলে সকলের কাছে পরিচিত।
এখন আমার প্রশ্ন হলো যারা আওয়ামী লীগের ভেতরে থেকে দুর্নীতি, সন্ত্রাসী ও ক্ষমতার অপবেবহার করে দল ও দলের নেত্রীর সংগ্রামের পথে বাধার সৃষ্টি করছে তাদের কেন আজ শক্ত হাতে দমন করা হচ্ছে না? এদের যদি আজ নির্মূল করা না হয় তাহলে ঠিক বঙ্গবন্ধুর মতই প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলার পথে সৃষ্টি হবে প্রতিবন্ধকতা। ফলে প্রধানমন্ত্রীর স্বপ্ন বাংলাদেশকে মধ্যম আয়ের দেশ হিসেবে গড়ে তোলা আদৌ সফল হবে কি না তাতে সন্দেহ আসতে পারে| প্রধানমন্ত্রী ও তার মন্ত্রী পরিষদের অনেকেই বিষয়টি ভালোভাবেই অবগত আছেন বললে কি ভুল করা হবে? ইতিমধ্যে মন্ত্রী পরিষদ ও উপদেষ্টাদের কেউ কেউ প্রকাশ্যে দুর্নীতি ও সন্ত্রাসী কর্মকান্ড থেকে দলীয় কর্মী ও নেতাদের বিরত থাকার জন্য হুশিয়ারী পর্যন্ত করেছেন। কিন্তু চোরা না শুনে ধর্মের কাহিনী। এখন পর্যন্ত এবেপারে কোনো পরিবর্তন লক্ষনীয় নয়। আর কতদিন চলবে আওয়ামী লীগ এপথে? এজন্যই হয়তো আজ জনগণ ও বিরোধী রাজনৈতিক দল থেকে বলার সুযোগ আসছে নীরবতাই সন্মতির লক্ষণ।
বাংলাদেশে দুর্নীতি সন্ত্রাসী ক্ষমতার অপবেবহার আজ নিত্য নৈমেতিক বেপার হয়ে দাঁড়িয়েছে। দেশের মানুষ এ থেকে পরিত্রাণ চায়। একমাত্র বঙ্গবন্ধুর কন্যা শেখ হাসিনাই পারবেন দেশকে দুর্নীতি মুক্ত করতে। এজন্য তাকে কঠোর হতে হবে। আমরা একসময় ছাত্রলীগ থেকে স্লোগান দিয়ে বঙ্গবন্ধুকে বলেছিলাম, বঙ্গবন্ধু বঙ্গবন্ধু কঠোর হও কঠোর হও। আজ তার সুযোগ্য কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার উদ্দেশ্যে বলছি, সময় থাকতে আপনাকে আজ আরো কঠোর হতে হবে। আপনাকে চালাতে হবে দলে শুদ্ধি অভিযান। দেশের মানুষের ভালবাসা পেতে হলে, আওয়ামী লীগের জনপ্রিয়তা আরো বৃদ্ধি করতে হলে, বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন প্রতিটি মানুষের মুখে হাসি ফোটাতে হলে ও সবশেষে বাংলাদেশকে মধ্য আয়ের দেশ হিসেবে উন্নতি করতে হলে এর কোনো বিকল্প নেই। এই মুহুর্তে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস দমন হতে হবে সরকারের জন্য সবচেয়ে বড় কাজ। দেশের সাধারণ জনগনকে যদি প্রশ্ন করা হয় দেশের বর্তমান আইন শৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির জন্য দায়ী কে, জনগণ তখন এক বাক্কে বলবে আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকার| আর সরকারকে দায়ী করা মানে পরোক্ষভাবে বঙ্গবন্ধু কন্যা প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকেই দায়ী করা। এজন্যই আজ আওয়ামী লীগের ভেতর থেকেই আওয়াজ এসেছে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত আওয়ামী লীগ চাই, দুর্নীতি ও সন্ত্রাস মুক্ত বাংলাদেশ চাই।
