বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

প্রচারণা শেষ, কাল ভোট

2015_07_07_05_57_09_TF2wKHr6o0gEfOLXkqMVooYHKvDYeC_originalআনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ। এখন ভোটের অপেক্ষা। আজ রাত পোহালেই কাল পৌর নির্বাচনের ভোটগ্রহণ। ভোটাররা অধীর আগ্রহে সেই ক্ষণটির প্রহর গুনছেন। নিজের ভোট দেওয়ার পাশাপাশি শেষ পর্যন্ত কোন প্রার্থীর মাথায় বিজয় মুকুট ওঠে, তা দেখার আগ্রহেও সময় কাটছে তাদের। আর দিনরাতের ক্লান্তিহীন প্রচার শেষে গতকাল মধ্যরাতের পর থেকে প্রার্থীরাও ছিলেন অনেকটা ‘ঢিলেঢালা মুডে’। তবে ঘরোয়া প্রচারের সুযোগ নিয়ে রাতভর বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের দোয়া প্রার্থনা থেমে ছিল না। এদিকে নির্বাচন কমিশন (ইসি) নিরাপদে ভোট অনুষ্ঠানের যাবতীয় প্রস্তুতি শেষ করেছে।

ইসি আশা করছে, আগামী বুধবার পৌরসভা নির্বাচনে ভোটাররা নির্বিঘ্নেই ভোট দিতে পারবেন। রাজধানীর আগারগাঁওয়ে ইসি সচিবালয়ে গতকাল সোমবার দুপুরে নির্বাচন কমিশনার শাহনেওয়াজ সাংবাদিকদের বলেছেন, ‘পর্যাপ্ত আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। তাই ভোটাররা সুষ্ঠুভাবে ভোট দিতে পারবেন। নির্বিঘ্নেই ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন। এতে কোনো সমস্যা হবে না।’এদিকে গতকাল মধ্যরাত অর্থাৎ রাত ১২টার পর থেকে দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় নির্বাচনের আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হয়েছে। এর আগে রাত ৮টাতেই বন্ধ হয়ে যায় মাইকে প্রচার ও ভোট প্রার্থনা। নির্ধারিত সময়েই নির্বাচনী মিছিল-সমাবেশ ও প্রচারসভা বন্ধ
হয়ে যাওয়ায় পক্ষকালের কোলাহলমুখর পরিবেশ হঠাৎ করেই নীরব-নিস্তব্ধ হয়ে পড়ে। আজ মঙ্গলবার দিনভর প্রচারবিহীন শ্বাসরুদ্ধকর একটি দিন কাটবে প্রার্থীদের।

৯ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয়েছিল নির্বাচনের এ আনুষ্ঠানিক প্রচার। আর ১৪ ডিসেম্বর থেকে শুরু হয় প্রার্থীদের প্রতীকসহ প্রচার কার্যক্রম, যা গতকাল সোমবার মধ্যরাতের পর শেষ হয়েছে।

আগামীকাল বুধবার সকাল ৮টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত ২৩৪টি পৌরসভার তিন হাজার ৫৫৫টি ভোটকেন্দ্রের ২১ হাজার ৭১টি কক্ষে একযোগে ভোট নেওয়া হবে। এরপর শুরু হবে ভোট গণনা। তার পর রাতেই জানা যাবে ভোটের ফলাফল। কে জিতেছেন, কে হেরেছেন, ভোটের ব্যবধান কত, কে কোথায় কত ভোট পেয়েছেন- রাতভর চলবে এ রকম হিসাব-নিকাশ। আর ফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গে অবসান ঘটবে সব প্রতীক্ষার।

তবে ভোট নিয়ে উদ্বেগ-উৎকণ্ঠা আর শঙ্কার রেশ ছিল গতকালও। যেসব পৌরসভায় গত কয়েক দিন ধরে সংঘাত-সহিংসতা চলেছে, সেসব স্থানে এ উদ্বেগের মাত্রা ছিল তুলনামূলক বেশি। শেষ পর্যন্ত ভোটের পরিবেশ শান্তিপূর্ণ থাকবে কি-না, সবাই ভোট দিতে পারবেন কি-না- তা নিয়েও জল্পনা-কল্পনা কম নেই। ভোটারদের নির্বিঘ্নে ভোট দেওয়ার বিষয়ে অনেক প্রার্থীরও সংশয় রয়েছে।

