বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

এক দল গাছেরটাও খাইবে, তলারটাও কুড়াইবে…

Shahnaz-Gaziশাহনাজ গাজী।

জগতে এমনও বহু পুরুষ রহিয়াছে যাহারা ভাবে, মন্ত্রই বিবাহ। অর্থ না জানিয়া (জানিলেই বা কি?) অচেনা ভাষায় একটি মন্ত্র পাঠ করিয়া সে একটি নারীর মালিকানা পাইতে সক্ষম হইয়াছে – ইহা তাহাদের দৃঢ় বিশ্বাস।

একটি চারাগাছ বাড়ির উঠানে বপন করা হইলে উহা নিজে নিজেই বাড়িবে, উহার পরিচর্যার প্রয়োজন কি? বৃক্ষ তুমি আমার উঠানে শিকড় গাড়িয়াছ, তুমি নড়িতে অক্ষম, তুমি স্থির! তুমি শোভাবর্ধন করিবে, ফল দিবে, ছায়া দিবে। না দিয়া যাইবে কোথা? একবার হেলিবার চেষ্টা করিয়াই দেখ না- গৃহের দরজায় মহাশক্তিমান অগ্নিভূক ওই হুতাশন পাহারায় রহিয়াছেন মনুসংহিতার কপি হাতে। হে মুর্খ বৃক্ষ, সংসার সম্পর্কের মূল ভিত্তি দখলদারিত্ব, এবং স্বয়ং ভগবান আমার পক্ষে রহিয়াছেন ।

এই তো গেল এক প্রকার।

আবার জগতে এমন প্রাণীও বিদ্যমান, যাহাদের ধারণা, এ তাবৎ বিশ্বসংসার এক আনন্দের লীলাভূমি; খোলা অরণ্য বিশেষ। ইহাতে কাহারও কোনো মালিকানা নাই, কোথাও কোনো লক্ষ্মণ-রেখা চোখে পড়ে না। ইহারাও ভাবে, সকল আনন্দের মূল ভিত্তি দখলদারিত্ব (অর্থাৎ যে যাহা, যতটুকু দখল করিয়া পারে)! তাহারা এই গাছের ডাল ধরিয়া নাড়া দিয়া, ওই গাছের ফল পাড়িয়া, সেই গাছের ফুল ছিড়িয়া, দূরবর্তী গাছে ঢিল দিয়া, নিকটবর্তী গাছে করাত চালাইয়া বিপুলানন্দ লাভ করে। ইহাদের যাতায়াত সর্বত্র। ইহারা মর্কটের ন্যায় সারা বেলা কেবল বৃক্ষ হইতে বৃক্ষান্তরে ঘুরিয়া ঘুরিয়া প্রেম কিংবা পীযুষ, কিংবা পুরিষ ছড়াইয়া জীবনযাপন করে। তাহার এই গাছ বাওয়াতেই আনন্দ।

আরেক দল আছে, বড্ড জটিল। উহাদের কথা ইদানিং বেশ শুনিতেছি। তাহারা গাছেরটাও খাইবে, তলারটাও কুড়াইবে। সদর অন্দর উভয়ই তাহার, এবং সর্বমূলের সেই অতি প্রাচীন কথা, দখলদারিত্ব, ইহাই তাহাদের শক্তি। এই ধরাধামে আসিবার পূর্বে স্বর্গ ও মর্ত্যের সংক্ষিপ্ত করিডরে দাড়াইয়া মৃত পূর্বপুরুষ উহাকে একখানা চেকবই দিয়া কহিয়াছিলেন, বাছা জগৎসংসারে হিসাব করিয়া চলিও, লোকসান করিওনা। সেই হইতে হিসাব করিতে করিতেই সে মোক্ষ লাভ করিতেছে, কোথাও কোনো ক্ষতি নাই।

আর একদল পুরুষ আছে, দেখিতে স্বপ্নের মত সুদর্শন। কৈশোরে লা প্লাতা উপসাগরের বেলাভূমিতে যাহার দেখা মিলিয়াছিল, এই সেই পুরুষ। সে মেনেলাউসের মত স্বর্ণকেশী, একিলিসের মত অভিমানী, হেক্টরের মত শক্তিমান, একলব্যের মত ত্যাগী, কৃষ্ণের মত বিচক্ষণ, অভিমন্যুর মত বালসুলভ। কাহার মত ধার্মিক, জানিতে চাহি না, কেননা যুধিষ্ঠিরে আমার প্রয়োজন নাই।

তবে আফসোস, এই শেষ গোত্রীয় পুরুষ পাখি হইয়া বৃক্ষশাখে বসে না। মাঝে মাঝে বইয়ের পৃষ্ঠা হইতে বাহির হইয়া আসে বটে, ইদানিং মুখপত্রিকায়ও দৃশ্যমান হয় শুনিয়াছি, অথবা সেলুলয়েডে। তবে সম্ভবত ইহারা ভগবানের সৃষ্টি নহে। ইহাও সঠিক যে, অন্যান্য তিন দলের পুরুষসমূহ মাঝে মাঝে ভেক ধরিয়া ইহাদের ন্যায় আবির্ভূত হইবার চেষ্টা করে, তবে বৃষ্টি নামিলে অচিরেই হাওয়ায় মিলাইয়া যায়।

তারপরও সেইসব মুর্খ ফুল্ল শিরিষ যার যার প্রাঙ্গনে অপেক্ষায় থাকে, বেলা অবেলায়। আমিও দেখি। প্রত্যহ সেই ফুল্ল শিরিষ প্রশ্ন শুধায় আমায় দেখি, এসেছে কি? এসেছে কি?

(নিবারণী চক্রবর্তীর “পুরিষ” নামক একখানি প্রাচীন, উপহাসমূলক রচনা হইতে। রচনার শিরোনামে কি বানান বিভ্রাট ঘটিয়াছে, নাকি ইচ্ছাকৃত শব্দচয়ন, জানা নাই- লেখিকা)

শাহনাজ গাজী: ফিলিপাইনে বাংলাদেশ দূতাবাসে কর্মরত জ্যেষ্ঠ কূটনীতিক।

আরও পড়ুন