বাংলাদেশের সবচেয়ে জনপ্রিয় ইংরেজি দৈনিক পত্রিকা ‘দ্য ডেইলি স্টার’-এর সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে সারাদেশে বুধবার পর্যন্ত ৬৯টি মানহানি ও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা হয়েছে। এক ঘটনায় নানা জায়গায় এতো মামলা করাটা হয়রানি ছাড়া আর কিছুই না বলে আইন বিশেষজ্ঞরা মন্তব্য করেছেন। এছাড়া বাংলাদেশে মত প্রকাশের স্বাধীনতা নিয়ে পশ্চিমাদের তথাকথিত যে শঙ্কা রয়েছে, এই ঘটনায় সেটাকে প্রতিষ্ঠিত করা হচ্ছে অজান্তেই।
গত ৯ দিনে মাহফুজ আনামের বিরুদ্ধে ঢাকাসহ সারাদেশে মোট মামলা হয়েছে ৬৯টি। এরমধ্যে ১৭ ফেব্রুয়ারি ১৩টি, ১৬ ফেব্রুয়ারি ২১টি, ১৫ ফেব্রুয়ারি ১৭টি, ১৪ ফেব্রুয়ারি ১৩টি, ১১ ফেব্রুয়ারি ৩টি ও ৯ ফেব্রুয়ারি ২টি মামলা হয়। সব মামলাই হয়েছে হাকিম আদালতে। প্রায় সব মামলার বাদীই ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এর অঙ্গ সহযোগী ও সমমনা সংগঠনের নেতা-কর্মী, আইনজীবী। মামলাগুলো আমলে নিয়ে এরই মধ্যে একাধিক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা এবং সমনও জারি করা হয়েছে।
উল্লেখ্য, সেনা নিয়ন্ত্রিত তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় দেশের শীর্ষ রাজনীতিকদের বিরুদ্ধে দুর্নীতির অসংখ্য মামলা হয়, বর্তমান প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা, সাবেক প্রধানমন্ত্রী খালেদা জিয়াসহ বহু রাজনীতিককে গ্রেফতার করে আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী। সে সময় প্রতিরক্ষা গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআই শেখ হাসিনার বিরুদ্ধে ‘দুর্নীতির খবর’ সরবরাহ করেছিল জানিয়ে গত ৬ ফেব্রুয়ারি এক টেলিভিশন আলোচনায় মাহফুজ আনাম বলেন, যাচাই না করে তা প্রকাশ করা ছিল ‘বিরাট ভুল’। তার ওই স্বীকারোক্তির পর আওয়ামী লীগের পাশাপাশি বিএনপি নেতারাও ডেইলি স্টার এবং পত্রিকাটির সম্পাদকের ওই ভূমিকার সমালোচনায় মুখর হন।
এমনকি এ ঘটনায় ডেইলি স্টার বন্ধের দাবি উঠেছে জাতীয় সংসদ থেকে। পাশাপাশি একই অপরাধে পত্রিকাটির সম্পাদক-প্রকাশক মাহফুজ আনামের পদত্যাগ, তার বিরুদ্ধে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলা দায়ের ও বিচারের মাধ্যমে তার শাস্তি নিশ্চিত করার দাবি করেছেন সংসদ সদস্যরা।
ফজলে নূর তাপস এমপি অবিলম্বে মাহফুজ আনামের পদত্যাগ এবং রাষ্ট্রদ্রোহের অভিযোগে গ্রেফতার করে তার বিচার দাবি করেন। তিনি বলেন, ‘ওয়ান-ইলেভেনের সময় মিথ্যা অপবাদ দিতে সাজানো গল্প ছাপানো ও মিথ্যা প্রচারণা চালানোর জন্য অবিলম্বে মাহফুজ আনামের পদত্যাগ এবং অনতিবিলম্বে পত্রিকাটি বন্ধের দাবি করছি।’
এরপর থেকে প্রতিদিনই তার বিরুদ্ধে সারাদেশের আদালতে মামলা হচ্ছে। গড়ে প্রতিদিন ৮-১০টি মামলা দায়ের অব্যাহত আছে তার বিরুদ্ধে। বুধবারও মামলা হয়েছে ১২টি।
মানহানি ও ক্ষতিপূরণের মামলাগুলো দণ্ডবিধির ৫০০/৫০১/৫০২ ধারায় এবং রাষ্ট্রদ্রোহের মামলা চূড়ান্তভাবে নেওয়ার জন্য স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনের অপেক্ষা করা হচ্ছে। স্বরাষ্ট্রমন্ত্রণালয় এখনও কোনও রাষ্ট্রদ্রোহ মামলার অনুমতি দেয়নি।
একই বিষয়ে এতো জায়গায় মামলা প্রসঙ্গে ব্যারিস্টার জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, বাংলাদেশের প্রচলিত আইন এবং সংবিধান অনুযায়ী কোনও ব্যক্তির বিরুদ্ধে একই অপরাধে একাধিক মামলা হতে পারে না। ৬০-৭০টি মামলা হয়রানি ছাড়া আর কিছু না। তাছাড়া যারা মামলা নিচ্ছেন, তারা কেনো একই ঘটনায় একাধিক মামলা নিচ্ছেন সেটাও বোধগম্য নয়।
মামলাগুলোয় কী ধরনের পরিণতি হতে পারে- এমন প্রশ্নে আইনজীবী শ. ম. রেজাউল করিম বলেন, এখনও আমি আবেদনের কোনও কপি দেখিনি। তবে রাষ্ট্রদ্রোহ মামলায় রাষ্ট্রযন্ত্রের সঙ্গে যারা জড়িত তাদের ইচ্ছা অনিচ্ছা ও মর্জির ওপর নির্ভর করে। যে কারণে খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে গ্রেফতারি পরোয়ানা জারি হওয়ার পরও সেটা কার্যকর হয় না।
মানহানি মামলা কেবল যার মানহানি হয় তিনিই করতে পারেন, নাকি যে কেউ করতে পারেন- এ প্রশ্নে অ্যাডভোকেট সাহেদুর রহমান বলেন, যে কেউ করতে পারেন, যদি তিনি দেখাতে পারেন যার মানহানি ঘটেছে তার সঙ্গে আবেদনকারী ব্যক্তির ইন্টারেস্ট আছে এবং তাকে সাক্ষী মেনে মামলা করা সম্ভব। কেবল যার মানহানি হলো তাকেই মামলা করতে হবে এমন না।
এ ধরনের মামলা রাষ্ট্রের ভাবমূর্তির জন্য সমস্যাজনক হতে পারে উল্লেখ করে জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য ড. আনোয়ার হোসেন বলেন, এটা অত্যন্ত বেদনার এবং একেবারেই অনভিপ্রেত বিষয় চলছে। মনে হচ্ছে মাহফুজ আনাম ভুলটা যে কোনওভাবে স্বীকার করেই যেন বিপদে পড়ে গেলেন। ভুল স্বীকার করে যে সমাজ সেটা উন্নত সমাজ। আমরা সেটাও বন্ধ করে দিচ্ছি।