সরকারের একজন গুরুত্বপূর্ণ উপদেষ্টা এবং দেশের অর্থমন্ত্রী মিডিয়ায় প্রকাশ্যে বলেছেন দুর্নীতির জন্য সরকারের অনেক কর্মসূচি সফল করার পথে অন্তরায় সৃষ্টি হচ্ছে। এভাবে চলতে থাকলে সরকারের বিভিন্ন উন্নয়ন পরিকল্পনা সফল করা সম্ভব নয়। আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফ দলীয় কর্মী ও নেতাদের উদ্দেশ্যে বলেছেন আপনাদের এই খাই খাই অবস্থান পরিহার করতে হবে। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের ভেতরে আজ সকলেই বলছেন বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের লক্ষে আমরা সংগ্রাম করছি।
তাদের উদ্দেশে যদি প্রশ্ন করা হয় বঙ্গবন্ধুর কি সেই আদর্শ? আসলেই কি তারা বঙ্গবন্ধুর আদর্শ বাস্তবায়নের জন্য কাজ করছেন? যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে দলের ভেতরে কে করছে এই দুর্নীতি আর সন্ত্রাস? দেশের তৃণমূল সহ সর্বস্তরে আওয়ামী লীগকে কে করছে এই জন বিছিন্ন করার অপচেষ্টা? শেখ হাসিনার উন্নয়নের পথে কে করছে এই অন্তরায়? তারা কেন এত শক্তিশালী?
জাতির জনকের সুযোগ্য কন্যা শেখ হাসিনার দ্বারাই একমাত্র সম্ভব সন্ত্রাস ও দুর্নীতিকে বাংলাদেশ থেকে চিরতরে নির্মূল করা| তিনি আজ যে লক্ষ্যকে সামনে রেখে রাত দিন পরিশ্রম করে চলছেন তার সফলতা দেখতে হলে দুর্নীতি আর সন্ত্রাসীদের বিরুদ্ধে পদক্ষেপ নেওয়ার সময় এখন। দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের বিরুদ্ধে সকল প্রকার সংগ্রামে জনগণ থাকবে শেখ হাসিনার পাশে| ইতিহাস বার বার প্রমান করেছে জনগনের শক্তি সবচেয়ে বড় শক্তি| জনগনের ভালবাসা সবচেয়ে বড় প্রেরণা। জনগণের সংগ্রাম সবচেয়ে শক্তিশালী সংগ্রাম। আজ এই জনগণকে সাথে নিয়ে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনাকে দুর্নীতি ও সন্ত্রাস নির্মূলের সংগ্রামে নামতে হবে। এই লক্ষকে সামনে রেখে আওয়ামী লীগের আসছে কাউন্সিল অধিবেশনে দলের ভেতরে থাকা দুর্নীতিবাজ, ক্ষমতার অপবেবহারকারী আর সন্ত্রাসীদের মদতদাতাকারীদের দল থেকে সরিয়ে দেয়াওয়াই হবে সবচেয়ে বড় ও দৃষ্টান্তমূলক পদক্ষেপ। এদের দলের বাহিরে রাখলে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার চলার পথ হবে আরো তরান্বিত ও গতিশীল। জাতির জনক বঙ্গবন্ধুর স্বপ্ন সোনার বাংলা ও দু:খী মানুষের মুখে হাসি ফুটানোর পথে আসবে সফলতা। বাংলাদেশ অচিরেই হয়ে যাবে একটি মধ্য আয়ের দেশ| সারা বিশ্ব দেখবে বাংলাদেশকে একটি উন্নয়নের মডেল হিসেবে। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সৃষ্টি করবেন এক বিশ্ব ইতিহাস| তাই আজ দেশ ও বিদেশে বসবাসরত জনগনের সাথে মিলে তীব্র কন্ঠে স্লোগান দিতে চাই, দুর্নীতি মুক্ত আওয়ামী লীগ চাই, সন্ত্রাস মুক্ত বাংলাদেশ চাই।
লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টির স্টকহলম হেসেলবি ভেলেংবি শাখার সভাপতি এবং সাবেক সমাজকল্যাণ সম্পাদক ঢাকা মহানগর ছাত্রলীগ ১৯৭৩-৭৪


