বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

যুদ্ধাপরাধীদের বিচার রাষ্ট্রের অন্যতম নৈতিক দায়বদ্ধতা

Shafiullah_Harunহারুন হাবীব।

দেখতে দেখতেই মুক্তিযুদ্ধের চুয়াল্লিশ বছর পার হয়ে যাচ্ছে, আমরা যারা মুক্তিযুদ্ধের সামরিক কর্মকাণ্ডের সঙ্গে জড়িত ছিলাম, পাকিস্তানের সামরিক বাহিনীর সঙ্গে সম্মুখ যুদ্ধে অস্ত্র হাতে লড়েছিলাম তারাও বয়সে প্রবীণ হয়ে পড়েছি। আমাদের মুক্তিযুদ্ধের স্বপ্ন ছিল একটা সুখী সমৃদ্ধশালী গণতান্ত্রিক বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করার; যে বাংলাদেশের মানুষ অসাম্প্রদায়িক হবে, যে বাংলাদেশের মানুষ গণতান্ত্রিক হবে, যে বাংলাদেশের মানুষ প্রগতিশীল হবে, মুক্তমনা হবে। কিন্তু দুর্ভাগ্যক্রমে ১৯৭৫ সালের রক্তপাতের পর থেকে বাংলাদেশে আবারও পাকিস্তানি ধারার রাজনীতির প্রবর্তনের চেষ্টা করা হয়েছে। নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধী শক্তিকে পুনর্বাসনের চেষ্টা হয়েছে এবং তারই ফলশ্রতিতে বাংলাদেশ রাষ্ট্র ১৯৭৫ থেকে ১৯৯৬ পর্যন্ত এক বিদেশী ভাবধারায় লালিত-পালিত হয়েছে। দুর্ভাগ্য এটিই যে বাংলাদেশের ৩০ লাখ মানুষ মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন, প্রায় ৪ লাখ মা-বোন পাকিস্তানি সেনাবাহিনী এবং তাদের এদেশীয় দোসরদের হাতে নিপীড়িত-নির্যাতিত হয়েছেন সেই বাংলাদেশে জঙ্গিবাদ মাথা-চাড়া দিয়ে উঠছে, সেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধকে অস্বীকার করার চেষ্টা করা হচ্ছে, সেই বাংলাদেশে মুক্তিযুদ্ধের অসাম্প্রদায়িক জাতিসত্তার যে চেতনা তাকে অস্বীকার করার চেষ্টা হচ্ছে।

আমাদের সৌভাগ্য, গত চুয়াল্লিশ বছরে অনেক ব্যর্থতা সত্ত্বেও কতগুলো সাফল্য জাতি হিসেবে আমরা অর্জন করতে পেরেছি। তার একটি হচ্ছে মুক্তিযুদ্ধের কয়েক যুগ পর বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের হত্যাকাণ্ডের বিচার করা সম্ভব হয়েছে এদেশে- যা বিশ্বের ইতিহাসে প্রায় একটি নজীরবিহীন ঘটনা। আরেকটি বড় মাইলফলক হচ্ছে- মুক্তিযুদ্ধের অসমাপ্ত যুদ্ধ শেষ করার প্রয়াস চলছে মুক্তিযুদ্ধের বিরোধিতাকারী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের মধ্য দিয়ে। এ দুটি ঘটনা- আমি বিশ্বাস করি বঙ্গবন্ধু কন্যা শেখ হাসিনার নেতৃত্বে পরপর দুটি সরকার ক্ষমতাসীন আছে- তাদের সাফল্যের একটা বড় মাইলফলক। এটা আমরা জানি যে, এই যুদ্ধাপরাধীদের খুর পরিকল্পিতভাবে পুনর্বাসিত করা হয়েছিল। অত্যন্ত সুপরিকল্পিতভাবে এরা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে আগ্রাসন শুরু করেছিল। বিশেষ করে জামায়াতে ইসলামীর মতো একটি দল এবং জঙ্গিবাদীরা একত্রিত হয়ে- তারা এমন একটি পর্যায়ে এসেছিল যে, তারা ধরেই নিয়েছিল, বাংলাদেশ নামক রাষ্ট্রকে এখনই আঘাত করার সময়, একাত্তরের পরাজয়ের শোধ তুলার এখনই সময়- আমরা ২০১৩ সালে তাদের সেই হিংস চেহারা দেখেছি। সাঈদীর বিচারের রায়ের পর তারা সারা দেশে যে সন্ত্রাস শুরু করেছিল তাতে মনে হচ্ছিল- তারা বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সর্বশক্তি নিয়ে একটা যুদ্ধ শুরু করেছে। কিন্তু অত্যন্ত দৃঢ়তার সঙ্গে, অত্যন্ত সাহসিকতার এবং অত্যন্ত প্রাজ্ঞতার সঙ্গে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এবং সরকার সে সন্ত্রাসকে রুখে দিতে সক্ষম হয়েছেন। এবং যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের কাজ দৃঢ়তার সঙ্গে এগিয়ে নিয়ে গেছেন। যুদ্ধাপরাধীরা তাদের অপরাধের ন্যায্য দণ্ড পেয়েছে বাংলাদেশের যুদ্ধাপরাধ ট্রাইব্যুনালের বিচারকদের বিচারে।

