ইবাদত-বন্দেগি, জিকির-আসকার, বয়ান-কারগুজারি আর আল্লাহু আকবর ধ্বনিতে উত্তাল তুরাগতীর। আজ আখেরি মোনাজাতের মধ্য দিয়ে শেষ হবে দ্বিতীয় পর্ব। সেই সঙ্গে সমাপ্তি ঘটবে মুসলিম বিশ্বের দ্বিতীয় বৃহত্তম জমায়েত, ৫১তম বিশ্ব ইজতেমার। এদিকে মোনাজাতে অংশ নিতে ফজরের আযানের পর থেকে তুরাগা তিরে নেমেছে মুসল্লিদের ঢল। বাস, ট্রেন, ট্রাক, রিকশা, ভেন, নৌকা এমনকি পায়ে হেঁটে লাখো মুসল্লির গন্তব্য এখন ইজতেমা মাঠমুখি। সকাল সাড়ে ১০টা থেকে সাড়ে ১১টার মধ্যে অনুষ্ঠিত হবে আখেরি মোনাজাত। এখন চলছে হেদায়েতি বয়ান। তাবলিগ জামাতের দিল্লি মারকাজের শূরা সদস্য হজরত মাওলানা মুহাম্মদ সা’দ আখেরি মোনাজাত পরিচালনা করবেন বলে জানিয়েছে আয়োজক কমিটি। আয়োজকদের ধারণা, আজকের আখেরি মোনাজাতে দেশ-বিদেশের ৩০ থেকে ৩৫ লাখ ধর্মপ্রাণ মুসল্লি অংশ নেবেন।
বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের দ্বিতীয় দিনে শনিবার দিনভর লাখ লাখ মুসল্লির উদ্দেশে চলে পবিত্র কোরআন-হাদিসের আলোকে বয়ান। ইজতেমা আয়োজক কমিটির শীর্ষ মুরব্বি প্রকৌশলী মো. গিয়াস উদ্দিন জানিয়েছেন, এদিন ইজতেমা ময়দানে যৌতুকবিহীন বিয়ে হয়নি। এবারের ইজতেমার প্রথম পর্বের দ্বিতীয় দিনেও যৌতুকবিহীন বিয়ের আয়োজন হয়নি। এর মাধ্যমে এবার থেকেই বিয়ের এ প্রথা উঠে গেল।
টঙ্গীর ইজতেমা ময়দান এরই মধ্যে কানায় কানায় পূর্ণ। মোনাজাত করতে তারপরও আসছেন মুসল্লিরা। মোনাজাতের আগ পর্যন্ত এ ঢল অব্যাহত থাকবে। মোনাজাতে শরিক হতে বিপুলসংখ্যক মহিলা টঙ্গীর আশপাশে এসে অবস্থান নিয়েছেন। অনেকে আত্মীয়স্বজনের বাসা-বাড়িতে উঠেছেন।
চলছে বয়ান : দু’দিন ধরে সার্বক্ষণিক ইবাদত-বন্দেগিতে নিয়োজিত রয়েছেন মুসল্লিরা। প্রতিদিন ফজর থেকে এশা পর্যন্ত ঈমান, আমল, আখলাক ও দ্বীনের পথে মেহনতের ওপর আমবয়ান অনুষ্ঠিত হচ্ছে। তাবলিগের ৬ উসুলের (মৌলিক বিষয়ে) ওপর বাদ ফজর ভারতের মাওলানা খোরশেদ আলমের বয়ানের মধ্য দিয়ে শনিবার দ্বিতীয় দিনের বয়ান শুরু হয়। বাদ জোহর মাওলানা মোহাম্মদ ফারুক (ভারত), বাদ আসর মাওলানা মো. ইউসুফ আলী (ভারত) এবং বাদ মাগরিব বয়ান করেন ভারতের মাওলানা শওকত আলী।
তাশকিল : ইজতেমা প্যান্ডেলের উত্তর-পশ্চিমে তাশকিলের কামরা স্থাপন করা হয়েছে। এছাড়া প্রতিটি খিত্তায় তাশকিলের জন্য বিশেষ স্থান রাখা হয়েছে। বিভিন্ন মেয়াদে আল্লাহর রাস্তায় বের হতে ইচ্ছুকরা নাম তালিকাভুক্ত করে সেখানে অবস্থান করছেন। কাকরাইলের মসজিদের মুরব্বিদের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী তাদের দেশের বিভিন্ন এলাকায় দ্বীনের মেহনতে পাঠানো হবে।
