বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

জ্বালানি তেলে ৮০ ভাগই লাভ

bpc-logo_1887জ্বালানি তেল বিক্রি করে ৮০ ভাগ মুনাফা করছে বিপিসি (বাংলাদেশ পেট্রোলিয়াম কর্পোরেশন); কিন্তু ঘোষণা করছে অর্ধেকেরও কম। বাকি টাকা নানাভাবে লোপাট হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। মূলত এ লুটপাটের কারণেই জ্বালানি তেলের দাম কমানো হচ্ছে না।

জানা গেছে, বিপিসির এ অনৈতিক কাজের সঙ্গে দেশী-বিদেশী একটি শক্তিশালী সিন্ডিকেট জড়িত। এ চক্রের সদস্য প্রভাবশালী নেতা ও ব্যবসায়ীরা। বিশ্ববাজারে দাম কমলেও এরা নিজেদের স্বার্থে স্থানীয় বাজারে জ্বালানি মূল্য কমাতে দিচ্ছে না।

এ প্রসঙ্গে বিপিসির চেয়ারম্যান এম বদরুদ্দোজা বলেন, লুটপাটের বিষয়টি সঠিক নয়। গত অর্থবছরে বিপিসি সত্যিকার অর্থে লাভ করেছে ৫ হাজার ৫০০ কোটি টাকা। এর মধ্যে ৩ হাজার কোটি টাকা বকেয়া পরিশোধ করা হয়েছে। বাকি টাকা বিপিসির কোষাগারে জমা আছে। তিনি বলেন, এখন প্রতি লিটার ডিজেল কেরোসিন আর ফার্নেস অয়েলে গড়ে ১৬-১৮ টাকা লাভ হচ্ছে। অকটেন ও পেট্রলে লাভ ২০ টাকার বেশি। আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম ১২ বছরের মধ্যে সর্বনিু হলেও দেশে দাম কমানো হচ্ছে না কেন- এ বিষয়ে তিনি বলেন, দাম কমানোর বিষয়টি সম্পূর্ণ সরকারের বিষয়। এ নিয়ে কোনো মন্তব্য করবেন না বলেও জানান তিনি।

বিশেষজ্ঞদের মতে, গত তিন মাসে সবচেয়ে বেশি মুনাফা হয়েছে অকটেনে। এতে লাভের হার ১০৯ শতাংশ। অপরদিকে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত ডিজেলে এ লাভের হার ৭৪ শতাংশ। তারা বলেন, দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে থাকার পরও চলতি অর্থবছর শেষে বিপিসির মুনাফা দাঁড়াবে ১১ হাজার কোটি টাকা। সরকারের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, বিপিসির ঋণ ৩০ হাজার কোটি টাকা। কিন্তু তা মানতে রাজি নন অর্থনীতিবিদরা।

এ ব্যাপারে বিশ্বব্যাংকের ঢাকা অফিসের লিড ইকোনমিস্ট ড. জাহিদ হোসেন বলেন, সরকার বিপিসির যে লোকসানের কথা বলছে, তা সঠিক নয়। কারণ প্রতি বছর বিপিসি’কে যে সহায়তা দেয়া হতো তা বাজেট। এটি জনগণের করের টাকা। আর প্রতি বছরই এটি পরিশোধ করা হয়। ফলে লোকসান থাকার কথা নয়। তিনি বলেন, অর্থনীতির স্বার্থে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করতে হবে। এতে মূল্যস্ফীতি কমবে ও প্রবৃদ্ধি দুটি বাড়বে।

বিপিসির হিসাব অনুযায়ী, আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে কমে যাওয়ায় প্রতি লিটার ডিজেল আর ফার্নেস অয়েলে তাদের লাভ হচ্ছে ১৭ থেকে ১৮ টাকা করে। কিন্তু বিশেষজ্ঞদের মতে, এ লাভ কমপক্ষে ২৯ টাকা। অপরদিকে অকটেনে লাভ করছে ৫২ টাকা। কিন্তু বিপিসি বলছে, তাদের লাভ হচ্ছে মাত্র ২২ টাকা। এছাড়া প্রতি লিটার পেট্রলে অফিসিয়াল লাভ ২১ টাকা দেখানো হলেও বাস্তবে লাভ হচ্ছে ৪৪ টাকা। দেশে প্রতি বছর গড়ে জ্বালানি তেল আমদানি করা হচ্ছে ৫৩ লাখ ২১ হাজার টন। লিটার হিসাব করলে দাঁড়ায় ১ হাজার ১০০ কোটি লিটার। বিশেষজ্ঞরা বলেছেন, গড়ে সর্বনিু ৫ টাকা করে লাভ কম দেখালেও বিপিসির লোপাটের পরিমাণ দাঁড়াবে সাড়ে ৫ হাজার কোটি টাকার বেশি।

