শুক্রবার ৬ নভেম্বর ২০২৬

মুক্তিযুদ্ধে শহীদের প্রকৃত সংখ্যা জরিপ করতে বলল বিএনপি

Goyeshwar+Chandra+Roy_251215_0002মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করে খালেদা জিয়ার বক্তব্যকে সমর্থন জানিয়ে ‘জরিপ’ করে ‘সঠিক সংখ্যা’ নিরূপণ করতে বলেছেন বিএনপির স্থায়ী কমিটির নেতা গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

আর দলটির যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেছেন, শহীদের সংখ্যা নিয়ে তথ্যে ‘ঘাটতি থাকায়’ আওয়ামী বুদ্ধিজীবীরা খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমালোচনা করছেন।

খালেদার বক্তব্য নিয়ে বিভিন্ন পর্যায়ে তীব্র প্রতিক্রিয়ায় মধ্যেই শুক্রবার ঢাকায় এক আলোচনা সভায় বিএনপির দুই নেতার এই বক্তব্য আসে।

গয়েশ্বর বলেন, “আমি সাংবাদিক ভাইদের বলব, কেউ কথা বললে তার বক্তব্যের লাইনটা দিয়ে মতামত জরিপ করেন… যাদের গ্রামে যতজন একাত্তর সালে মারা গেছেন, শুধু পাকিস্তানিদের গুলিতে নয়, সাধারণ মৃত্যুও তো আছে- এগুলোর ঠিকানা পাঠাতে, মেসেজ করে দিতে বলেন। দেখেন তারপর পরিসংখ্যানটা চলে আসবে।”

গত ২১ ডিসেম্বর এক আলোচনা সভায় বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা বলেন, “আজকে বলা হয়, এতো লক্ষ লোক শহীদ হয়েছেন। এটা নিয়েও অনেক বিতর্ক আছে যে আসলে কত লক্ষ লোক মুক্তিযুদ্ধে শহীদ হয়েছেন। নানা বই-কিতাবে নানারকম তথ্য আছে।”

তার ওই বক্তব্যের পর তীব্র প্রতিক্রিয়া হয়। বক্তব্য প্রত্যাহার করে খালেদাকে ক্ষমা চাওয়ার আহ্বান জানায় একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। এক আইনজীবী উকিল নোটিস পাঠিয়ে বক্তব্য প্রত্যাহার করে নিতে বলেন এবং নড়াইলে খালেদার নামে একটি মামলাও করা হয়।

বিকালে জাতীয় প্রেসক্লাবে আলোচনা সভায় বক্তব্যে বুদ্ধিজীবী দিবস পালনেরও সমালোচনা করেছেন বিএনপি নেতা গয়েশ্বর। তার মতে, একাত্তরের ১৪ ডিসেম্বর যারা নিহত হয়েছেন তারা ‘নির্বোধের’ মতো মারা গেছেন।

গয়েশ্বর চন্দ্র রায় গয়েশ্বর চন্দ্র রায় মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে দলীয় প্রধান খালেদা জিয়ার বক্তব্যের সমর্থনে গয়েশ্বর বলেন, “বেগম খালেদা জিয়া বলেছেন, বিতর্ক আছে। উনি কমও বলেননি, বেশিও বলেননি। বলেছেন সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। এই বিতর্কের কথাটা কিন্তু পার্লামেন্টে উঠেছিল ১৯৯১ সালে। পালার্মেন্ট সদস্য প্রয়াত কর্নেল আকবর হোসেন প্রশ্নটা উত্থাপন করেছিলেন।”

নব্বই দশকের প্রথমার্ধে খালেদা জিয়া নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রিসভায় ছিলেন আকবর হোসেন। পরে ২০০১ সালে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকারেরও মন্ত্রী ছিলেন তিনি।