আমি এ নিয়ে একেবারেই বিচলিত নই- যে পাকিস্তান রাষ্ট্রের বিরুদ্ধে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ এবং সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা জয়ী হয়েছি তারা আজও বাংলাদেশের সমালোচনা করছে। একটি নিরস্ত্র জনগোষ্ঠীর ওপর চাপিয়ে দেয়া সশস্ত্র যুদ্ধে মাথা-হেঁট করা পরাজয়ের চুয়াল্লিশ বছর পর আজ পাকিস্তানিরা বলছে- তারা ১৯৭১-এ বাংলাদেশে কোনো গণহত্যার ঘটনা ঘটায়নি, কোনো নিপীড়ন-নির্যাতনও চালায়নি- গণহত্যার কথা বলে বাংলাদেশ শুধুশুধি আন্তর্জাতিক ফোরামে তাদের হেয় করছে!

আমি মনে করি, চুয়াল্লিশ বছর আগে তারা যেমন গণহত্যা চালিয়ে একটি অপরাধ করেছিল তেমনই আরেকটি অপরাধ করছে সেই গণহত্যা নিয়ে বর্তমান মিথ্যাচার করে। ইতিহাসের কাছ থেকে তারা এখনও পর্যন্ত কোনো শিক্ষা গ্রহণ করেনি। ১৯৭১ সালে মুক্তি বাহিনী এবং মিত্র বাহিনীর যৌথ কমান্ডের কাছে এ ঢাকায় তারা নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করেছিল। তারা হযতো ভুলে গেছে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে তাদের ৯৩ হাজার সৈন্যকে বন্দি করে রাখা হয়েছিল। নিরাপত্তার জন্য তাদের অনেককে ভারতের বিভিন্ন জেলে পাঠানো হয়েছিল। পরে ত্রিদেশীয় চুক্তির অধীনে এ বিপুলসংখ্যক বন্দিকে হস্তান্তর করা হয়েছিল। এদের মধ্যে ১৯৫ জন চিহ্নিত যুদ্ধাপরাধীকে তারা বিচার করবে এ প্রতিশ্র“তি দিয়ে ফেরত নিয়েছিল কিন্তু তারা তাদের বিচার করেনি।

যখন পৃথিবীর প্রতিটি ডকুমেন্টেশনে ১৯৭১ সালে বাংলাদেশে পাকিস্তানি বাহিনীর বর্বরতা, নৃশংসতার, গণহত্যার দালিলিক প্রমাণ রয়েছে তখন পাকিস্তানের এ নির্লজ্জ মিথ্যাচার হাস্যকর। এমনকি যে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধকে সমর্থন করেনি তাদের মিত্র ছিল, সে দেশের পত্রপত্রিকা এবং রাষ্ট্রীয় নথিপত্রেও বিধৃত রয়েছে বাংলাদেশে তাদের গণহত্যার অকাট্য প্রমাণ। শুধু তাই নয়, খোদ পাকিস্তানেও ১৯৭১-এ শুভবুদ্ধিসম্পন্ন, মানবতাবাদী অজস মানুষ বাংলাদেশে তাদের সশস্ত্র অভিযানের প্রতিবাদ জানিয়েছেন। তাদের অনেকেই এখনও বাংলাদেশের কাছে পাকিস্তানের ক্ষমা চাওয়ার পক্ষে সোচ্চার রয়েছেন। অথচ পাকিস্তান রাষ্ট্র বলছে তারা গণহত্যা চালায়নি!
আমার ধারণা, বাংলাদেশে যুদ্ধাপরাধের যে বিচার চলছে, একের পর এক তাদের এদেশীয় দোসর ও সহচরদের যে দণ্ডাদেশ প্রদান করা হচ্ছে, এই বিচার প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে তাদের সে সময়ের নৃশংসতার ইতিহাসও উন্মোচিত হচ্ছে- ফলে তারা বিচলিত হয়ে এ হাস্যকর আত্মপক্ষ সমর্থনের প্রয়াস পাচ্ছে। নতুন প্রজন্মের কাছে তাদের অতীতের কুকীর্তি আড়াল করতে তারা মরিয়া হয়ে এমন প্রতিক্রিয়া ব্যক্ত করছে। ১৯৭১-এ ধর্মের দোহাই দিয়ে তারা সাধারণ মানুষের বিরুদ্ধে যে অপরাধ করেছে। ধর্মকে তারা যে অপমান করেছে পাকিস্তানের অখণ্ডতা রক্ষার নামে- এসব বিষয় স্পষ্টভাবে উন্মোচিত হচ্ছে নতুন প্রজন্মের সামনে। নতুন প্রজন্ম আজ এ কথা স্পষ্টভাবে বুঝতে পারছে- পাকিস্তান শুধু বর্তমানেই একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র নয়, আজ থেকে চুয়াল্লিশ বছর আগেও একটি ব্যর্থ রাষ্ট্র ছিল।
যুদ্ধাপরাধীদের বিচার বাংলাদেশ রাষ্ট্রের অন্যতম নৈতিক দায়বদ্ধতা; এ থেকে সরে আসার কোনো সুযোগ নেই।

হারুন হাবীব: সাংবাদিক, সেক্টর কমান্ডার্স ফোরামের সাধারণ সম্পাদক।

আরও পড়ুন