সরকারি কোষাগার থেকে বেতন নেওয়া প্রজাতন্ত্রের কর্মচারীদের (এখন সবাই কর্মচারী, কারণ সেই প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয়, চতুর্থ শ্রেণি বলে কিছু নেই) জন্য চালু করা অষ্টম বেতন কাঠামো নিয়ে নানা আলোচনা হলেও এর মোটা দাগে ৭টি বৈশিষ্ট্য রয়েছে।
অষ্টম পে-স্কেলের ৭টি বিশেষ বৈশিষ্ট্য হলো—
১. প্রায় চার দশক ধরে চালু সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেল বাতিল;
২. কর্মকর্তা-কর্মচারীদের চাকরিতে যোগদান বা পদোন্নতির বিভিন্ন তারিখে নির্ধারিত অঙ্কে বার্ষিক ইনক্রিমেন্ট প্রদানের প্রথা বাতিল করে প্রতি বছর ১ জুলাই শতাংশ হারে বেতন বৃদ্ধি;
৩. চাকরিজীবীদের প্রথম, দ্বিতীয়, তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণীতে বিভাজন বিলুপ্তি এবং গ্রেড অনুযায়ী পরিচিতি;
৫. সব প্রকার ভাতা উল্লেখযোগ্য হারে বৃদ্ধি;
৬. নববর্ষ ভাতা প্রবর্তন এবং
৭. অবসর সুবিধাদির বৃদ্ধি।
অতীতে পে-স্কেল ঘোষণা করলে যে ক্ষোভ-অসন্তোষ হয়নি, তা নয়। তবে তা বর্তমানের মতো বড় সংকট সৃষ্টি করেনি। এবারের পে-স্কেল নিয়ে কেন সংকট সৃষ্টি হলো, তা আলোচনা করাই এ নিবন্ধের মুখ্য উদ্দেশ্য।
অষ্টম পে-কমিশন তাদের সুপারিশ প্রণয়নে এবং সচিব কমিটি কমিশনের রিপোর্ট পর্যালোচনা করে সরকারের কাছে সুপারিশ প্রদানে বেশি কিছু বিষয় গুরুত্বসহকারে পর্যালোচনা করেছে বলে মনে হয় না।
অন্য যেকোনো দেশের সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মতো বাংলাদেশেও সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন কাঠামো নির্ধারণ একটি স্পর্শকাতর বিষয়। বেতন স্কেল নির্ধারণ, চাকরির বয়স বৃদ্ধির সঙ্গে সঙ্গে পদোন্নতি বা অন্যভাবে উচ্চতর স্কেলপ্রাপ্তি, বার্ষিক বেতন বৃদ্ধি ইত্যাদি পদ্ধতিতে সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারীরা একবার অভ্যস্ত হয়ে পড়লে তাতে কোনো প্রকার পরিবর্তন, বিশেষ করে সে পরিবর্তন যদি তাদের মতে তাদের স্বার্থের অনুকূলে না হয়, তারা সহজে মেনে নিতে চান না।
সরকার আশা করেছিল, আগের যেকোনো পে-স্কেলের তুলনায় অষ্টম পে-স্কেলে কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বেতন-ভাতা ও অবসর সুবিধাদি অধিক পরিমাণে বৃদ্ধি পাওয়ায় তারা খুশি হবেন এবং সরকারকে ধন্যবাদ জানাবেন। কিন্তু দেখা গেল, বিসিএস (প্রশাসন) ক্যাডারের সিনিয়র পর্যায়ের কর্মকর্তা ছাড়া আর কেউ এ বেতন স্কেল নিয়ে সন্তুষ্ট নন। বিসিএসের অন্য ২৬ ক্যাডারের কর্মকর্তা, নন-ক্যাডার কর্মকর্তা-কর্মচারী, কেন্দ্রীয় ব্যাংক বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তা, সরকারি স্কুল ও কলেজের শিক্ষক, সরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সবাই বেতন কাঠামোর বিরোধিতা করছেন।
শীর্ষপর্যায়ের স্বল্পসংখ্যক কর্মকর্তা বাদে অন্য সব পর্যায়ের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের অসন্তোষের প্রধান কারণ দীর্ঘসময় চালু থাকা টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড প্রদান বাতিল। তাই বিষয়টি নিয়ে প্রথমে আলোচনা করা যাক। টাইম স্কেল বলতে একই পদে উচ্চতর বেতন স্কেলকে বোঝায়। পদোন্নতির যোগ্য অথচ শূন্য পদের অভাবে পদোন্নতি দেয়া যাচ্ছে না, এমন কর্মচারী এবং জুনিয়র ও মধ্যম স্তরের কর্মকর্তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দিতে প্রবর্তন করা হয় টাইম স্কেল। ১৯৮১ সালে প্রবর্তিত এ পদ্ধতি প্রথমত ক্যাডার সার্ভিসের কর্মকর্তাদের ক্ষেত্রে প্রযোজ্য করা হয়। এতে ক্যাডারবহির্ভূত সার্ভিসগুলোর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দেখা