বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

নতুন করে মুক্তিযুদ্ধের খেতাব দেয়ার উদ্যোগ

Liberation-Khetabমুক্তিযুদ্ধের পরে অস্ত্র জমা দিয়ে যেসব মুক্তিযোদ্ধা খেতাবের জন্য নাম লেখাতে পারেননি তাঁদের বিষয়ে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সুপারিশ করা হবে। রোববার রাজধানীর রাজারবাগ পুলিশ লাইনে আয়োজিত এক অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধবিষয়কমন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেল হক এ কথা বলেন। মুক্তিযুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধকারী যোদ্ধাদের সম্মাননা জানাতে এ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়।

মন্ত্রী বলেন, যেসব মুক্তিযোদ্ধা অস্ত্র জমা দিয়ে নিজের অবস্থানের বিষয়ে নাম লিখিয়েছিলেন, তাঁদের মধ্য থেকে মুক্তিযুদ্ধের পদবির তালিকা প্রকাশ করা হয়েছিল। তবে পুলিশ সদস্যদের মধ্যে ওই সময় নাম তালিকাভুক্ত না হওয়ায় তাঁদের কেউ পদবির অন্তর্ভুক্ত হননি।

অনুষ্ঠানে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল ২৫ মার্চের কালরাতের দুঃসহ স্মৃতিচারণা করে বলেন, ওই রাতে পুলিশ সদস্যরাই প্রতিরোধের সূচনা করেছিলেন। অনুষ্ঠানে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রতিরোধে অংশ নেওয়া ৪২ মুক্তিযোদ্ধা ও তাঁর পরিবারের সদস্যদের সম্মাননা দেওয়া হয়।

মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রী বলেন, “মুক্তিযুদ্ধের খেতাব দেখলে মনে হয় না তা জনযুদ্ধ ছিল। মনে হয় সামরিক যুদ্ধ হয়েছিল। এখানে সেনাবাহিনীর সদস্যরাই শুধু অগ্রণী ভূমিকা পালন করেছিলেন।”

মুক্তিযুদ্ধে ভূমিকার জন্য বীর শ্রেষ্ঠ (৭), বীর উত্তম (৬৮), বীর বিক্রম (১৭৫) ও বীর প্রতীক (১৫৫) খেতাব পেয়েছেন মোট ৪০৫ জন। বীর শ্রেষ্ঠ খেতাবধারী সাতজনের সবাই সামরিক বাহিনীর সদস্য। অন্যান্য খেতাবপ্রাপ্তদের মধ্যেও তাদের প্রাধান্য রয়েছে।

একাত্তরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধের নেতৃত্ব দেওয়া মোজাম্মেল হক বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধে নিশ্চয়ই বীর উত্তম, বীর শ্রেষ্ঠ স্বীকৃতি পাবার মতো আরও যোগ্য লোক থাকতে পারেন। ওই সময়ে বলা হয়েছিল, সরকারের কাছে নিজেদের মুক্তিযুদ্ধে গৌরবোজ্জ্বল ভূমিকা তুলে ধরে স্বীকৃতির জন্য আবেদন করতে। তবে সেই সময়ে অনেকেই তা করিনি। বিষয়টি পুনর্বিবেচনা করা যায় কি না তা মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টিগোচর করব।”

১৯৭১ সালের ১৯ মার্চ গাজীপুরের জয়দেবপুরে পাকিস্তান সেনাবাহিনীর ওই সময়কার ব্রিগেডিয়ার জানজুয়া নেতৃত্বাধীন একটি দলের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়েছিল ‘গাজীপুর সর্বদলীয় সংগ্রাম কমিটি’। কমিটির আহ্বায়ক হিসেবে ওই যুদ্ধের নেতৃত্ব দিয়েছিলেন মোজাম্মেল হক।

তিনি বলেন, “ওই দিন প্রায় আধা ঘণ্টা পাকিস্তান বাহিনীকে প্রতিরোধ করা হয়েছিল। তাদের গুলিতে হরমুজ, নিয়ামত ও মনু খলিফা নামের তিনজন শহীদ হয়েছিলেন।”

একাত্তরে শহীদ পরিবারের ভাতা বাড়িয়ে দ্বিগুণ করা হচ্ছে জানিয়ে মন্ত্রী বলেন, “খুব তাড়াতাড়ি ওই ফাইলে সই হয়ে যাবে।”

স্বাধীনতাবিরোধী চক্র বাংলাদেশকে পাকিস্তানের মতো একটি ‘অকার্যকর’ ও ‘ব্যর্থ’ রাষ্ট্র বানানোর ষড়যন্ত্র করছে মন্তব্য করে তিনি বলেন, “বাঙালি মেরে কিছু করতে না পেরে এখন সাদা চামড়ার মানুষকে টার্গেট করেছে।”

