বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

সন্ত্রাসীদের আস্তানা মিরপুরের রূপনগর

Rupnagar-raঢাকার মিরপুরে বর্ধিত নতুন উপশহর রূপনগর আবাসিক এলাকা। সরু রাস্তায় সারি সারি বাড়ি। কোনো সড়কে নির্মাণ করা হচ্ছে ভবন। আবাসিক এলাকা হলেও রয়েছে নানা প্রতিষ্ঠানও। এলাকার বাসিন্দাদের নিরাপত্তায় কয়েক বছর আগে শুরু হয়েছে নতুন ‘রূপনগর থানা’র কার্যক্রম। তা সত্ত্বেও চাপা আতঙ্কে থাকেন সেখানকার বাসিন্দারা। নতুন বাড়ি তুলতে গেলেই দিতে হয় চাঁদা। এটি যেন অলিখিত নিয়ম! না দিলেই শুরু হয় উপদ্রব, বেরিয়ে আসে সন্ত্রাসীদের গুলি। বিভিন্ন ব্যবসা প্রতিষ্ঠানেও পাঠানো হয় চাঁদা দাবি করে চিরকুট। বর্ধিত উপশহর হওয়ায় ওই এলাকায় বড় অপরাধ হয় জমি ক্রয়-বিক্রয়ের নামে মধ্যস্থতা আর জমি দখল ও পাল্টা দখলের ক্ষেত্রে। সন্ত্রাসীদের আতঙ্কে থাকেন ডেভেলপার ব্যবসায়ী থেকে বাড়ির মালিকরা। পান থেকে চুন খসলেই সন্ত্রাসীরা ধরে নিয়ে নির্যাতন করে তাদের টর্চার সেলে। রাজধানীর বুকে এ যেন এক আতঙ্কিত জনপদের নাম। ভুক্তভোগী বাসিন্দাদের সঙ্গে কথা বলে এমন সব ভয়ঙ্কর অপরাধের চিত্র পাওয়া গেছে।

রূপনগরের আতঙ্ক কারা?- সমকালের মাঠ পর্যায়ের অনুসন্ধান, স্থানীয়দের ভাষ্য আর আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর দেওয়া তথ্যেও এসবের সত্যতা মিলেছে। মূলত পুরো রূপনগর এলাকা দাপিয়ে বেড়াচ্ছে ৪০ সন্ত্রাসী। তারা সবাই এলাকার মূর্তিমান আতঙ্ক। তাদের বিষয়ে স্থানীয়রা নানা তথ্য দিলেও আতঙ্কে কেউ নিজের নামটি প্রকাশ করতে চাননি।

অনুসন্ধানে বেরিয়ে আসে রূপনগরের মূর্তিমান আতঙ্কের নাম আল আমিন ওরফে কালা জনি ওরফে জনি সরকার। গত ২ জানুয়ারি গভীর রাতে জনি র‌্যাবের সঙ্গে ‘বন্দুকযুদ্ধে’ নিহত হলেও তার নাম শুনলে এখনও আঁতকে ওঠেন বাসিন্দারা। জনি নিহত হওয়ার পর এলাকায় স্বস্তি ফিরে এলেও তা স্থায়ী হয়নি। তার বাহিনীর অন্তত ৪০ সন্ত্রাসীর নিয়ন্ত্রণে রয়েছে রূপনগর এলাকা। জনির এক সময়ের দেহরক্ষী আল ইসলাম এখন সন্ত্রাসীদের দলনেতা। আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর প্রজেক্টে রয়েছে এ গ্রুপের টর্চার সেল।

র‌্যাব-৪-এর অধিনায়ক খন্দকার লুৎফুল কবির বলেন, শীর্ষ সন্ত্রাসী জনি বন্দুকযুদ্ধে নিহত হওয়ার পর তার অপরাধ জগতের নানা তথ্য বেরিয়ে আসছে। এই সন্ত্রাসী গ্রুপের অন্তত ৩০ থেকে ৪০ জন সক্রিয় সদস্য রয়েছে। র‌্যাব তাদের অনেকের কার্যকলাপ নজরদারিতে রেখেছে। তাদের কয়েকজনকে আইনের আওতায় নেওয়ার চেষ্টা চলছে।

আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী ও স্থানীয় সূত্র জানায়, আল ইসলামের বাসা রূপনগর আবাসিক এলাকার ২৭ নম্বর সড়কে। তবে সে বেশির ভাগ সময় কাটায় বাসার বাইরে। জনি নিহত হওয়ার পর গা ঢাকা দিলেও সম্প্রতি আল ইসলামকে এলাকায় দেখা গেছে। এ ছাড়া দলনেতা নিহত হওয়ার পর তার এক সময়ের শিষ্য জুয়েল, প্রাইভেটকার সুমন, সার্কিট জুয়েল, আকরাম, মোটরসাইকেল সুমন, পুলিশ সোর্স রাজু, সিরাজ এবং লুঙ্গি সিরাজ জনির সন্ত্রাসী সাম্রাজ্য দেখভাল করছে। এই ৮ জনের নেতৃত্বে রয়েছে অন্তত ৪০ জন দুর্ধর্ষ সন্ত্রাসী। তাদের মধ্যে কেউ কেউ কিছুদিন নিষ্ক্রিয় থাকলেও সবাইকে নিয়ে নতুন করে দল সাজিয়ে মাঠে নামছে আল ইসলাম ।

র‌্যাবের একটি সূত্র জানায়, রূপনগরের ২৭ নম্বর প্রজেক্টে ছিল এই সন্ত্রাসী বাহিনীর টর্চার সেল। জনি সেখানেই স্থানীয় একটি স্কুলের দারোয়ানের বাসায় দুপুরে গোসল ও খাওয়া-দাওয়া করত। বডিগার্ড আল ইসলাম তখন বাহিনীর অপর সদস্যদের নিয়ে পাহারায় থাকত। জনির খাবার পরিবেশন করত এলাকার চিহ্নিত ইয়াবা সম্রাট জুয়েল। সন্ত্রাসী দলের প্রধান জনিকে মোটরসাইকেলে নিয়ে বিভিন্ন জায়গায় যেত সুমন। সুমনের প্রাইভেটকারেও চলাফেরা ছিল তার। তারাই এখন জনির অনুপস্থিতিতে অপরাধ সাম্রাজ্যের হাল ধরেছে। তাদের দলনেতা নিহত হওয়ার পর এখন পর্যন্ত কোনো চাঁদাবাজি বা গুলির ঘটনা না ঘটলেও এলাকাজুড়ে তাদের অস্ত্র ও ইয়াবা ব্যবসা অব্যাহত রয়েছে।

স্থানীয় লোকজন জানায়, জনি ছোটবেলা থেকেই উচ্ছৃঙ্খল প্রকৃতির ছিল। তার বাবা জামাল সরকারও সন্ত্রাসী ছিলেন। ঝুট ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ জগতে তার নাম ছিল ছোট্ট মিয়া। ১২ বছর আগে জনি তার সন্ত্রাসী দুলাভাই ফয়েজের হাত ধরে অপরাধ জগতের অন্ধকার দুনিয়ায় প্রবেশ করে। এরপর চাচাতো ভাই শামীমের হাত ধরে যোগ দেয় শীর্ষ সন্ত্রাসী শাহাদাতের গ্রুপে। এরপর তার খুন ও চাঁদাবাজিতে হাতে খড়ি হয়। শাহাদাতের অনুপস্থিতিতে সে গড়ে তোলে নিজস্ব বাহিনী।

পুলিশ সূত্র জানায়, এ সন্ত্রাসী গ্রুপটি শুধু রূপনগর নয়। মিরপুরের বিভিন্ন এলাকায় চলে তাদের অপরাধ কর্মকাণ্ড। দুয়ারীপাড়ার মান্নান হত্যা, পল্লবীর মুস্তাক হত্যা, বারেক হত্যা, রূপনগরের রনি হত্যাকাণ্ডে অংশ নিয়েছে এই সন্ত্রাসী দলটি। এ ছাড়া সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুনের আত্মীয়ের বাসায় ডাকাতি, শিয়ালবাড়ি এলাকায় ডাকাতি ছাড়াও বেড়িবাঁধ এলাকার ডাকাতি নিয়ন্ত্রণ করে এই দলটি।

আরও পড়ুন