এদিকে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষায় নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের বাড়তি তৎপরতা শুরু হয়ে গেছে। গতকাল সোমবারই অধিকাংশ এলাকায় বিজিবি মোতায়েন শুরু হয়েছে। পাশাপাশি পুলিশ, র‌্যাব, আনসারসহ অন্য আইন-শৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরাও কাজ শুরু করেছেন। বিশেষ করে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত ভোটকেন্দ্রগুলোর দিকে রয়েছে বাড়তি নজর। সারাদেশের ভোটকেন্দ্রগুলোর মধ্যে ১ হাজার ৬১৮টিকে ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করেছে প্রশাসন ও নির্বাচন কমিশন, যা মোট ভোটকেন্দ্রের প্রায় অর্ধেক। বিভাগভিত্তিক পর্যালোচনায় দেখা যায়, সবচেয়ে বেশি ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র আছে খুলনা বিভাগে। এই বিভাগের ৪৮১টি কেন্দ্রের মধ্যে ৩৬৯টিই ঝুঁকিপূর্ণ।

ঢাকা বিভাগে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্র ৯৯১টির মধ্যে ৩৪৮টি। রাজশাহী বিভাগের ৮০১টি কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ২৪৬টি। রংপুর বিভাগের ৩৩৮ কেন্দ্রের মধ্যে ২২৩টি ঝুঁকিপূর্ণ। চট্টগ্রাম বিভাগের ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ৪৮০টির মধ্যে ১৬৮টি। সিলেট বিভাগের ১৮৯ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ ১৪৬টি। আর বরিশাল বিভাগের ১৭৬ কেন্দ্রের মধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ কেন্দ্রের সংখ্যা ১১৮টি।

বুধবার দেশের ২৩৪টি পৌরসভায় ২৩৪টি মেয়র, দুই হাজার ১৯৩টি সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর ও ৭৩১টি সংরক্ষিত নারী ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে ভোট নেওয়া হবে। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে, এসব পৌরসভায় প্রতিদ্বন্দ্বী মেয়র প্রার্থী সংখ্যা ৯৪৩ জন। তবে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় এরই মধ্যে ছয়জন মেয়র নির্বাচিত হয়েছেন। এ ছাড়া সাধারণ ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে আট হাজার ৭৪৬ এবং সংরক্ষিত মহিলা ওয়ার্ড কাউন্সিলর পদে দুই হাজার ৪৮০ জন প্রার্থী রয়েছেন। ২৩৪ পৌরসভায় মোট ভোটার সংখ্যা ৭০ লাখ ৯৯ হাজার ১৪৪ জন; যার মধ্যে পুরুষ ভোটার ৩৫ লাখ ৫২ হাজার ১৮৪ এবং নারী ভোটার ৩৫ লাখ ৪৬ হাজার ৮৬০ জন।

চট্টগ্রাম ব্যুরো জানিয়েছে, চট্টগ্রাম বিভাগে ৩৭টি পৌরসভায় মেয়র প্রার্থীদের পাশাপাশি শেষ দিনে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চালিয়েছেন মেয়র এবং সংরক্ষিত ও সাধারণ ওয়ার্ডের কাউন্সিলর প্রার্থীরাও। সারাদিন তারা ব্যস্ত ছিলেন ভোটারদের কাছে ভোট প্রার্থনায়। অনেকে গণসংযোগের পাশাপাশি সভা-সমাবেশ ও মাইকিং করেও ভোটের পাশাপাশি দোয়া চেয়েছেন।

গতকাল সকাল থেকেই চট্টগ্রামের রাঙ্গুনিয়া পৌরসভায় আওয়ামী লীগের মেয়র প্রার্থী শাহজাহান শিকদার কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে প্রচার চালান। উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চালিয়েছেন পটিয়ায় আওয়ামী লীগ, বিএনপি ও জাতীয় পার্টির তিন মেয়র প্রার্থীও। বাঁশখালীতে প্রচার চালিয়েছেন আওয়ামী লীগের প্রার্থী সেলিমুল হক চৌধুরী ও বিএনপির প্রার্থী কামরুল ইসলাম হোসাইনী। রাঙামাটিতে প্রধান দুই দলের মেয়র প্রার্থীর পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী ডা. গঙ্গা মানিক চাকমা প্রচার চালিয়েছেন। অন্য দুই পার্বত্য জেলা বান্দরবান ও খাগড়াছড়ি জেলার পৌর মেয়র প্রার্থীরাও প্রচার ও গণসংযোগে ব্যস্ত সময় কাটান।

রাজশাহী ও বগুড়া ব্যুরো জানায়, রাজশাহী বিভাগের ৩২টি পৌরসভার সব ক’টিতেই গতকাল শেষ দিনের প্রচার চালিয়েছেন মেয়র, কাউন্সিলর ও সংরক্ষিত মহিলা কাউন্সিলর প্রার্থীরা। সবখানে উৎসবমুখর পরিবেশে প্রচার চলেছে। তবে মধ্যরাতের পর আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হওয়ায় নীরবতা নেমে এসেছে।