দিলে সরকার ১৯৮৪ সালে সব শ্রেণীর কর্মকর্তা-কর্মচারীকে এ পদ্ধতির সুবিধা প্রদানের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করে। নন-গেজেটেড কর্মচারীদের একই বা পরস্পর বদলিযোগ্য পদে ৮, ১২ ও ১৫ বছর পূর্তিতে তাদের চাকরির সন্তোষজনক রেকর্ডের ভিত্তিতে প্রথম, দ্বিতীয় ও তৃতীয় টাইম স্কেল প্রদানের বিধান করা হয়। দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তা ও প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তাদের জুনিয়র ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তাদেরও কতিপয় শর্তসাপেক্ষে টাইম স্কেল প্রদানের বিধান করা হয়। তবে জাতীয় বেতনের চতুর্থ স্কেলের ঊর্ধ্বের কোনো কর্মকর্তাকে টাইম স্কেল দেয়া হতো না।
অনুরূপভাবে শূন্য পদ বা পদোন্নতির সুযোগ না থাকায় (ব্লকড পোস্ট) একই স্কেলে দীর্ঘদিনের সন্তোষজনক চাকরির পর অনেকে পদোন্নতি পান না। এ ধরনের কর্মকর্তা-কর্মচারীর একটি নির্ধারিত অংশকে কতিপয় শর্ত পূরণসাপেক্ষে উচ্চতর স্কেল প্রদান করা হয়, যা সিলেকশন গ্রেড নামে পরিচিত। যত দূর জানা যায়, সত্তরের দশকে সিলেকশন গ্রেড চালু করা হয়।
টাইম স্কেলের ভালো-মন্দ দুই দিকই রয়েছে। এর ভালো দিকটি হলো, পদোন্নতির যোগ্য অথচ শূন্যপদের অভাবে পদোন্নতি দেয়া যাচ্ছে না— এমন কর্মচারী এবং জুনিয়র ও মধ্যম স্তরের কর্মকর্তাদের আর্থিক ক্ষতি পুষিয়ে দেয় টাইম স্কেল। আর দুর্বল দিকটি হলো, একজন কর্মচারী একই বা পরস্পর বদলিযোগ্য পদে তিনটি টাইম স্কেল পেয়ে পদোন্নতিপ্রাপ্ত কর্মচারীর চেয়ে বেশি বেতন পান। অর্থাত্ নিম্নপদে চাকরি করে উচ্চপদের কর্মচারীর চেয়ে বেশি বেতন পান। টাইম স্কেল সম্পর্কে জাতীয় বেতন কমিশন ১৯৯৬-এর মন্তব্য এখানে প্রণিধানযোগ্য। ওই কমিশন তাদের প্রতিবেদনে মন্তব্য করে, ‘যে উদ্দেশ্যে এবং শর্তসাপেক্ষে টাইম স্কেল প্রবর্তন করা হয়েছিল, তা সফল হয়নি। কর্মকর্তা-কর্মচারী নির্বিশেষে টাইম স্কেল প্রদানের সময় কেবল চাকরির মেয়াদকেই একমাত্র শর্ত হিসেবে বিবেচনা করা হয়ে থাকে। অন্যান্য গুরুত্বপূর্ণ শর্তকে বিবেচনা করা হয় না। এর ফলে সরকার ও জনগণ কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কাছ থেকে প্রত্যাশিত দক্ষতা ও সন্তোষজনক সেবা পাচ্ছে না। অধিকন্তু, ব্যাপকভাবে এই বিশেষ সুবিধা প্রদানের ফলে সত্যিকার মেধাবী কর্মকর্তা-কর্মচারীরা সঠিকভাবে মূল্যায়িত হচ্ছেন না। এতে আবার অনেক সময় শৃঙ্খলা-পরিপন্থী অবস্থারও সূচনা হয়েছে।’
টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড বাতিলের ফলে সবচেয়ে ক্ষতিগ্রস্ত হবেন নিচের স্তরের কর্মচারীরা, বিশেষ করে ১১-২০ গ্রেডের কর্মচারীরা। কারণ এসব গ্রেডে কর্মচারীর সংখ্যার তুলনায় পদোন্নতির সুযোগ অনেক কম। টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেড চালু থাকাকালে পদোন্নতি না পেলেও তারা আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হতেন না। দ্বিতীয় শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তারা ও প্রথম শ্রেণীর গেজেটেড কর্মকর্তাদের জুনিয়র ও মধ্যম পর্যায়ের কর্মকর্তারাও টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের সুবিধাবঞ্চিত হয়ে আর্থিকভাবে কিছুটা ক্ষতিগ্রস্ত হবেন। তবে এ প্রসঙ্গে সরকারের বক্তব্য হলো, টাইম স্কেল ও সিলেকশন গ্রেডের বিকল্প হিসেবে দুটি গ্রেড স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তনের সুযোগ রাখা হয়েছে নতুন পে-স্কেল আদেশে। ফলে চাকরির বয়স ১০ বছর পূর্ণ হওয়ার পর একটি এবং ১৬ বছর পর আরেকটি গ্রেড স্বয়ংক্রিয়ভাবে পরিবর্তন