বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপির শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে

dablu22মহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে।

আগামী ৩০ ডিসেম্বর সারাদেশে ২৩৬টি পৌরসভায় মেয়র প্রার্থীরা দলীয় প্রতীক নিয়ে এই প্রথমবারের মত নির্বাচনে লড়বেন। তবে কাউন্সিলর পদের প্রার্থীরা আগের মতো নির্দলীয়ভাবে অংশ নেবেন। আসন্ন এই নির্বাচনে জামায়াত ছাড়া প্রতিটি রাজনৈতিক দলের অংশগ্রহন থাকবে বলে পর্যবেক্ষকমহল ধারণা করছেন। তবে জামায়াত সম্ভবত স্বতন্ত্র প্রার্থী দাড়া করতে পারে। এক সময়ে বর্তমান নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে নির্বাচন বয়কট করে রাজনীতিতে পরাজিত হওয়া বিএনপিও এখন ঘোষণা দিয়েছে নির্বাচনে অংশগ্রহন করবে বলে। তবে প্রথমদিকে অংশগ্রহনের বেপারে কিছু শর্ত দিলে নির্বাচন কমিশন তা সরাসরি প্রত্যাখ্যান করে। নির্বাচন কমিশন যে শুধু বিএনপির দাবি প্রত্যাখ্যান করেছে তা নয়। সংসদ সদস্যদের পৌর ভোটের প্রচারে থাকার সুযোগ দিতে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিরোধী দল জাতীয় পার্টি এবং বিএনপির নির্বাচন পেছানোর দাবি সবকিছুতেই না বলে দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। এবেপারে প্রধান নির্বাচন কমিশনার কাজী রকিব সাংবাদিকদের বলেন, সংসদ সদস্যদের প্রচারে যেতে দিতে বিধি সংশোধনের দাবি এসেছে। আমরা আলোচনা করে দেখেছি, তফসিল ঘোষণার পর এ পর্যায়ে কোনো সংশোধনী সমীচীন হবে না। ভোট পেছানোর দাবির বিষয়ে সিইসি বলেন, আইন-বিধি সংশোধনের পর খুব স্বল্প সময় হাতে নিয়ে তফসিল ঘোষণা হয়েছে। এখন তা পেছানোও সম্ভব না। একেই বলে নিরপেক্ষতা।

বিএনপি চেয়ারপার্সন খালেদা জিয়াকে আবারও ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ সরকার ও বর্তমান নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচন আসতে হলো। ৬৬ দিন পর লন্ডন থেকে দেশে ফিরে দল ও জোটের শীর্ষ নেতাদের সঙ্গে আলোচনা করে দলীয় প্রতীকেই আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন খালেদা জিয়া। অথচ বিএনপি একসময় দলীয় প্রতীকের বিরুদ্ধে প্রচন্ড সমালোচনা করেছিল। সারাদেশে ঝিমিয়ে থাকা নেতাকর্মীদের সক্রিয় করতেই মূলত নির্বাচনমুখী হয়েছে বিএনপি। এইমুহুর্তে নির্বাচনে যাওয়া ছাড়া দলটির আর কোনো অন্য পথ নেই বললেই চলে। দলটির নাই নাই অবস্থা থেকে যে করেই হউক এখন সামনে এগিয়ে আসতে হবে। বলা যেতে পারে নির্বাচনকে সামনে রেখে দল গুছানোর একটা সুবর্ণ সুযোগ পেয়েছে বিএনপি। এবেপারে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য লে. জে. (অব.) মাহাবুবুর রহমান বলেন, বিএনপি গণতান্ত্রিক রাজনৈতিক দল হিসেবে সব সময় নির্বাচনে বিশ্বাসী। কিন্তু নির্বাচনী পরিবেশ ও পদ্ধতি নিয়ে আপত্তি আমাদের। সুষ্ঠু অবাধ নির্বাচন আদায়ের লক্ষেই আমরা সংগ্রাম করছি। তিনি জানান, দল পুনগর্ঠন, নতুন নির্বাচন আদায়ের দাবি সব কিছুকে সামনে নিয়েই আমরা পৌরসভা নির্বাচন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছি। পর্যবেক্ষকমহলের মতে নির্বাচন কমিশন বিএনপির শর্ত প্রত্যাখ্যান করা সত্তেও নির্বাচনে যাওয়ার একমাত্র কারণ দলকে ভাঙ্গনের হাত থেকে রক্ষা করা।