‘মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা কোনো বাণী নয় যে তা পরিবর্তন করা যাবে না’ মন্তব্য করে গয়েশ্বর বলেন, “শেখ সাহেব (বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান) যেটা বলেছেন লন্ডনের হিথরো এয়ারপোর্টে, সেটাতো ‘এবারের সংগ্রাম, মুক্তির সংগ্রাম/এবারের সংগ্রাম, স্বাধীনতার সংগ্রাম’ বলে যে বাজারমাত করেন, সেরকম বাজারমাতের বিষয় এটা না।

“অজ্ঞতাবশত তিন লাখের জায়গায় তিন মিলিয়ন/৩০ লাখ হয়ে গেছে। এটা তাড়াহুড়া করতে গিয়ে পেছনে কানে কানে বলছেন আর উনি শুনছেন তাড়াহুড়ায় একটা কথা উনি বলছেন। আমরা এটাকে টার্ম হিসেবে নিয়েছি ৩০ লক্ষ।”

যাচাই-বাছাই ছাড়া মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা ৩০ লাখ বলার সমালোচনা করেন গয়েশ্বর, যদিও খালেদা নেতৃত্বাধীন সরকার আমলেও প্রধানমন্ত্রীর বিবৃতি-বাণীতে এই সংখ্যা উল্লেখ করা হত।

“মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা তার মানে সেই গানের কলির মতো- সেই সত্য হবে রামের জন্মভূমি, অযোধ্যার চেয়ে সত্য, কবি তোমার রচনার জন্য। তাই আমরা সেই হিসেবে ৩০ লক্ষ ৩০ লক্ষ বলি, কোনো দিন গইনা দেখলাম না,” বলেন তিনি।

মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা বের করতে পদক্ষেপ নিতে সরকারকে পরামর্শ না দেওয়ার জন্য আওয়ামী লীগপন্থি ‘বুদ্ধিজীবীদের’ সমালোচনা করেন বিএনপি নেতা গয়েশ্বর।

তিনি বলেন, “এখন আধুনিক প্রযুক্তি আছে। আমরা ইচ্ছা করলে সাত দিনের মধ্যে পরিসংখ্যানটা বের করতে পারি। সে কারণে আওয়ামী লীগের বুদ্ধিজীবীরা আহম্মক কি না জানি না। তাদের বলব- প্রধানমন্ত্রীকে বলেন, মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে এর একটা জরিপ করে ফেলেন। প্রকৃত ইতিহাসটা চলে আসুক।”

একাত্তরের নিহতের সংখ্যা বহু বাড়িয়ে বলা হয় বলে মনে করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

তিনি বলেন, “আমরা জানি মুক্তিযোদ্ধা মন্ত্রণালয়ে তিন লাখ ৭৬ হাজার পরিবারের তালিকা আছে। বাকি ২৭ লাখ কোথায়? ২৭ লাখ তো সহজ ব্যাপার না।

“সুতরাং গলার জোরে কথা না বলে আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করে জরিপ করে সংখ্যা যদি ৩০ লাখের জায়গায় ৬০ লাখ হয় হলো- অসুবিধা কী? আর ৩০ লাখ না হয়ে যদি তিন লাখ হয়, তাতেই আমার সমস্যাটা কী? দেশটা তো স্বাধীন হয়েছে। ১০ টাকার বিনিময়ে দেশ স্বাধীন হোক আর ৩০ লাখের বিনিময়ই হোক দেশ তো স্বাধীন হয়েছে। এটা তো বিতর্কের বিষয়বস্তু না কোনো মতেই।”

১৯৭১ সালের ১৪ ডিসেম্বর নিহত বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, লেখক, চিকিৎসক, শিল্পী, সাংবাদিকসহ বিভিন্ন পেশার খ্যাতিমানদের স্মরণে ওই দিনটিকে বুদ্ধিজীবী দিবস হিসেবে পালনের সমালোচনা করেন গয়েশ্বর চন্দ্র রায়।

নিজের বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে তিনি বলেন, “উনারা যদি এতো বুদ্ধিমান হন, তাহলে ১৪ তারিখ পর্যন্ত নিজের ঘরে থাকে কী করে, একটু বলেন তো। আর পাকিস্তান সরকারের তারা বেতন খাইল। এটা তো বুঝা যায়।