হবে। তবে এক্ষেত্রে কতিপয় শর্তযুক্ত যথা— কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী আগের বেতন স্কেলে দুবার সিলেকশন গ্রেড বা টাইম স্কেল পেয়ে এক বছর পার করে থাকলে তিনি কোনো কর্মকর্তা-কর্মচারী নতুন বেতন স্কেলে ১০ বছর চাকরি পূর্ণ হওয়ার পর স্বয়ংক্রিয়ভাবে গ্রেড পরিবর্তনের পর পদোন্নতি পেলে তার ১৬ বছর চাকরি পূর্ণ হলে স্বয়ংক্রিয়ভাবে দ্বিতীয়বার গ্রেড পরিবর্তন না হওয়া এবং চতুর্থ গ্রেডের উপরের কর্মকর্তা এ সুবিধা না পাওয়া— আদেশটি সিলেকশন গ্রেড ও টাইম স্কেলের সুবিধাদি যে সম্পূর্ণভাবে পূরণ করবে না, তা অনেকটা জোর দিয়ে বলা যায়।
দ্বিতীয় অভিযোগটি হলো, ক্যাডার ও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের বেতনবৈষম্য। অষ্টম পে-স্কেলের আগে ক্যাডার ও নন-ক্যাডার উভয় প্রকার প্রথম শ্রেণীর প্রবেশ পদ ছিল নবম গ্রেডের। নতুন পে-স্কেল আদেশে নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রথম শ্রেণীর প্রবেশ পদের বেতন স্কেল ক্যাডার কর্মকর্তাদের তুলনায় একধাপ নিচে নির্ধারণ করা হয়েছে। অর্থাত্ অষ্টম পে-স্কেলে ক্যাডার কর্মকর্তাদের প্রবেশ পদে বেতন স্কেল অষ্টম গ্রেডে উন্নীত করা হলেও নন-ক্যাডার কর্মকর্তাদের আগের গ্রেডে অর্থাত্ নবম গ্রেডে রাখা হয়েছে। নন-ক্যাডার কর্মকর্তারা এ বেতনবৈষম্য অবসানের জন্য আন্দোলনে নেমেছেন।
বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা মূলত দুটি দাবিতে আন্দোলন করছেন। একটি হলো, বেতনবৈষম্য অবসান এবং অন্যটি স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন। বেতনবৈষম্যের ক্ষেত্রে তারা সহকারী পরিচালক পদের বেতন স্কেল অষ্টম থেকে নবম গ্রেডে এবং নির্বাহী পরিচালক পদের বেতন স্কেল প্রথম থেকে দ্বিতীয় গ্রেডে অবনমনের বিপক্ষে কথা বলছেন। তাদের মূল দাবিটি হলো, বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তন। এর সমর্থনে তাদের যুক্তি হলো, বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের একটি বিশেষ অবস্থান রয়েছে এবং স্বাধীনতার আগে পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় ব্যাংক ‘স্টেট ব্যাংক অব পাকিস্তান’-এর বেতন কাঠামো সরকারের বেতন কাঠামো থেকে ভিন্ন ছিল। এসব যুক্তিতে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে (২০০৭-০৮) বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর একটি প্রস্তাব অর্থ মন্ত্রণালয়ে পাঠানো হলে ওই সরকার তা নাকচ করে দেয়। বর্তমান আওয়ামী লীগ সরকারের আগের মেয়াদে (২০০৯-১৩) বাংলাদেশ ব্যাংক স্বতন্ত্র বেতন স্কেল প্রবর্তনের প্রস্তাবটি পুনরায় সরকারের কাছে পাঠানো হয়। অর্থমন্ত্রী মুহিত প্রস্তাবটি শিগগির চূড়ান্ত করতে মন্ত্রিপরিষদ বিভাগকে নির্দেশ দেন। প্রস্তাবটি নিয়ে পরীক্ষা-নিরীক্ষা চলতে থাকে। বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র বেতন কাঠামো চালুর সমর্থনে অর্থমন্ত্রী একাধিকবার বক্তব্য রাখেন। ২০১৪ সালের জানুয়ারির নির্বাচনে পুনরায় ক্ষমতায় এসে আওয়ামী লীগ সরকার অষ্টম পে-কমিশন গঠনের সিদ্ধান্ত নিলে বাংলাদেশ ব্যাংকে আলাদা পে-স্কেল চালুর বিষয়টি অনেকটা আড়ালে চলে যায়। অষ্টম পে-স্কেল মন্ত্রিসভার অনুমোদন পেলে এবং তা বাংলাদেশ গেজেটে প্রজ্ঞাপন আকারে জারির পর অর্থমন্ত্রী এখন বলছেন, বাংলাদেশ ব্যাংকে স্বতন্ত্র বেতন স্কেল চালুর প্রয়োজন নেই। তত্ত্বাবধায়ক সরকার কর্তৃক প্রস্তাবটি প্রত্যাখ্যান করার যৌক্তিকতা অর্থমন্ত্রী মুহিত আগে অনুধাবন করলে বিষয়টি এত দূর গড়াত না।
এএইচএম আনোয়ারুল করিম: সম্পাদক, নিউজওয়ার্ল্ডবিডি ডট কম।