দলীয় প্রতীকে প্রথমবারের মতো অনুষ্ঠিত এই পৌরসভা নির্বাচনে বিএনপির অংশগ্রহন একটি সঠিক সিদ্ধান্ত বলে অনেকে মনে করেন। কারণ অতীতে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে নানা অভিযোগ তুলে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বয়কট করে যে একটা বড় ভুল করেছিল তা এখন হারে হারে উপলব্দি করছে দলটি। জালাও পোড়াও আন্দোলনের মাধ্যমে জনগনকে কাছে না পেয়ে দলটি রাজনীতি থেকে একেবারে বিচ্ছিন্ন হয়ে পরেছিল। সেদিন যদি বিএনপি এই পথে না এসে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতো তাহলে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও অন্তত সংসদে তাদের অবস্থান শক্তিশালী বিরোধী দল হিসেবে থাকার সম্ভবনা ছিল। আজ তাদের সেই জায়গাটিতে বসে আছে জাতীয় পার্টি। যদিও জনগণ দলটিকে বিরোধী দল হিসেবে দেখছে না। বিএনপি তাদের ভুল হয়তো এখন বুঝতে পেরেছে। শেষ পর্যন্ত বিএনপির শুভবুদ্ধির উদয় হয়েছে বলতে হবে।

বিএনপি নির্বাচনে অংশগ্রহন করার কথা বললেও ইতিমধ্যে দলটি ঠিক আগের মতই নানা অভিযোগ আনা শুরু করেছে। দলের আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক আসাদুজ্জামান রিপন বলেছেন এভাবে গণগ্রেপ্তারের বিষয়ে আমরা প্রশ্ন রাখতে চাই, নির্বাচন কমিশন কী নির্বাচন করতে চায়? নির্বাচনের তারিখ ঘোষণার পর এভাবে মেয়র প্রার্থীদের গ্রেপ্তারে নির্বাচন কমিশন যদি চোখ-কান বন্ধ করে থাকে, তাহলে এ নির্বাচন আদৌ প্রতিযোগিতামূলক হবে না। এই নির্বাচন হবে সরকারের নীল নকশায় ভরপুর একটি নির্বাচন। তাহলে স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে জেনে শুনে কেন বিএনপি করছে এই বিষ পান? যদি তাই মনে করে থাকে তাহলে সরকারের ফাদে কেন পা বাড়াতে যাচ্ছে বিএনপি? অতীতে নির্বাচন বয়কট করে এখন কেন একই নির্বাচন কমিশনের অধীনে হটাত করে দলটি নির্বাচনমুখী হলো? নাকি নির্বাচনের পরে এই ইসুকে সামনে রেখে আবারও নামবে রাজপথে? ডাকবে হরতাল, শুরু করবে জালানো পোড়ানো আন্দোলন? যদিও বিগত সময়ে প্রায় টানা দুই মাসের সহিংস আন্দোলনে দলটি তাদের দাবী আদায় করতে পারেনি। সুতরাং পুনরায় এপথে যাওয়া কতটুকু যুক্তিসঙ্গত হবে দলটিকে ভেবে দেখা উচিত। কারণ বিএনপির সাংগঠনিক অবস্থা এখন আর আগের মত নেই। সূত্র মতে ভোটের ময়দানেই এখন রাজনৈতিক সঙ্কটের সমাধান চাইছেন খালেদা জিয়া। নির্বাচনে অংশগ্রহনের মধ্য দিয়ে হয়তো আরেকবার দলের জনপ্রিয়তা যাচাই করতে চায় বিএনপি ।

পর্যবেক্ষক মহলের মতে জামায়াতকে ছেড়ে দিয়ে বিএনপিকে এখন সরকারের সাথে একটা সমযোতায় আসা উচিত। তা না হলে দলটিকে হয়তো ভবিষ্যতে টিকিয়ে রাখা অসম্ভব হতে পারে। সুতরাং নির্বাচন পরবর্তিতে বিভিন্ন ইসু তুলে আন্দোলনে যাওয়া কখনই দলটির জন্য শুভ হবে না। দলের বর্তমান নাজুক অবস্থা ও নেতৃত্বের কোন্দলের কারণে বিএনপিকে আপাতত খুব সাবধানে চলতে হবে। খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে এসে দলের নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন না এনে ভালো করেছেন বলেই অনেকে মনে করছেন। কারণ এইমুহুর্তে মির্জা ফখরুলকে সরিয়ে দিয়ে তার জায়গায় অন্য কাউকে বসালে দল ভেঙ্গে যাওয়ার সম্ভবনা দেখা দিতো বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। যদিও মির্জা ফখরুল দলের এই দুর্দিনে তেমন কিছুই করতে পারছেন না। বিষয়টি অবগত হওয়া সত্তেও খালেদা জিয়া ও তারেক রহমান এই মুহুর্তে দলের নেতৃত্বে কোনো পরিবর্তন আনতে রাজি নয়। তবে সূত্র মতে ভেতরে ভেতরে মির্জা ফখরুল আলমগীরকে সরিয়ে নুতন মহাসচিব নিযুক্ত করার বিষয়টি খালেদা জিয়া লন্ডন থেকে ঠিক করেই এসেছেন। এখন শুধু সময়ের বেপার মাত্র।

