বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চান একাত্তরের যুদ্ধশিশু মনোয়ারা

Dhaka-Photo-Monawara+Clark_War-Child - Copyএকাত্তরে যে বেয়নেটের আঘাতে মায়ের মৃত্যু হয়েছে, মায়ের গর্ভেই সেই বেয়নেটে আহত হওয়ার পরও বেঁচে যাওয়া যুদ্ধশিশু মনোয়ারা ক্লার্ক বাংলাদেশের নাগরিকত্ব চান। শনিবার ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটিতে একাত্তরের ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির এক সংবাদ সম্মেলনে এই আগ্রহের কথা জানান বর্তমানে কানাডার নাগরিক মনোয়ারা। একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের জন্য ক্ষতিপূরণেরও দাবি করেছেন তিনি।
যুদ্ধাপরাধের সর্বোচ্চ শাস্তির দাবি জানিয়ে মনোয়ারা ক্লার্ক বলেন, “আমি চাই- একাত্তরের ক্ষতিগ্রস্ত যারা এখানে আছে, যারা বিদেশে চলে গেছে, তাদেরকে যেন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়। আমি এই দেশের নাগরিকত্ব চাই এবং এখানে ভোটের অধিকার চাই।” গত বছরের ডিসেম্বরে জন্মসনদ নিতে বাংলাদেশে এসে আলোচনায় আসেন মনোয়ারা ক্লার্ক। শেষ পর্যন্ত ওই সনদ নিয়েই তিনি ফিরে যান। কিন্তু নাগরিকপঞ্জীতে তার নাম ওঠেনি।

১৯৭১ সালে স্বাধীনতা যুদ্ধ চলার সময় পাকিস্তান সেনাবাহিনীর হাতে নির্যাতনে মৃত নারীর গর্ভ থেকে জন্ম মনোয়ারার। বেয়নেটের আঘাত নিয়েই পৃথিবীতে আসেন তিনি। পাকিস্তানি সেনারা ধর্ষণের পর বেয়নেট দিয়ে খুঁচিয়ে খুঁচিয়ে হত্যা করে তার মাকে। মায়ের গর্ভের শিশুর দেহেও রয়েছে সেই খোঁচার ক্ষত। তার ঘাড়ে, পিঠে, বাহুতে বড় বড় ক্ষত এখনও রয়েছে। হানাদারদের নির্যাতনে মারা গিয়েছিলেন ওর মা। তার গর্ভ থেকেই শিশুটিকে বিশেষ ব্যবস্থায় পৃথিবীর আলোতে নিয়ে আসেন যুদ্ধের সময় বাংলাদেশে থাকা কানাডিয়ান চিকিৎসক হাল কে ফেরি। জন্মের পর ওই শিশুর স্থান হয় পুরান ঢাকার মাদার টেরেজা হোমসে। সেখান থেকে কানাডিয়ান এক দম্পতি ৬ মাস বয়সে তাকে দত্তক সন্তান হিসাবে কানাডায় নিয়ে যান। নাম হয় তার মনোয়ারা ক্লার্ক।

বিয়ের পর সন্তান অটিস্টিক হলে স্বামী এর জন্য তার জন্ম পরিচয়হীনতাকে দায়ী করেছিলেন বলে জানান মনোয়ারা। এরপর জন্ম সনদ নেওয়ার চিন্তা করেছিলেন তিনি। এবার আবার বাংলাদেশে এসে শনিবার ঘাতক দালাল নির্মূল কমিটির সংবাদ সম্মেলনে একাত্তরের ‘ভিকটিম’ হিসাবে বক্তব্য রাখেন এই যুদ্ধশিশু। তাকে পাশে রেখে নির্মূল কমিটির ভারপ্রাপ্ত সভাপতি শাহরিয়ার কবিরও বিদেশে অবস্থানরত বাংলাদেশের যুদ্ধশিশুদের নাগরিকত্ব দিতে সরকারের প্রতি আর্জি জানান। তিনি আরো বলেন, একাত্তরের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বাংলাদেশের কেউ যদি ভুল তথ্য বা অস্বীকার করে তবে তার জন্য আইন প্রণয়ন করতে হবে।

অনুষ্ঠানে একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের পক্ষে বক্তব্য দেন শহীদজায়া শ্যামলী নাসরীন চৌধুরী। মুক্তিযুদ্ধে নিহতের সংখ্যা নিয়ে বিএনপি চেয়ারপারসন খালেদা জিয়ার সংশয় এবং একাত্তরে নিহত বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে দলটির এক নেতার কটূক্তির প্রসঙ্গ তুলে ‘হলোকাস্ট ডিনায়াল’ আইন করার দাবি জানান তিনি। তিনি বলেন, “৪৪ বছরের মানসিক কষ্টের পর এখন খালেদা জিয়ার দেওয়া কষ্টে তা সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যাচ্ছে। ৪৪ বছর ধরে আমরা যে কষ্ট করছি, যে মানসিক যন্ত্রণা পাচ্ছি, এই আইনের মাধ্যমে আমরা এর প্রতিকার দাবি করছি।” শ্যামলী নাসরিন বলেন, “ইদানিং আমরা দেখতে পাচ্ছি, পাকিস্তান যে ধরনের কথা-বার্তা বলে, গত বছরগুলোতে পাকিস্তানকে যে ধরনের কথা বলতে দেখেছি, সেই একই ধরনের কথা-বার্তা খালেদা জিয়া বলছেন। এটা আমরা এই সহ্য করব না।” মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিতর্কিত বক্তব্য ঠেকাতে আইনের করার পাশাপাশি একাত্তরে ক্ষতিগ্রস্তদের ক্ষতিপূরণ দেওয়ারও দাবি জানান তিনি।

আরও পড়ুন