বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

রোহিঙ্গাদের পরিচয়পত্র দেবে বাংলাদেশ : মার্চে গণনা

jugantor_2476মিয়ানমার থেকে বাংলাদেশে আসা রোহিঙ্গাদের বিষয়ে তথ্যসংবলিত পরিচয়পত্র প্রদান করবে বাংলাদেশ। তার আগে আগামী মার্চে রোহিঙ্গাদের গণনা শুরু হবে। কয়েকজন বিদেশী কূটনীতিক ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের এ বিষয়টি অবহিত করেছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়।

পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় যুক্তরাষ্ট্র ও ইউরোপের কয়েকজন রাষ্ট্রদূত কিংবা তাদের দূতাবাসের প্রতিনিধি, বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিনিধি ও দাতা সংস্থার প্রতিনিধিদের সঙ্গে এ বিষয়ে বৈঠক করেন। এ সময় রোহিঙ্গা ইস্যু এবং অভিবাসন সংক্রান্ত জিএফএমডি (গ্লোবাল ফোরাম ফর মাইগ্রেশন) নিয়ে বাংলাদেশের বিভিন্ন কার্যক্রম অবহিত করা হয়।

সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন, বর্তমানে কক্সবাজারের উখিয়া ও টেকনাফে অবস্থিত দুটি শরণার্থী শিবিরে প্রায় ৩২ হাজার রোহিঙ্গা রয়েছেন। তাদের শরণার্থীর মর্যাদা দিলেও শিবিরের বাইরে প্রায় চার লাখ রোহিঙ্গা খুপরি ঘর বেঁধে অবস্থান করছেন। এই রোহিঙ্গাদের বাংলাদেশ অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে বিবেচনা করে থাকে। তবে তাদেরও নিবন্ধনের জন্য আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের চাপের মুখে বাংলাদেশ এখন শরণার্থী শিবিরের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের গণনা করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। এই গণনার জন্য পরিসংখ্যান ব্যুরো কাজ করছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হক সোমবার রাতে বলেন, ‘আগামী মার্চে রোহিঙ্গাদের গণনা শুরু হবে। রোহিঙ্গা বিষয়ে যে প্রকল্প রয়েছে সে সম্পর্কে সংশ্লিষ্ট বিদেশীদের অবহিত করা হয়েছে। এছাড়া ডিসেম্বরে ঢাকায় জিএফএমডি সম্মেলন অনুষ্ঠিত হবে। এ নিয়েও বিস্তারিত অবহিত করা হয়েছে।’

নাম প্রকাশ না করার শর্তে বৈঠকে উপস্থিত একজন বিদেশী কূটনীতিক জানিয়েছেন, শরণার্থী শিবিরের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের তথ্য সংবলিত একটি পরিচয়পত্র দেবে বাংলাদেশ। এই পরিচয়পত্রে তাদের অবশ্য মিয়ানমারের নাগরিক হিসাবেই উল্লেখ করা হবে। শিবিরের বাইরে থাকা রোহিঙ্গাদের স্বাস্থ্য, শিক্ষাসহ বিভিন্ন মৌলিক সুবিধা দেয়ার লক্ষ্যে এই পরিচয়পত্র দেয়া হবে। ইতিপূর্বে সৌদি আরবের অনুরোধে ওই দেশে অবস্থানরত রোহিঙ্গাদের একই ধরনের পরিচয়পত্র দেয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বাংলাদেশ। সৌদি আরবে প্রায় পাঁচ লাখ রোহিঙ্গা রয়েছে। তাদের বেশির ভাগই বাংলাদেশী পাসপোর্ট নিয়ে অবৈধ উপায়ে সে দেশে গেছে। সৌদি সরকার রোহিঙ্গাদের প্রতি সহানুভূতিশীল।

বাংলাদেশী এক কূটনীতিক মনে করেন, রোহিঙ্গাদের এ ধরনের পরিচয়পত্র দেয়া হলে তারা অবৈধ অবস্থা থেকে এক ধরনের বৈধতা লাভ করবে। তবে তিনি এটাও বলেন, রোহিঙ্গাদের অবৈধ অনুপ্রবেশকারী হিসেবে চিহ্নিত করে কারাগারে পাঠানো হলে তাদের মিয়ানমার ফেরত নেয় না। এতে কোনো সমাধান হয় না। তাই তাদের পরিচয়পত্র দিয়ে মৌলিক সেবা নিশ্চিত করা যায়।

বৈঠকে উপস্থিত এক কূটনীতিক বলেন, গণনার ক্ষেত্রে বড় সমস্যা হল রোহিঙ্গারা ভয়ে পালিয়ে থাকতে পারেন। কেননা তারা মনে করতে পারেন, তাদের গ্রেফতার করে কারাগারে কিংবা মিয়ানমারে পুশব্যাক করা হতে পারে।