এদিকে আসন্ন পৌরসভা নির্বাচনে মনোনীত মেয়র প্রার্থীদের মাঝে ইতিমধ্যে মনোনয়নপত্র বিতরণ করা শুরু করেছে বিএনপি। ২৩৬টি পৌরসভার প্রায় সবগুলোতেই প্রার্থী দিবে বলে দলটি থেকে জানানো হয়েছে। তবে জামায়াত সহ জোটের অন্যান্য শরিকদের জন্য কিছু পৌরসভা ছেড়ে দেয়া হবে বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। তার মানে বিএনপির বর্তমান নেতৃত্ব জামায়াত ছাড়তে রাজি নয় বলে আবারও প্রমানিত হলো। যদিও দলের এক বিরাট অংশ জামায়াত বিরোধী তবুও খালেদা তারেক জামায়াত ছাড়তে রাজি নয় বলে একটি সূত্রে জানা গেছে। সূত্রটির মতে খালেদা জিয়া লন্ডনে অবস্থানকালে জামায়াতের কয়েকজন নেতার সাথে গোপনে বৈঠককালে জামায়াতকে জোটে রাখার বেপারে আস্বস্থ করেছেন। অন্যদিকে তারেক রহমানও চান জামায়াত বিএনপির সাথে থাকবে। তারেক রহমানের মতে যে যেই কথাই বলুক না কেন জামায়াতকে বিএনপি তাদের জোটে রাখবেই। অথচ অনেকেই বলছেন বর্তমান জামায়াত এখন আর পূর্বের অবস্থানে নেই। যুদ্ধপরাধের দোষে একে একে কেন্দ্রীয় নেতাদের ফাসি দেওয়ায় দলটি এখন অত্যন্ত দুর্বল হয়ে পরেছে। এছাড়া দলটি থেকে বিভিন্ন কারণে অনেকে এখন ক্ষমতাসীন দলে এসে ভির করা শুরু করেছে। এই অবস্থায় দুর্বল হয়ে যাওয়া জামায়াতকে বিএনপি কেন সহযোগিতা করতে চায় এই প্রশ্ন আজ দলের ভেতরে অনেকেরই। তবে খালেদা জিয়া ও তারেক রহমানের ভয়ে তারা মুখ খুলতে পারছেন না।

আসছে পৌরসভা নির্বাচনকে সামনে রেখে বিএনপি দলের পনুগর্ঠন, নতুন নির্বাচন আদায়ের কর্মকৌশলকে এগিয়ে নিতে চায় বলে জানা যায়। তবে শেষ পর্যন্ত বিএনপি নির্বাচনে থাকবে কি থাকবে না তাতে সন্দেহ প্রকাশ করছেন অনেকেই। অন্যদিকে দলটির নির্বাচনে থাকার সবকিছুই নির্ভর করছে সরকার ও নির্বাচন কমিশনের আচরণের ওপর বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন। এছাড়া নির্বাচনটি সরকারের জন্যও একটি পরীক্ষা বলা যেতে পারে। কারণ ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে দেশ ও বিদেশে সরকার যেভাবে সমালোচিত হয়েছে তা থেকে মুক্ত হওয়ার এটা একটা বড় সুযোগ। অন্যদিকে তৃণমূলে দলের অবস্থান সম্পর্কে আওয়ামী লীগও পাবে একটি ভালো ধারণা। সুতরাং আগামী ৩০ ডিসেম্বর সারাদেশে ২৩৬টি পৌরসভার নির্বাচন দুইপক্ষের জন্য একটি অগ্নি পরীক্ষা হিসেবে বলা যেতে পারে।

লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টি স্টকহলম হেসেলবি-ভেলেংবি ব্রাঞ্চের সভাপতি

আরও পড়ুন