একাত্তরের ২৫ মার্চ রাতে প্রথম প্রতিরোধযুদ্ধে অংশ নেওয়া নিয়েছিলেন সে সময় রাজারবাগ পুলিশ লাইন্সের ওয়্যারলেস অপারেটর মো. শাহজাহান মিয়া।

সেই রাতের স্মৃতিচারণ করে তিনি বলেন, “ওই দিন পুরো ঢাকা শহর ছিল থমথমে। ট্যাঙ্কে করে পাকিস্তানি সৈন্যরা ঢাকায় টহল দিচ্ছিল।

“রাতে পাকিস্তান বাহিনীকে প্রতিরোধে পুলিশ-জনতা মিলে রাজারবাগে সম্মিলিত প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিল। এরপর তাদের সঙ্গে কয়েক ঘণ্টাব্যাপী পুলিশের গোলাগুলি চলেছিল। ভোররাতের দিকে পুলিশের গুলি শেষ হয়ে এলে পাকিস্তানি সৈন্যরা রাজারবাগে প্রবেশ করে পুলিশ সদস্যদের উপর নির্মম অত্যাচার চালিয়েছিল।”

পুলিশের সাবেক এই সদস্য বলেন, “ওই রাতে পুলিশ কেবল রাইফেল নিয়ে পাকিস্তানি বাহিনীর ট্যাঙ্ক ও কামানের মোকাবেলা করেছিল। তারপরও স্বাধীনতার পর রাজারবাগে পুলিশের প্রতিরোধ গড়ে তোলার কথা জাতির কাছে ছিল অজানা।”

অনুষ্ঠানে উপস্থিত পুলিশের শীর্ষ কর্মকর্তাদের বক্তব্যেও মুক্তিযুদ্ধে এই বাহিনীর ভূমিকার যথাযথ মূল্যায়ন না হওয়ার অভিযোগ এসেছে।

পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক বলেন, “২০১১ সালের আগে পুলিশ স্বাধীনতা পুরস্কার পায়নি। পুলিশকে বীরশ্রেষ্ঠ খেতাব দেওয়া হয়নি।”

তিনি বলেন, “পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধুকে হত্যার পর মুক্তিযোদ্ধারা নিজেদের আড়াল করে রাখতেন। পরবর্তীতে তার কন্যা শেখ হাসিনা রাষ্ট্র পরিচালনার দায়িত্ব পেলে মুক্তিযোদ্ধাদের সম্মানিত করেন।

“২০০৯ সালে যখন মহানগর পুলিশ কমিশনার ছিলাম তখন, প্রথম বাংলাদেশের আনাচ-কানাচ থেকে মহান স্বাধীনতা যুদ্ধে পুলিশের যারা পাকিস্তান বাহিনীর বিরুদ্ধে প্রথম প্রতিরোধ যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন তাদের ধরে এনে সম্মানিত করি।”

পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি মাহফুজুল হক নুরুজ্জামান বলেন, “মহান মুক্তিযুদ্ধে সরাসরি প্রতিরোধ যুদ্ধের সূচনা করেছিলে পুলিশ। তারপরও তাদের বাদ দিয়ে মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস লেখা হয়েছে।”

মুক্তিযুদ্ধে পুলিশ সদস্যদের ভূমিকা জাতি শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে বলে মন্তব্য করেন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খাঁন কামাল।

পঁচাত্তরে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে হত্যার পর যারা স্বাধীনতাবিরোধীদের বাংলাদেশের রাজনীতিতে ফিরিয়ে আনেন তাদের কঠোর সমালোচনা করেন মন্ত্রী।

“যার আহ্বানে নিরস্ত্র বাঙালি সশস্ত্র হয়েছিল তার শাহাদৎ বরণের পর থমকে গিয়েছিলাম। যারা আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিল তারাই রাষ্ট্রক্ষমতা দখল করেছিল। যুদ্ধাপরাধীদের গাড়িতে জাতীয় পতাকা উড়েছিল,” আক্ষেপের সুরে বলেন তিনি।

অনুষ্ঠান শেষে সাংবাদিকদের প্রশ্নের জবাবে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, রংপুরে জাপানি নাগরিক কুনিও হোশি হত্যায় বেনাপোল থেকে একজনকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে।

জঙ্গিবাদে উসকানিদাতাদের তথ্য সংগ্রহের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলেও জানান তিনি।

ঢাকা মহানগর পুলিশ কমিশনার মো. আছাদুজ্জামান মিয়ার সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে পুলিশ সদরদপ্তরের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তা, গোয়েন্দা পুলিশের কর্মকর্তা, বিভিন্ন অপরাধ বিভাগের উপ-কমিশনারসহ বিভিন্ন স্তরের পুলিশ কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন।

আরও পড়ুন