এদিকে রোহিঙ্গাদের শিক্ষা, স্বাস্থ্যসহ মৌলিক সুবিধা নিশ্চিত করার কাজ করছে আন্তর্জাতিক অভিবাসী সংস্থা (আইওএম)। সরকার এ বহুজাতিক সংস্থাটিকে এ কাজে অনুমতি দিয়েছে। সাধারণত জাতিসংঘের শরণার্থী সংস্থা ইউএনএইচসিআর এ ধরনের কার্যক্রম পরিচালনা করে থাকে। কয়েকজন বিদেশী কূটনীতিক ইউএনএইচসিআরের বদলে আইওএমকে এই দায়িত্ব দেয়ায় বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। জানা গেছে, ইউএনএওইচসিআর দীর্ঘদিন এ কাজ করলেও তাদের কার্যক্রমে সরকার সন্তুষ্ট নয়।

সংশ্লিষ্ট সূত্র মতে, রোহিঙ্গাদের যাতে মিয়ানমার ফিরিয়ে নেয় সে ব্যাপারে বিভিন্ন সময়ে বিদেশীদের বিশেষ করে পশ্চিমা দেশগুলোর সহায়তা কামনা করা হয়েছে। তবে পশ্চিমাদের মধ্যে রোহিঙ্গা ইস্যুতে বাংলাদেশের কার্যক্রম সম্পর্কে যাতে কোনো ভুল বোঝাবুঝির অবকাশ না থাকে সে লক্ষ্যে তাদের বিভিন্ন সময়ে অবহিত করছে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। জানা গেছে, যুক্তরাষ্ট্র থেকে কংগ্রেস সদস্যদের একটি প্রতিনিধি দল বাংলাদেশ সফর করে রোহিঙ্গাদের অবস্থা সরাসরি প্রত্যেক্ষ করবে।

অপরদিকে জিএফএমডি সম্মেলনের বিষয়ে বিদেশীদের জানানো হয়, ২০১৬ সালে বাংলাদেশ এই ফোরামের সভাপতির দায়িত্ব পালন করছে। ডিসেম্বরে ঢাকায় একটি আন্তর্জাতিক সম্মেলন করা হবে। এতে জাতিসংঘ মহাসচিব বান কি মুনসহ বিশ্বের বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধিরা উপস্থিত থাকবেন।

পররাষ্ট্র সচিবের ডাকা এই ব্রিফিংয়ে মার্কিন রাষ্ট্রদূত মার্শা বার্নিকাট, ইউরোপীয় ইউনিয়নের রাষ্ট্রদূত পিয়েরে মায়াদুনসহ ইউরোপ ও আমেরিকার বিভিন্ন দেশের প্রতিনিধি, আইওএম, ইউএনএইচসিআরসহ বিভিন্ন আন্তর্জাতিক সংস্থা ও দাতা সংস্থার ২৫-৩০ জন প্রতিনিধি উপস্থিত ছিলেন।

ভারতের নতুন হাইকমিশনারের সাক্ষাৎ : ভারতের নতুন হাইকমিশনার হর্ষবর্ধন শ্রিংলা সোমবার রাষ্ট্রীয় অতিথি ভবন পদ্মায় পররাষ্ট্র সচিব মো. শহিদুল হকের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন। এ সময় পররাষ্ট্র সচিবের আসন্ন ভারত সফরের বিষয়ে আলোচনা হয়। পররাষ্ট্র সচিব ৩১ জানুয়ারি থেকে ২ ফেব্র“য়ারি পর্যন্ত ভারত সফর করবেন। সফরকালে তিনি ভারতের পররাষ্ট্র সচিব সুব্রামিনিয়াম জয়শঙ্করের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক করবেন। বৈঠকে জুনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফরকালে গৃহীত সিদ্ধান্ত বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা হবে।

পদ্মা সেতুর অগ্রগতিতে অভিভূত চীনের কূটনীতিকরা : বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর থেকে চীনের যেসব কূটনীতিক এ দেশে রাষ্ট্রদূতের দায়িত্বে ছিলেন তাদের একটি প্রতিনিধি দল বর্তমানে ঢাকায় অবস্থান করছেন। তারা আজ বাংলাদেশ ইন্সটিটিউট অব ইন্টারন্যাশনাল অ্যান্ড স্ট্র্যাটেজিক স্টাডিস (বিস) মিলনায়তনে এক সেমিনারে বক্তব্য দেবেন। দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কের ৪০ বছরপূর্তি উপলক্ষে এই সেমিনার হচ্ছে। চীনের সাবেক এই কূটনীতিকরা পদ্মা সেতু বাস্তবায়নে বাংলাদেশের নিজস্ব উদ্যোগ দেখে অভিভূত হয়েছেন বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানিয়েছে। বিশ্বব্যাংকের অর্থ সহায়তা নাকচ করে বাংলাদেশের এই দৃঢ় পদক্ষেপের ভূয়সী প্রশংসা করেছেন তারা।

আরও পড়ুন