জানা গেছে, দেশে ৬ ধরনের জ্বালানি তেল ব্যবহার হয়। এসব তেলের মূল কাঁচামাল অশোধিত তেল। তিন মাস থেকেই বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল অশোধিত তেল ৩৭ থেকে ৩৮ ডলারে উঠানামা করছে। প্রতি ডলার ৮০ টাকা হিসাবে প্রতি লিটারের দাম পড়ে ১৮ টাকা (১ ব্যারেল সমান ১৫৯ লিটার)। কিন্তু দেশে আন্তর্জাতিক বাজারের দরের সঙ্গে যোগ হয় জাহাজ ভাড়া, কর, ইন্স্যুরেন্স প্রিমিয়াম এবং রিফাইনিং কস্ট। বিশ্বব্যাংকের ফরমেটে এ চার ধরনের খরচ যোগ করে প্রতি লিটার অকটেনের উৎপাদন খরচ দাঁড়ায় ৪৯ টাকা। কিন্তু বাজারে বিক্রি হয় ৯৯ টাকা। এক্ষেত্রে প্রতি লিটারে মুনাফা ৫২ টাকা। শতকরা হিসাবে যা ১০৯ শতাংশ। ডিজেলের উৎপাদন খরচ লিটারপ্রতি ৩৯ টাকা, বিক্রি হয় ৬৮ টাকায়। এক্ষেত্রে মুনাফা ২৯ টাকা। পেট্রল উৎপাদন ৫২ টাকা, বিক্রি ৯৬। কেরোসিন উৎপাদন ৩৩, বিক্রি ৩১ টাকা। ফার্নেস অয়েল উৎপাদন ৪০ টাকা, বিক্রি ৬০ টাকা এবং জেট ফুয়েল উৎপাদন ৪৫ এবং বিক্রি ৭৪ টাকা। এদিকে রোববার বিশ্ববাজারে প্রতি ব্যারেল তেলের দাম ছিল ২৯ ডলার। এ হিসাবে প্রতি লিটারের দাম ১৪ টাকা ৫৯ পয়সা। তবে বিভিন্ন আন্তর্জাতিক প্রতিষ্ঠানের পূর্বাভাস বলছে, এ দাম আরও কমে প্রতি ব্যারেল ২০ ডলারেও আসতে পারে। রোববার ভারতে প্রতি লিটার ডিজেলের দাম ছিল ৫৬ টাকা।

বিশ্বের শীর্ষ স্থানীয় মার্চেন্ট ব্যাংক গোল্ডম্যান সাক্সের বিশ্লেষকরা বলছেন, তিন কারণে জ্বালানি তেলের এ দরপতন। এর মধ্যে রয়েছে অর্থনৈতিক মন্দায় লাতিন আমেরিকা, জাপান ও ইউরোপে তেলের চাহিদা কমছে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের ওপর থেকে নিষেধাজ্ঞা তুলে নেয়ায় তেলের উৎপাদনও বেড়েছে। এছাড়াও ইরাক ও সিরিয়ার বড় বড় তেলক্ষেত্রগুলো আইএস জঙ্গিদের নিয়ন্ত্রণে। এ কারণে অবৈধভাবে বাজারে আসছে তেল। প্রতিষ্ঠানটি পূর্বাভাস দিচ্ছে, ২০২০ সালের আগে তেলের দাম আর ৫০ ডলারের ওপরে যাবে না। তবে দাম কমলেও উৎপাদন না কমানোর সিদ্ধান্ত নিয়েছে তেল রফতানিকারক দেশগুলোর সংগঠন ওপেক। সংস্থাটির যুক্তি হল, দাম কমালে তেলের বাজার মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের হাতে চলে যেতে পারে।

