বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

অপরাধ স্বীকার করে নিজামীর সাজা কমানোর আবেদন

nizamiএকাত্তরে মানবতাবিরোধী অপরাধের দায়ে মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত জামায়াতের আমির মতিউর রহমান নিজামীর আইনজীবী আপিল শুনানিতে অপরাধ স্বীকার করে সাজা কমানোর আবেদন করেছেন।

তথ্যটি নিশ্চিত করেছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম। বলেন, “উনারা যে সাবমিশন করেছেন, আমি যা বুঝেছি, তাতে আমার মনে হল, জামায়াতে ইসলামীর পক্ষ থেকে তাদের শীর্ষ আইনজীবীরা এই প্রথম তাদের অভিযুক্ত একজন নেতা যে অপরাধী, তা তারা স্বীকার করে নিলেন এবং স্বীকার করে নিয়ে শুধু মৃত্যুদণ্ডের হাত থেকে অব্যাহতি পাওয়ার জন্য আবেদন করলেন।”

বুধবার আপিল শুনানির নবম দিনে নিজামীর আইনজীবীরা তাদের যুক্তিতর্ক উপস্থাপন শেষ করেন। এরপর রাষ্ট্রপক্ষে অ্যাটর্নি জেনারেল যুক্তি উপস্থাপন শুরু করেন। আগামী ৭ ডিসেম্বর আবারও তিনি এ মামলায় রাষ্ট্রপক্ষের যুক্তি আদালতের সামনে তুলে ধরবেন।

অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, “বক্তব্য শেষ করার শেষ প্রান্তে উনাদের শীর্ষ আইনজীবী খন্দকার মাহবুব হোসেন যেটা বলেছেন, ‘এটা তো ঐতিহাসিক ঘটনা যে খুন বা মানুষ হত্যা এগুলো হয়েছে এবং এগুলোর সঙ্গে সহযোগিতা করেছে সেই সময়ের জামায়াতে ইসলামী্। মতিউর রহমান নিজামী তার বিশ্বাস থেকেই এগুলো সমর্থন করেছেন।’

রাষ্ট্রের এই প্রধান আইন কর্মকর্তা বলেন, “শেষ মুহূর্তে খন্দকার মাহবুব বলেছেন, এগুলো যদি (নিজামী) করেও থাকেন, তবু বয়সের কথা চিন্তা করে তাকে মৃত্যুদণ্ড থেকে অব্যাহতি দেওয়ার অনুরোধ করেছেন তিনি। এটা… আমি যা বুঝেছি, সেটাই আপনাদের বললাম।”

বুদ্ধিজীবী গণহত্যা, হত্যা, ধর্ষণ, লুণ্ঠন, সম্পত্তি ধ্বংস, দেশত্যাগে বাধ্য করা, আটক, নির্যাতনসহ মানবতাবিরোধী অপরাধের ষড়যন্ত্র ও সংঘটনে সহযোগিতার অভিযোগ সন্দেহাতীতভাবে প্রমাণিত হওয়ায় গত ২৯ অক্টোবর নিজামীকে ফাঁসিতে ঝুলিয়ে মৃত্যুদণ্ডের রায় দেয় ট্রাইব্যুনাল।

জামায়াতে ইসলামীর আমির নিজামী একাত্তরে ছিলেন দলটির ছাত্র সংগঠন ইসলামী ছাত্রসংঘের নাজিমে আলা বা সভাপতি এবং সেই সূত্রে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত আল বদর বাহিনীর প্রধান।

স্বাধীনতাকামী বাঙলির ওপর দমন-পীড়ন চালাতে পাকিস্তানি বাহিনীকে সহযোগিতার জন্য গঠিত রাজাকার বাহিনী ও শান্তি কমিটিতেও তার গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল বলে ট্রাইব্যুনালের রায়ে উঠে আসে।

ওই রায়ের বিরুদ্ধে গত ২৩ নভেম্বর নিজামী সর্বোচ্চ আদালতে আপিল আবেদন করায় প্রধান বিচারপতি এস কে সিনহার নেতৃত্বাধীন চার সদস্যের আপিল বেঞ্চে তার শুনানি চলছে।

বুধবার প্রথমে নিজামীর পক্ষে যুক্তি উপস্থাপন করেন তার আইনজীবী এস এম শাজাহান। পরে যুক্তি উপস্থাপন শেষ করেন খন্দকার মাহবুব, যিনি বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার একজন উপদেষ্টা।

দিনের শুনানি শেষে অ্যাটর্নি জেনারেল সাংবাদিকদের বলেন, ফৌজদারি মামলায় একজন আসামি সব সময়ই বিকল্প যুক্তি দেখাতে পারে।

“ফ্যাক্টের ব্যাপারে প্রথমে অস্বীকার করেও পরে তারা বলতে পারে- ‘হ্যাঁ সেগুলো করেছি ঠিকই, তারপরও আমি মৃত্যুদণ্ড থেকে রক্ষা পেতে চাই’।”

আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইবুন্যালের রায়ের বিরুদ্ধে এর আগে নিষ্পত্তি হওয়া সাতটি আপিলের মধ্যে চার আসামির মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়েছে, একজনের হয়েছে আমৃত্যু কারাদণ্ড। আর দুজন আপিল শুনানি চলাকালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মারা গেছেন।

এই সাত আসামির মধ্যে জামায়াতে ইসলামীর পাঁচজন বা বিএনপির দুই নেতার কেউ শুনানি পর্যায়ে দোষ স্বীকার করেননি।

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, “জামায়াতের মামলার ব্যাপারে… আসামিপক্ষের আইনজীবীদের থেকে দোষ স্বীকার করে নেওয়ার ব্যাপারে এ ধরনের স্পষ্ট বক্তব্য আমি এই প্রথম দেখলাম।”

৭২ বছর বয়সী নিজামী চট্টগ্রামের ১০ ট্রাক অস্ত্র মামলারও মৃত্যুদণ্ডপ্রাপ্ত আসামি। ২০০১-২০০৬ সালের চার দলীয় জোট সরকারের সময় তাকে মন্ত্রিত্ব দিয়েছিলেন বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া।

একাত্তরে ন্যক্কারজনক ভূমিকার পরও তাকে ‘মন্ত্রিত্ব উপহার দেওয়াকে’ লাখো শহীদের প্রতি চপেটাঘাত বলা হয় ট্রাইব্যুনালের রায়ে।

২০১০ সালের ২৯ জুন ধর্মীয় অনুভূতিতে আঘাতের একটি মামলায় গ্রেপ্তারের পর ওই বছরের ২ অাগস্ট নিজামীকে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় গ্রেপ্তার দেখানো হয়। তখন থেকেই তিনি কারাগারে।

আরও পড়ুন