বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

বিএনপি নেতাদের পায়ে পিষ্ট শহীদ মিনারের ফুলবেদি

bnp--minner bediজাতীয় আন্দোলনের অন্যতম নিদর্শন বায়ান্নর ভাষা আন্দোলন। আর সেই ভাষার মর্যাদা রক্ষায়, মাতৃভার্ষার প্রতি সম্মান জানাতে এ জাতি বরাবরই স্মৃতির মিনারে সমর্পিত হয়। আর এবার এই আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসে বিএনপি নেতাদের পায়ে পিষ্ট হলো শহীদ মিনারের ফুলবেদি।

শনিবার রাতে একুশে ফ্রেব্রুয়ারি উপলক্ষে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনারে ফুল দিতে গিয়ে বিএনপির যে আচরণ তা নিশ্চয়ই দেশবাসীর চোখ এড়ায়নি।

শহীদ মিনারে ফুল দিতে রাত ১২টা ২০ মিনিটে গুলশান রাজনৈতিক কার্যালয় থেকে বের হয়েছিলেন বিএনপি চেয়ারপারসন বেগম খালেদা জিয়া। শহীদ মিনারে আসার পথে সুপ্রিম কোর্ট ও দোয়েল চত্বর মোড়ে দু’দফায় খালেদার গাড়িবহরে পুলিশ বাধা দেয় বলে দলটির অভিযোগ। তবে শেষ পর্যন্ত রাত ১টা ২৫ মিনিটে সিনিয়র নেতাদের সঙ্গে নিয়ে শহীদ মিনার প্রাঙ্গণে উপস্থিত হন বেগম জিয়া।

বেগম জিয়া শহীদ মিনারে পৌঁছানোর আগেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. আ আ ম স আরেফিন সিদ্দিকসহ বেশ কয়েকজন শিক্ষক তাকে এগিয়ে আনতে গেলে বিএনপির নেতাকর্মীরা তাদের ধাক্কা দিয়ে সরিয়ে দেয়। এসময় ঢাবির ক্রিমিনোলজি বিভাগের অধ্যাপক মো. জিয়াউর রহমান মাটিতে পড়ে যান। আর খালেদাসহ নেতাকর্মীরা শহীদ বেদির দিকে এগিয়ে আসেন।

তখন পর্যন্ত পরিস্থিতি স্বাভাবিকই ছিলো। বিএনপি চেয়ারপারসনের শ্রদ্ধা জানানোর স্থানও নির্ধারিত রেখেছিলো আয়োজকরা। কিন্তু নির্ধারিত স্থানে না গিয়ে শহীদ মিনারের মূল বেদির দিকে এগিয়ে যেতে চাইলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে স্বেচ্ছাসেবক দলের বাধার মুখে পড়েন বেগম জিয়াসহ বিএনপি নেতৃবৃন্দ।

তাতেও শৃঙ্খলা ভঙ্গ ততটা হয়নি, যতোটা হয়েছে বেগম জিয়ার চিফ সিকিউরিটি ফোর্সদের (সিএসএফ) নিয়ে। নিয়মানুযায়ী দেশের সেনাবাহিনীই শুধুমাত্র শহীদ মিনারে জুতো নিয়ে উঠতে পারে। কিন্তু যে শহীদেরা জীবনের বিনিময়ে তাদের রক্ত দিয়ে এই মিনার গড়ে দিয়ে গেছেন সেই শহীদ মিনারে তখন জুতো নিয়ে উঠতে দেখা যায় খালেদার সিএসএফদের। আর তখনই বিশৃঙ্খল পরিস্থিতির উদ্ভব ঘটে।

হাতাহাতি আর ধাক্কাধাক্কিতে এসময় রোভার স্কাউটের সদস্য মো. তানসির রাব্বি (বাঁধন), রিয়াজ ও জুবায়েরসহ বেশ কয়েক জন স্বেচ্ছাসেবক আহত হয়। তারচেয়েও ন্যক্কারজনক কাণ্ড ঘটায় বিএনপি নেতাকর্মীবৃন্দ। হাতাহাতির একপর্যায়ে তারা চড়াও হয়ে শহীদ মিনারে দাঁড়িয়ে জুতো ছোড়াছুড়ি করতে শুরু করে। এটি শুধু অন্যায় আচরণই ছিলো না, বরং শহীদদের প্রতি অসম্মান প্রদর্শনও।

বিএনপির চেয়ারপারসন ও নেতাকর্মীদের শহীদ বেদি থেকে নামাতে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, রোভার স্কাউট, বিএনসিসির সদস্যরা যখন গলদঘর্ম, ঠিক তখনই শহীদ মিনারের ডান পাশ দিয়ে বিশৃঙ্খলভাবে হঠাৎ করে দৌড়ে প্রবেশ করতে থাকেন বিএনপির কিছু নেতাকর্মী। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তখন ব্যারিকেড তৈরি করে আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী। মাইকে ঘোষণা আসে, ‘আপনারা শান্তভাবে ও সম্মানের সহিত শহীদ মিনারে শ্রদ্ধা নিবেদন করুন।’ কিন্তু বিএনপির নেতাকর্মীরা কারো কথায় কর্ণপাত করেননি।

এদিকে এ ঘটনার পর বিএনপির যুগ্ম মহাসচিব রুহল কবির রিজভী সরকারের ওপর দোষ চাপিয়ে দিয়ে বলেন, ‘সরকারের পরিকল্পিত পুলিশি বাধা অতিক্রম করে বায়ান্নর ভাষাশহীদদের প্রতি শ্রদ্ধা জানাতে আপোষহীন চিত্তে এগিয়ে গেছেন বেগম জিয়া। পুলিশের হামলায় আমাদের প্রায় অর্ধশতাধিক নেতাকর্মী আহত হয়েছেন।’

তবে বিএনপির এমন অস্বাভাবিক আচরণকে বিভিন্ন রাজনৈতিক দলসহ সুশীল সমাজের ব্যক্তিবর্গরা নেতিবাচক অর্থেই দেখছে। তাদের কারো কারো মতে, দলীয় স্বার্থের চেয়ে ভাষা আন্দোলন কিংবা শহীদ মিনারের মর্যাদা অনেক ঊর্ধ্বে।

আর তাই রিজভী, বেগম জিয়া কিংবা বিএনপির পক্ষ থেকে যাই বলা হোক না কেন- শহীদ মিনারে খালেদার সিএসএফদের জুতো নিয়ে উঠে পড়াকে কোনো বাঙালিই হয়তো স্বাভাবিকভাবে দেখতে পারছেন না। আর সেটা তো না পারাই কথা। যেখানে মাতৃভাষা রক্ষার আন্দোলনে তৎকালীন পাকিস্তানি স্বৈর শাসকদের বিরুদ্ধে লড়াই-সংগ্রাম করেছে পুরো জাতি, সেখানে ভাষা আন্দোলনের প্রতীক শহীদ মিনারে জুতো নিয়ে উঠে পড়াটা ভাষাশহীদদের প্রতি কতোটা অসম্মানজনক অশোভন আচরণ তা দেশের বৃহৎ রাজনৈতিক দল হিসেবে নিশ্চয়ই নজরে রাখবে বিএনপি।

আরও পড়ুন