“হ্যাঁ, নেতৃত্বের অজ্ঞতার কারণে ২৫ মার্চ যারা মারা গেছেন, আত্মাহুতি দিয়েছেন, তারা না জানার কারণে। কিন্তু ১৪ ডিসেম্বর যারা মারা গেছেন, তারা অজ্ঞতার কারণে মারা যাননি। তারা জ্ঞাত সারে বাড়িতে ছিলেন, তারা প্রতিদিন তো যে যেখানে কর্মস্থল ছিল, সেখানে কর্মস্থলে যাইতেন।” বুদ্ধিজীবীদের শ্রদ্ধা জানাতে ফুল দেওয়া নির্বোধের কাজ বলে মনে করেন তিনি।

“তারা নির্বোধের মতো মারা গেল, আমাদের মতো নির্বোধেরা প্রতিদিন শহীদ বুদ্ধিজীবী হিসেবে ফুল দেয়। না গেলে আবার পাপ হয়,” বলেন তিনি।

রাজশাহী ইউনিভার্সিটি ন্যাশনালিস্ট এক্স স্টুডেন্ট অ্যাসোসিয়েশনের উদ্যোগে ‘স্বৈরাচার বিরোধী আন্দোলনে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ও রুহুল কবির রিজভী’ শিরোনামে ওই আলোচনা সভা হয়।

একাত্তরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে খালেদা জিয়ার বক্তব্যের পক্ষে যুক্তি দিয়ে রিজভী বলেন, “বঙ্গবন্ধুর প্রতি শ্রদ্ধা রেখেই বলছি, তার সংখ্যাটি কোনো অফিসিয়াল বক্তব্য ছিল না। কোনো এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলে বসেছেন।”

একাত্তরে নিহতের সংখ্যা নিয়ে ‘বিতর্ক’ আছে বললেও সেদিন তা স্পষ্ট করেননি খালেদা জিয়া। এদিন তার না বলা কথা তুলে ধরেন রিজভী।

“এটা নিয়ে শেখ মুজিবুর রহমানকে যারা শ্রদ্ধা করেন, এমআর আক্তার মুকুল তার ‘আমি বিজয় দেখেছি’ বইতে বলেছেন, দুই লাখের মতো। আওয়ামী লীগের এমপি ছিলেন ’৭০ সালে মোহাইমেন বলেছেন, প্রায় এক লক্ষ ৩০ বা ৪০ হাজার। এই বির্তক আছে।”

এই বিষয়গুলো ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণ করে কথা বলা ‘গণতান্ত্রিক অধিকার’ দাবি করে বিএনপির এই নেতা বলেন, “বেগম জিয়া বলেছেন, এই সংখ্যা নিয়ে বিতর্ক আছে। উনি বলেননি এটা কম। এটা তো ৩০ লক্ষ হতে পারে, ৫০ লক্ষও হতে পারে।

“কিন্তু তারা সংসদ দখল করে নিয়েছে, গণতন্ত্র দখল করে নিয়ে খবরের কাগজ দখল করে নিয়েছে, তারা মিডিয়া দখল করে নিয়েছে। আর তো কিছু বলার নেই। এখন বেগম জিয়ার বক্তব্য নিয়ে কিছু করা যায় কি না এটাই হচ্ছে তাদের লাস্ট ব্যবসা।”

সংগঠনের সভাপতি অধ্যক্ষ বাহাউদ্দিন বাহারের সভাপতিত্বে আলোচনা সভায় সাবেক সাংসদ সৈয়দা আসিফা আশরাফি পাপিয়া, অধ্যাপক রেজাউল হক, অ্যাডভোকেট রফিকুল ইসলাম, রমেশ চন্দ্র দত্ত, মোজাম্মেল কবির, অ্যাডভোকেট নুরুজ্জামান খান, মতিয়ার রহমান প্রমুখ বক্তব্য রাখেন।

আরও পড়ুন