বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

‘মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন’ চায় ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি

একাত্তরের গণহত্যা ও মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস অস্বীকারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ‘মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন’ প্রণয়নের দাবি জানিয়েছে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটি। একইসঙ্গে ‘মুক্তিযুদ্ধের ভিকটিমদের ক্ষতিপূরণ আইন’ করারও দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।

আজ শনিবার বিকেলে রাজধানীর সেগুনবাগিচায় ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে এক সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য দেন একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবির।

এতে ‘মুক্তিযুদ্ধ অস্বীকার অপরাধ আইন’ প্রণয়ন ছাড়াও যুদ্ধাপরাধের জন্য আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালে দল ও বাহিনী হিসেবে জামায়াত ইসলামী, মুসলিম লীগ, নেজামে ইসলাম, শান্তি কমিটি, রাজাকার, আলবদর, আলশামস ও মুজাহিদের বিচার; মানবতার বিরুদ্ধে অপরাধীদের স্থাবর-অস্থাবর সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত; বাংলাদেশের গণহত্যার ভিকটিমের ক্ষতিপূরণ দেওয়ার জন্য পাকিস্তানের ওপর সর্বাত্মক চাপ প্রয়োগ; একাত্তরে যেসব যুদ্ধশিশু বাংলাদেশের নাগরিকত্ব গ্রহণে আগ্রহী তাদের নাগরিকত্ব প্রদান এবং ২৫ মার্চ গণহত্যা দিবস ঘোষণাসহ আটটি দাবি জানানো হয়।

লিখিত বক্তব্যে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘মুক্তিযুদ্ধকালে বাংলাদেশে ৩০ লক্ষ মানুষ শহীদ হননি—এ ধরনের মন্তব্য করে বিএনপি প্রধান খালেদা জিয়া আবারও প্রমাণ করেছেন মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানের প্রতি তাঁর যে সমর্থন ও দুর্বলতা ছিল এখনো তা অক্ষুণ্ন রয়েছে। তাঁর এ ধরনের বক্তব্য শুধু আদালত ও সংবিধান অবমাননা নয়, বাংলাদেশের অস্তিত্ব বিনাশী চক্রান্তের অন্তর্গত।’ তাঁর বক্তব্যকে ‘হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই’ মন্তব্য করে শাহরিয়ার কবির বলেন, ‘খালেদা জিয়ার মুক্তিযুদ্ধবিরোধী বক্তব্যে নিঃসন্দেহে পাকিস্তানের আইএসআই এবং আল কায়েদা ও আইএসের মতো আন্তর্জাতিক জঙ্গি সন্ত্রাসী সংগঠন অনুপ্রাণিত হবে।’

সংবাদ সম্মেলনে সাবেক বিচারপতি এ এইচ এম শামসুদ্দিন চৌধুরী, অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন, আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের রাষ্ট্রপক্ষের কৌঁসুলি তুরিন আফরোজ, ভাস্কর ফেরদৌসী প্রিয়ভাষিণী প্রমুখ উপস্থিত ছিলেন।

আইনগত দাবির বিষয়গুলো সংবাদ সম্মেলনে ব্যাখ্যা করেন আপিল বিভাগের অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতি এএইচএম শামসুদ্দিন চৌধুরী।

তিনি খালেদার বক্তব্যের সমালোচনা করে বলেন, “শহীদের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি নেত্রী যে আপত্তিকর মন্তব্য করেছেন, তাতে আমি বিস্মিত হইনি। কারণ আগাগোড়াই তিনি স্বাধীনতার বিরুদ্ধে ছিলেন, যেমনটি ছিলেন তার স্বামী জিয়াউর রহমান।”

কিছুদিন আগে ড. কামাল হোসেনের জামাতা ডেভিড বার্গম্যানের লেখায়ও এই সংখ্যা নিয়ে প্রশ্ন তোলার দিকে ইঙ্গিত করে তিনি বলেন, “তিনি কীভাবে এই দেশে থাকেন, সেটা একটা প্রশ্ন।

“এক কথায় যারা এই সব প্রশ্ন তুলছে, তারা সকলেই পাকিপ্রেমী। এগুলোর বিরুদ্ধে প্রতিবাদ শুধু নয়, আমাদেরকে অ্যাকশনে যেতে হবে।”

এই ধরনের বক্তব্যদাতাদের শাস্তি নিশ্চিত করতে আইন প্রণয়নের গুরুত্ব তুলে ধরেন এই বিচারপতি।

“যুদ্ধাপরাধীদের সব সম্পত্তি বাজেয়াপ্ত করতে আইন করতে হবে বা ’৭৩ এর আইনে একটি অধ্যায় সংযোজন করতে হবে। তেমনি যারা আমাদের মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কে বা মুক্তিযুদ্ধের মহানায়ক সম্পর্কে কোনো রকম প্রশ্ন তুলবেন, সেগুলো অবশ্যই অপরাধের আওতায় আনতে হবে।”

এই ধরনের বিষয়ে বিশ্বের বিভিন্ন দেশে আইন থাকার বিষয়টি উল্লেখ করেন তিনি।
একাত্তরে শহীদদের সংখ্যা স্বাধীনতার পরপরই ১৯৭২ সালে সরকার তথ্য ও উপাত্তের ভিত্তিতে বলে দিয়েছিল, বলেন বিচারপতি শামসুদ্দিন চৌধুরী।

“আমরা যখন দেখতে পেলাম, একটি রাজনৈতিক দলের প্রধান এই বিষয়ে কথা বলছে, তখন আমাদের আর অপেক্ষা করার সময় নেই। মুক্তিযুদ্ধের সরকারের কাছে আমাদের দাবি, অতি শিগগিরই যেন এই আইন প্রণয়ন করা হয়।”

“সেই আইনটি করতে হবে ভূতাপেক্ষ প্রয়োগ দিয়ে। অর্থাৎ অতীতে যারা এই ধরনের কথা বলেছেন, খালেদা জিয়া বা ডেভিড বার্গম্যানের মতো লোক, তাদেরকেও যেন এই আইনের অধীনে বিচারের আওতায় আনা যায়।”

“কারণ আইন হয়ে যাওয়ার পর হয়ত খালেদা জিয়া বা বার্গম্যান সতর্ক হয়ে যাবেন,” ভূতাপেক্ষ কার্যকারিতা রাখার পক্ষে যুক্তি দেখান সর্বোচ্চ আদালত থেকে সদ্য অবসরে যাওয়া এই বিচারক।

যুদ্ধাপরাধীদের সম্পত্তি বাজেয়াপ্তের বিষয়টি ন্যুরেমবার্গ ট্রাইব্যুনাল, ‍রুয়ান্ডা ট্রাইব্যুনাল, যুগোস্লাভ ট্রাইব্যুনাল এবং রোম সংবিধির ভিত্তিতে প্রতিষ্ঠিত ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল কোর্টে রয়েছে বলে জানান তিনি।

“এই সব ট্রাইব্যুনালের আইনে বলা আছে, যারা অপরাধী হিসাবে সাজাপ্রাপ্ত হবে, তাদের সব সম্পদ বাজেয়াপ্ত করতে হবে।”

আরও পড়ুন