আইনস্টাইনই ঠিক। শতবর্ষ আগে তার আপেক্ষিকতা তত্ত্বে ‘কৃষ্ণগহ্বরে যে মহাকর্ষীয় তরঙ্গের’ ধারণা দিয়েছিলেন- ‘স্থান-কালকে স্থানচ্যুত করা’ সেই তরঙ্গের অস্তিত্ব শনাক্ত করেছেন বিজ্ঞানীরা। বৃহস্পতিবার ওয়াশিংটনের এক সংবাদ সম্মেলনে সৃষ্টি রহস্যের এ নতুন তত্ত্ব ঘোষণা করেন বিজ্ঞানীরা।
আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতা তত্ত্ব নিয়ে ২০১৩ সালে প্রশ্ন তোলেন ইউরোপিয়ান সেন্টার ফর নিউক্লিয়ার রিসার্চের এক দল গবেষক। আইনস্টাইনের আপেক্ষিক তত্ত্বের মূল ভিত্তি হল ‘আলোর বেগ সর্বাবস্থায় ধ্র“ব’, অর্থাৎ জগতের ভরবাহী কোনো বস্তু আলোর গতিবেগ অতিক্রম করতে পারবে না। ইউরোপীয় গবেষকেরা জানান, শত বছরের এ ধারণা আসলে ভুল। আলোর গতি সর্বোচ্চ নয়। ফলে নতুন করে দেখা দেয় প্রশ্ন।
তারই ধারাবাহিকতায় একুশ শতকের পদার্থ বিজ্ঞান ঐতিহাসিক সত্যের মুখোমুখি হল। মহাবিশ্বকে নতুনভাবে আবিষ্কার করবেন বিজ্ঞানীরা।
১৪০০ কোটি বছর আগে এ ব্রহ্মাণ্ডের জন্মের সময়ে যে বিস্ফোরণ হয়েছিল, সেখান থেকে উৎপন্ন তরঙ্গকেই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ বলা হয়। গত সেপ্টেম্বর থেকে আমেরিকার ওয়াশিংটন স্টেটের হ্যানফোর্ড ও লুইজিয়ানার লিভিংস্টোনে, নির্ভুলভাবে মহাকর্ষীয় এ তরঙ্গের হদিস পেতে সর্বাধুনিক উপায়ে গবেষণা চলছে।
ব্যবহার করা হচ্ছে ‘লেসার ইন্টার ফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েভ অবজারভেটরি’র মতো দুটি অত্যাধুনিক সন্ধানী যন্ত্র বা ‘অ্যাডভান্সড লাইগোডিটেক্টর’। যা দেখতে ইংরেজির ‘খ’ অক্ষরের মতো। গত ক’মাস ধরেই শোনা যাচ্ছিল, এ প্রথম মহাকর্ষীয় তরঙ্গের সন্ধান পেয়েছে সেই অত্যাধুনিক যন্ত্রটি।
গবেষকরা বলছেন, সূর্যের থেকে প্রায় ৩০ গুণ ভারি দুটি কৃষ্ণ গহ্বরের ব্ল্যাক হোলের সংঘর্ষ থেকে উৎপন্ন এ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ (গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব) শনাক্ত করা হয়েছে। পৃথিবী থেকে ১ দশমিক ৩ বিলিয়ন আলোকবর্ষ দূরে ওই দুটি ব্ল্যাক হোল একে অন্যের চারপাশে চক্রাকারে ঘুরতে ঘুরতে একপর্যায়ে একসঙ্গে মিশে যায়। ক্যালিফোর্নিয়া ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি, ম্যাসাচুসেটস ইন্সটিটিউট অব টেকনোলজি এবং লেজার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব ওভজারভেটরির (এলআইজিও-লাইগো) গবেষকরা এ ঘোষণা দেন। আলোর মতো গ্র্যাভিটি বা মহাকর্ষ তরঙ্গের মাধ্যমে এক স্থান থেকে অন্যস্থানে ছড়িয়ে পড়ে। কিন্তু পার্থক্য, মহাকর্ষ বিকিরণ আকারে ছড়ায় না, বরং স্থান নিজেই এক্ষেত্রে তরঙ্গায়িত হয়। কোনো বালতির পানিতে হাত ডুবিয়ে তুললে পানির উপরিতলে যে মৃদু ঢেউ ধীরে ধীরে বালতির গোলাকার দেয়ালের দিকে ছড়িয়ে যায়, এই মহাকর্ষীয় তরঙ্গ স্থানের মধ্যে সেরকম মৃদু ঢেউ তৈরি করে তথা স্থানকে বাঁকিয়ে দেয়। জার্মান বিজ্ঞানী আইনস্টাইন ১৯১৫ সালে আপেক্ষিকতার সাধারণ তত্ত্বে এ ধারণা প্রকাশ করেন। এ মহাকর্ষীয় তরঙ্গ শনাক্তের জন্য বিজ্ঞানীরা লেসার রশ্মি ভ্রমণ করতে পারে এমন চার কিলোমিটার দীর্ঘ টানেল তৈরি করেন। লেসার ইন্টারফেরোমিটার গ্র্যাভিটেশনাল ওয়েব ওভজারভেটরির (এলআইজিও-লাইগো) নামে পরিচিত এই সিস্টেম একটি পরমাণুর ব্যাসের ১০ হাজার ভাগের এক ভাগ পর্যন্ত সূক্ষ্ম দৈর্ঘ্য পরিমাপ করতে পারে।