মোনাজাতে অতিরিক্ত মাইক : আখেরি মোনাজাত প্রচারের জন্য গণযোগাযোগ অধিদফতর ও গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস বিশেষ ব্যবস্থা নিয়েছে। জেলা তথ্য অফিস জানিয়েছে, গণযোগাযোগ অধিদফতর ইজতেমা ময়দান থেকে আবদুল্লাহপুর ও বিমানবন্দর রোড পর্যন্ত এবং গাজীপুর জেলা তথ্য অফিস ইজতেমা ময়দান থেকে চেরাগাআলী, টঙ্গী রেলস্টেশন, স্টেশন রোড ও আশপাশের অলিগলিতে পর্যাপ্ত মাইক সংযোগের ব্যবস্থা করেছে।
ইজতেমায় বিদেশী মুসল্লি : ইজতেমার দ্বিতীয় পর্বের প্রথম দিনই জর্ডান, লিবিয়া, আফ্রিকা, লেবানন, আফগানিস্তান, ফিলিস্তিন, যুক্তরাষ্ট্র, তুরস্ক, ইরাক, সৌদি আরব, ভারত, পাকিস্তান, ইংল্যান্ডসহ বিশ্বের ৯৬ দেশ থেকে ৬ হাজার ৫১৮ মুসল্লি আসেন। আগের পর্বে অংশ নেয়া অনেকেই ছিলেন আগে থেকেই। ভাষাভাষী ও মহাদেশ অনুসারে ময়দানে ৩ তাঁবুতে রয়েছেন মেহমানরা।
ইজতেমার পরও বিদেশীদের পর্যবেক্ষণ- আইজিপি : পুলিশের মহাপরিদর্শক একেএম শহীদুল হক শনিবার দুপুরে টঙ্গীতে বিশ্ব ইজতেমা পরিদর্শন করেন। তিনি সাংবাদিকদের জানান, ইজতেমা শেষে যেসব বিদেশী মুসল্লি আরও ৪০ দিন বা তার চেয়েও বেশি সময় বাংলাদেশে অবস্থান করবেন তাদের পর্যবেক্ষণে রাখা হবে এবং নিরাপত্তার বিষয়টি নিশ্চিত করা হবে। এ সময় তিনি আয়োজক কমিটির কাছে বিদেশী মেহমানরা যে এলাকায় চিল্লায় যাবেন সে তালিকা যেন পুলিশকে দেয়া হয় তার অনুরোধ জানান।
সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে আইজিপি বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংক কর্মকর্তা ও সিটি কর্পোরেশন কর্মকর্তাকে নির্যাতনের ঘটনায় ব্যবস্থা নেয়া হচ্ছে। তিনি বলেন, পুলিশে লোকবল অনেক।
দু-একজন অপরাধ করতেই পারে। তবে পুলিশ যদি ন্যূনতম অপরাধ করে তা আমরা আমলে নিই। তাদের প্রতি ন্যূনতম অনুকম্পা দেখানো হয় না।’
এ সময় পুলিশের অতিরিক্ত আইজিপি (ট্রেনিং) মো. মইনুর রহমান চৌধুরী, ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি এসএম মাহফুজুল হক নূরুজ্জামান, ঢাকা রেঞ্জে অতিরিক্ত ডিআইজি (প্রশাসন) শফিকুল ইসলাম, অতিরিক্ত ডিআইজি (অপরাধ) মোহাম্মদ আলী, গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ, অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. মিজানুর রহমান উপস্থিত ছিলেন।
নিরাপত্তা ও যান চলাচল : আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে পুলিশের পক্ষ থেকে যানবাহন চলাচল নিয়ন্ত্রণ আরোপ করা হয়েছে। গাজীপুরের পুলিশ সুপার হারুন অর রশীদ জানান, শনিবার মধ্যরাত থেকে মোনাজাত শেষে রোববার বিকাল পর্যন্ত ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়কের চান্দনা চৌরাস্তা থেকে টঙ্গী পর্যন্ত, টঙ্গী-কালীগঞ্জ সড়কের মিরেরবাজার থেকে স্টেশন রোড পর্যন্ত, কামারপাড়া থেকে আশুলিয়া পর্যন্ত এবং বিমানবন্দর থেকে টঙ্গী ব্রিজ পর্যন্ত সব ধরনের যান চলাচল বন্ধ থাকবে। তিনি বলেন, ইজতেমা ময়দানসহ আশপাশ এলাকা কড়া নিরাপত্তার মধ্যে রয়েছে। প্যান্ডেলের ভেতর ও বাইরে মুসল্লিবেশে রয়েছে বিভিন্ন গোয়েন্দা সংস্থার প্রায় ১ হাজার সদস্য।
