বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

এক বোমা ওদের ভাগ করে দিল

Boma-Rajshahiআহমদিয়া মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের পর এখন চিত্র ভিন্ন। ‘পাড়ার সকল ছেলে মোরা ভাই ভাই, একসাথে খেলি আর পাঠশালে যাই’—ছোটবেলায় পড়া কবিতার মতোই ছিল গ্রামটি। সবাই মিলেমিশে থাকত। হঠাৎ বোমা বিস্ফোরণে থমকে গেল সবকিছু। কেউ যেন মোটা দাগে ওদের ভাগ করে দিল।

রাজশাহীর বাগমারা উপজেলার সৈয়দপুর গ্রামের বাসিন্দাদের মনোভাব এখন এমনই। এত দিন ওই গ্রামে পাশাপাশি ছিল আহলে হাদিস ও আহমদিয়া সম্প্রদায়ের মসজিদ। দল বেঁধে নিজেদের বিশ্বাস অনুসারে সেখানে নামাজ আদায় করা হতো। কোথায় কী পার্থক্য, কারও জানার দরকার পড়েনি। গতকাল শুক্রবার সৈয়দপুর চকপাড়ার আহমদিয়া মসজিদে বোমা বিস্ফোরণের পর সবাই জানতে বাধ্য হলো পার্থক্যটা।

সৈয়দপুরে আহলে হাদিস মসজিদের ইমাম মনিরুল ইসলাম বলেন, ১০ বছর আগে ওই পাড়ার সবাই তাঁদের মসজিদেই নামাজ আদায় করতেন। তবে ২০০০ সালে সাতক্ষীরা এলাকার সৈয়দ গোলাম মোস্তফা নামের এক ব্যক্তি সেখানে আসেন। তিনি আহমদিয়া মুসলিম জামাতের পক্ষে প্রচার চালান। স্থানীয় কাদের শেখ আহমদিয়ার অনুসারী হন। পরে তিনি আরও কিছু সমর্থক বাড়িয়ে আহলে হাদিসের মসজিদের পাশে তাঁদের জন্য আলাদা একটি মসজিদ নির্মাণ করেন। সেই থেকে তিনি আরও কিছু অনুসারী নিয়ে সেখানেই নামাজ আদায় করতেন। সে সময় থেকে ওই মসজিদের মুয়াজ্জিনের দায়িত্ব পালন করেন সৈয়দ গোলাম মোস্তফা। গতকাল বোমা বিস্ফোরণের সময় তিনিও মসজিদে নামাজ আদায় করছিলেন। মসজিদের পাশে একটি ঝুপড়ি ঘরে তিনি একাই থাকেন।

ইমাম মনিরুল ইসলাম বলেন, তাঁরা জানতেন না যে দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে পার্থক্য কী? জানার দরকারও মনে করেননি। আলাদা মসজিদে নামাজ আদায় করলেও তাঁদের মধ্যে কোনো বিরোধ ছিল না। তিনি বলেন, যারা আহমদিয়া মসজিদে নামাজ আদায় করত, তাদের অনেকে তাঁর আত্মীয়। বিভিন্ন সময়ে একে অপরের সহযোগিতা করতেন। সম্প্রীতি বজায় রাখার জন্য সময় ভাগ করে নামাজ আদায় করা হতো।

একই বক্তব্য আহমদিয়া মুসলিম জামাতের সৈয়দপুর চকপাড়া মসজিদের প্রেসিডেন্ট সাইফুল ইসলামেরও। তিনি বলেন, তাঁদের আলাদা মসজিদ থাকলেও স্থানীয় লোকজনের সঙ্গে কোনো বিরোধ ছিল না। তাঁদের বিভিন্ন কাজে ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে সহযোগিতা করেছেন গ্রামের অন্য লোকেরা। তিনি মনে করেন, একটি গোষ্ঠী সারা দেশে তাঁদের সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর যেভাবে হামলা করছে, গতকালের ঘটনা এরই অংশ। ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য ওই চক্র এই ঘটনা ঘটিয়েছে বলে তিনি মনে করেন।

স্থানীয় শুভডাঙ্গা পরিষদের ৯ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য আবদুস সাত্তার বলেন, গ্রামবাসী দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে কোনো পার্থক্য বোঝেনি। সবাই মিলেমিশে থাকতেন।

দুই মসজিদের পাশেই থাকেন কোহিনূর বেগম, শেফালী বেগম, রেজিয়া খাতুন ও মমতাজ খাতুন। তাঁরা বলেন, দীর্ঘ দিন ধরে দুই মসজিদে দুই সম্প্রদায় নামাজ আদায় করলেও কোনো সমস্যা হয়নি। পাড়ার সবাই একসঙ্গে থাকতেন। বোমা বিস্ফোরণের পর জানলেন—আহমদিয়ারা আলাদা।

স্থানীয় শুভডাঙ্গা ইউনিয়নের বাসিন্দা ও আওয়ামী লীগের রাজশাহী জেলা শাখার সহসভাপতি অনিল কুমার সরকার বলেন, তাঁরা জানতেন না সেখানে আহমদিয়া সম্প্রদায়ের অনুসারীরা রয়েছে। গ্রামের সবাই মিলেমিশে থাকতেন। বোমা বিস্ফোরণে নিহত যুবক বাইরের, এলাকার ধর্মীয় সম্প্রীতি বিনষ্ট করার জন্য এই ন্যক্কারজনক ঘটনা ঘটানো হয়েছে।

শুভডাঙ্গা ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) চেয়ারম্যান আবদুল জলিল বলেন, বাগমারা এলাকার বেশির ভাগ মুসলমান আহলে হাদিসের অনুসারী। তারা কখনো আহমদিয়াদের আলাদা করে দেখেনি। এই ঘটনায় তাঁরা বিস্মিত।

মামুনুর রশিদ, বাগমারায় প্রথম আলোর সংবাদদাতা

আরও পড়ুন