খুলনা ব্যুরো ও যশোর অফিস জানায়, নির্বাচনী প্রচারের শেষ দিনে গতকাল খুলনা বিভাগের ২৯টি পৌরসভা ছিল উৎসবমুখর। মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা ভোর থেকে মধ্যরাত পর্যন্ত শেষবারের মতো নির্বাচনী এলাকার এক প্রান্ত থেকে আরেক প্রান্ত চষে বেড়ান। দুপুর ২টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিংও ছিল সব এলাকায়।

মেয়র প্রার্থীদের মধ্যে খুলনার চালনায় আওয়ামী লীগের সনৎ কুমার বিশ্বাস, বিএনপির শেখ আবদুল মান্নান, যশোর সদরে আওয়ামী লীগের জহিরুল ইসলাম চাকলাদার রেন্টু, বিএনপির মারুফুল ইসলাম ও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী এস এম কামরুজ্জামান চুন্নুসহ প্রায় সবাই ক্লান্তিহীনভাবে ছুটে বেড়িয়েছেন ভোটারদের দ্বারে দ্বারে। নির্বাচনী কার্যালয়গুলোও সরগরম ছিল দিনভর। রাত ৮টা পর্যন্ত মাইকিং ছিল শহরজুড়ে।

বরিশাল ব্যুরো জানায়, বরিশাল বিভাগের ১৭টি পৌরসভাই শেষ দিনের প্রচারে উৎসবমুখর ছিল। উঠান বৈঠক, গণসংযোগ আর শোডাউন করে মেয়র ও কাউন্সিলর প্রার্থীরা সর্বশেষ প্রচার চালিয়েছেন। তবে বরিশালের উজিরপুরে দুই কাউন্সিলর প্রার্থীকে আচরণবিধি লঙ্ঘন করায় জরিমানা করা হয়েছে। অন্যদিকে বরগুনার পাথরঘাটায় অজ্ঞাত দুর্বৃত্তরা কাফনের কাপড় পাঠিয়েছে বিএনপির মেয়র প্রার্থী মলি্লক মো. আইয়ুবের বাসায়। আর পটুয়াখালীর কুয়াকাটায় জাতীয় পার্টির মেয়র প্রার্থী আনোয়ার হোসেন হাওলাদারকে আওয়ামী লীগ সমর্থকরা লাঞ্ছিত করায় এ দুই পৌরসভায় নানা শঙ্কা দেখা দিয়েছে।

সিলেট ব্যুরো জানায়, প্রার্থী ও সমর্থকদের গণসংযোগ, শোডাউন, পথসভা, জনসভা ও আচরণবিধি লঙ্ঘনের মধ্য দিয়ে সিলেট বিভাগের ১৬টি পৌরসভায় আনুষ্ঠানিক প্রচার শেষ হয়েছে। আনুষ্ঠানিক প্রচারের শেষপর্যায়ে এসে টাকা বণ্টনের অভিযোগের গুঞ্জনও ছড়িয়েছে কয়েকটি পৌরসভায়। শেষ দিনে প্রার্থীরা অতীতের ভুলত্রুটির জন্য ভোটারদের কাছে ক্ষমা চাওয়ার পাশাপাশি নির্বাচিত হলে উন্নয়নের নানা প্রতিশ্রুতিও দেন। বিভাগের কয়েকটি পৌরসভায় গতকাল মেয়র প্রার্থীরা তাদের নির্বাচনী ইশতেহারও ঘোষণা করেন।

রংপুর অফিস জানায়, নির্বাচনের শেষ দিনে রংপুর বিভাগের ২০টি পৌরসভার প্রার্থীরা দলীয় কর্মী-সমর্থকদের নিয়ে শীত, ঘুম, আরাম-আয়েশ উপেক্ষা করে ঘুরে ঘুরে ভোটারদের কাছে ভোট চেয়েছেন।

ফরিদপুর অফিস জানায়, বৃহত্তর ফরিদপুরের ১৪টি পৌরসভায় শেষ মুহূর্তে মেয়র প্রার্থীদের দৌড়ঝাঁপ ও গণসংযোগ ছিল চোখে পড়ার মতো। প্রার্থীরা উৎসাহ-উদ্দীপনা নিয়ে দিনভর ব্যস্ত ছিলেন প্রচার কাজে। কাউন্সিলর প্রার্থীরাও ভোটারদের সঙ্গে কুশল বিনিময়ের পাশাপাশি নিজের পক্ষে সমর্থন আদায়ের চেষ্টায় সময় পার করেছেন।

আরও পড়ুন