শাটল বাস : পুলিশ সুপার হারুন অর রশিদ আরও জানান, মুসল্লিদের যাতায়াতের জন্য জেলা পুলিশের পক্ষ থেকে ৩০টি শাটল বাস চলাচলের ব্যবস্থা করা হয়েছে। যেহেতু ঢাকা-ময়মনসিংহ মহাসড়ক, ঢাকা-কালীগঞ্জ সড়ক বন্ধ থাকবে সে জন্যই এ ব্যবস্থা।
বিশেষ ট্রেন : টঙ্গীর রেলওয়ে স্টেশনের কর্মকর্তা জানান, আখেরি মোনাজাত উপলক্ষে রেলওয়ে আখাউড়া, কুমিল্লা ও ময়মনসিংহসহ বিভিন্ন রুটে বিশেষ ট্রেনের ব্যবস্থা করেছে। মোনাজাতের আগে ও পরে সব ট্রেন টঙ্গী স্টেশনে যাত্রাবিরতি করবে। ইজতেমায় আগত যাত্রীদের কথা বিবেচনায় রেখে টঙ্গী রেলওয়ে জংশনে অতিরিক্ত টয়লেট ও বিশুদ্ধ পানির ব্যবস্থা করা হয়েছে।
ভ্রাম্যমাণ আদালতের জরিমানা : ময়দানের আশপাশ এলাকার হোটেল রেস্তোরাঁগুলোতে ভেজাল ও নিুমানের খাদ্যদ্রব্য রাখা ও বিক্রির অভিযোগে শনিবার দুপুর পর্যন্ত (গত দুই দিন) ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে ১ লাখ ৯৬ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করেছেন। গাজীপুরের অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক রাহেনুল ইসলাম জানান, শুক্রবার ১৪ প্রতিষ্ঠানকে ১ লাখ ৪ হাজার টাকা এবং শনিবার বেলা ২টা পর্যন্ত ২১ প্রতিষ্ঠানকে ৯২ হাজার টাকা জরিমানা করা হয়। দুই শিফটে ১০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়েছেন। ২৪ নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট ওইসব আদালত পরিচালনা করছেন।
বিদেশীসহ তিন মুসল্লির মৃত্যু : টঙ্গীর বিশ্ব ইজতেমার দ্বিতীয় ধাপে যোগ দিতে আসা এক মালয়েশিয়ার নাগরিকসহ তিন মুসল্লির মৃত্যু হয়েছে। তারা হলেন মালয়েশিয়ার নাগরিক শাহিদান ইব্রাহিম (৪৮), জামালপুর সদর উপজেলার কাচারিপাড়া এলাকার আবুল কাশেম (৬৫) ও বগুড়ার গাবতলী থানার মাঝবাড়ি এলাকার আবদুর রহমান (৬০)।
মশার উপদ্রব : ইজতেমা ময়দানে মশার উপদ্রব দেখা দিয়েছে। আয়োজকরা বলেছেন, সিটি কর্পোরেশন মশার ওষুধ ছিটালেও তা পর্যাপ্ত নয়। মশার যন্ত্রণায় রাতে অনেক মুসল্লি ঘুমাতে না পেরে জেগে বসে থাকেন। দিনেও যন্ত্রণায় ভুগছেন তারা।
১৯৪৬ সালে প্রথম কাকরাইল মসজিদে ইজতেমা আয়োজন করা হয়। ১৯৬৬ সালে গাজীপুরে টঙ্গীর তুরাগ নদীর তীরে বর্তমান ময়দানে স্থানান্তর করা হয় বিশ্ব ইজতেমা। ২০১১ সাল থেকে দুই দফায় বিশ্ব ইজতেমার আয়োজন করা হয়। স্থান সংকুলান না হওয়া, অংশগ্রহণকারীদের বিভিন্ন অসুবিধা ও নিরাপত্তার বিষয়টি মাথায় রেখে এ আয়োজন করা হয়। আর চলতি বছর থেকে দুই পর্বে ৩২ জেলার মুসল্লিদের অংশ নেয়ার নির্দেশনা দেয় আয়োজক কমিটি। বাকি ৩২ জেলার মুসল্লিরা অংশ নেবেন আগামী বছর।