আন্তর্জাতিক বাজারে জ্বালানি তেলের দাম অস্বাভাবিক হারে কমলেও এর সুফল পাচ্ছেন না দেশের ভোক্তারা। যদিও এর আগে আন্তর্জাতিক বাজারে দাম বাড়ার অজুহাত দেখিয়ে পাঁচ দফা বাড়ানো হয়েছিল তেলের দাম। কিন্ত এখন দাম কমানো হচ্ছে না। বিদ্যমান পরিস্থিতিতে স্থানীয় বাজারে তেলের দাম বেশি হওয়ায় পণ্যের উৎপাদন ব্যয় কমানো সম্ভব হচ্ছে না। বরং অনেক ক্ষেত্রে এসব ব্যয় বেড়ে যাচ্ছে। পাশাপাশি বাড়ছে বিদ্যুৎ, পানিসহ সেবা খাতের বিলও। ব্যাংক ঋণের উচ্চ সুদ তো আছেই। এতে ভোক্তাদের যেমন দুর্ভোগ কমছে না, তেমনিভাবে আন্তর্জাতিক বাজারেও পণ্য মূল্য প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়ছে বাংলাদেশ। এ অবস্থায় স্থানীয় বাজারেও জ্বালানি তেলের দাম কমানো জরুরি বলে অভিমত দিয়েছেন ব্যবসায়ীসহ সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্লেষকদের বক্তব্য, জ্বালানি তেলের দাম কমানো নিয়ে সরকার জনগণের সঙ্গে এক ধরনের প্রতারণা করছে। কারণ হিসেবে তারা বলেছেন, ইতিমধ্যে ভারতসহ অনেক দেশে তেলের দাম অনেক কমানো হলেও আমাদের সরকার নিশ্চুপ। সর্বশেষ ২০১৩ সালের জানুয়ারিতে দেশের বাজারে জ্বালানি তেলের দাম বাড়ানো হয়। ওই সময়ে পেট্রল ও অকটেনের দাম লিটার প্রতি ৫ টাকা এবং ডিজেল ও কেরোসিনের দাম লিটার প্রতি বাড়ানো হয়েছিল ৭ টাকা। ওই সময় সরকার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, বিশ্ববাজারে দাম কমলে স্থানীয় পর্যায়েও দাম সমন্বয় করা হবে। কিন্তু সরকার কথা রাখেনি।

বিপিসির এক কর্মকর্তা বলেন, চাহিদা অনুযায়ী বছরে গড়ে দেড়শ’ থেকে ২শ’ জাহাজ তেল আমদানি করতে হয়। এ হিসাবে প্রতি মাসে গড়ে ২০ থেকে ২৫ জাহাজ তেল আমদানি হয়। বর্তমানে বাংলাদেশের সঙ্গে ৪-৫টি দেশের সঙ্গে তেল ক্রয়ের চুক্তি আছে। এর মধ্যে কুয়েত, সৌদি আরব, আরব আমিরাত, মালয়েশিয়া এবং ইরান অন্যতম। গড়ে ৩ মাস, ৬ মাস ও এক বছরের জন্য চুক্তি হয়ে থাকে। ওই চুক্তিতে নির্দিষ্ট করে কোনো মূল্য বেঁধে দেয়া হয় না। তেল জাহাজে তোলার সময় আন্তর্জাতিক বাজারের দাম ও প্রিমিয়াম মিলিয়ে জ্বালানি তেলের মূল্য নির্ধারণ করা হয়। এক্ষেত্রে জাহাজীকরণের আগের ২ দিন ও পরের ২ দিনসহ মোট ৫ দিনের আন্তর্জাতিক বাজারমূল্যের গড়ের সঙ্গে প্রিমিয়াম যোগ করে দাম নির্ধারণ করা হয়। কাজেই চুক্তির কারণে আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম কমে গেলে বিপিসিকে বাধ্য হয়ে বেশি দামে তেল ক্রয় করতে হচ্ছে এ কথা সঠিক নয়।

বিপিসির একজন শীর্ষ কর্মকর্তা বলেন, আন্তর্জাতিক বাজারে তেলের দাম যখন বেশি ছিল (জুনের আগে) তখন তাদের প্রতি লিটার তেলের আমদানি দাম পড়ত ৬৫ টাকা। আর স্থানীয় বাজারে সেই তেল বাজারে বিক্রি হতো ৬৮ টাকায়। কিন্তু প্রতি লিটারে জাতীয় রাজস্ব বোর্ডকে ৭-৮ টাকা শুল্ক দিতে হতো। আর তাতেই ডিজেল বিক্রিতে লোকসানে পড়ত বিপিসি। আর ফার্নেস, পেট্রল, অকটেন ও জেট ফুয়েল বিক্রি করে অনেক আগে থেকেই মুনাফা করছে। বিপিসি সূত্রে জানা যায়, বছরে দেশে আমদানি করা ৫৭ লাখ টন জ্বালানি তেলের মধ্যে ৩৩ লাখ টনই ডিজেল। যা মোট আমদানির ৬৫ শতাংশ। ডিজেলের পর বেশি আমদানি হয় ফার্নেস অয়েল। এর পরিমাণ ১০-১২ লাখ টন।

জ্বালানি বিভাগ সূত্র জানায়, চলতি বাজেটে জ্বালানি তেল আমদানিতে ট্যারিফ মূল্য বাড়ানো হয়েছে। বেসরকারি খাতের একাধিক কোম্পানি বর্তমানে ভ্যাটমুক্ত সুবিধায় তেল আমদানি করছে। ট্যারিফ-ভ্যাট মওকুফ হলে বিপিসিও দাম কমাতে পারবে। কিন্তু ভ্যাট মওকুফ করার পরিবর্তে বিপিসি থেকে রাজস্ব বাড়ানোর লক্ষ্যমাত্রা নিয়েছে সরকার।

এদিকে বিশ্ববাজারে জ্বালানি তেলের মূল্য কমায় আমদানিকারক দেশ হিসেবে বাংলাদেশের অর্থনীতিতে ইতিবাচক প্রভাব পড়বে। সরকারের ভর্তুকির পরিমাণও কমবে। পাশাপাশি শিল্প খাতের অবস্থান ভালো হবে। এমন আভাস দিয়ে সম্প্রতি রিপোর্ট প্রকাশ করেছে এশীয় উন্নয়ন ব্যাংক (এডিবি)। তাদের প্রতিবেদনে বলা হয়, বাংলাদেশ বিদেশ থেকে জ্বালানি তেল আমদানি করছে। এ তেলের মূল্য কমায় ২০১৫ সালের অর্থনীতিতে বড় ধরনের চমক এসেছে। কমবে নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের দামও। বিশেষজ্ঞদের মতে, জ্বালানি তেলের মূল্য কমার ফলে পরিবহন ব্যয় হ্রাস পাবে। শিল্প খাতে জ্বালানি তেলের ব্যবহারে ব্যয় কমবে। উৎপাদন ব্যয়ও কমবে।

বাংলাদেশ ব্যাংকের প্রধান অর্থনীতিবিদ ড. বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বিনিয়োগের জন্য অন্যতম উপাদান হল জ্বালানি তেল। আর বর্তমানে বিশ্ববাজারের সঙ্গে জ্বালানি তেলের দামের ব্যবধান অনেক বেশি। এটি সমন্বয় করা উচিত। এতে বিনিয়োগ বাড়বে। তিনি বলেন, জ্বালানি তেলের দাম কমালে মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় কমবে। আর নিত্যপণ্যের দাম কমলে মানুষের ভোগও বাড়বে। বিরূপাক্ষ পাল বলেন, বিশ্বের অনেক দেশ আছে, যারা মূল্যস্ফীতি কমিয়ে অভ্যন্তরীণ চাহিদা বৃদ্ধির মাধ্যমে অর্থনীতিকে শক্তিশালী করেছে।

জানতে চাইলে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক অর্থ উপদেষ্টা ড. এবি মির্জ্জা আজিজুল ইসলাম বলেন, অর্থনৈতিক দৃষ্টিকোণ থেকে তো বটেই অন্য যে কোনো দিক বিচার করলে জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করা উচিত। তবে দাম কতটুকু সমন্বয় করা হবে তা নিয়ে আলাপ-আলোচনা হতে পারে। এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক বাজার পরিস্থিতি মাথায় রেখে প্রতি ৩ মাস পরপর জ্বালানি তেলের দাম সমন্বয় করার একটি পলিসি নিয়ে সরকার চিন্তা-ভাবনা করতে পারে।

আরও পড়ুন