বুধবার ৪ নভেম্বর ২০২৬

৫ জানুয়ারির সেই নির্বাচন বৈধ না অবৈধ?

MOHIBUL_Dabluমহিবুল ইজদানী খান ডাবলু, সুইডেন থেকে।

বাংলাদেশে ৫ জানুয়ারির নির্বাচন নিয়ে এখনো চলছে পক্ষ ও বিপক্ষের মধ্যে পাল্টাপাল্টি যুক্তি তর্ক। সরকার পক্ষ বলছে এ নির্বাচন গনতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন। অন্যদিকে বিএনপি জামায়াত জোট দাবি করছে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সম্পূর্ণ অবৈধ। বাংলাদেশের রাষ্ট্রপতি তার ভাষনেও বলেছেন ৫ জানুয়ারির নির্বাচন সঠিক হওয়ার কথা। তবে নিরপেক্ষভাবে বিবেচনা করলে দেখা যায় যে দুইপক্ষের বক্তব্যের মধ্যেই কিছু ভুল রয়েছে। অর্থাত সরকার কিংবা বিরোধী দল কাউকেই সম্পূর্ণ সঠিক বলা ঠিক হবে না। ৫ জানুয়ারির নির্বাচন গনতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন একথাটা একেবারেই বাস্তব সত্য। এ নিয়ে দুই পক্ষের মধ্যে দ্বিমত পোষণ করার কোনো যুক্তিকতা নেই। তাহলে বিরোধী পক্ষ থেকে যে অবৈধ নির্বাচনের দাবি করা হচ্ছে সেটাকে আমরা কিভাবে দেখতে পারি। সরকার পক্ষ যে কারণ দেখিয়ে নির্বাচনের বৈধতা নিতে চাচ্ছে বিরোধী পক্ষ ঠিক তার উল্টো কারণ দেখিয়ে তার বিরোধিতা করছে। বিএনপি জামায়াত জোটের এই বিরোধিতা তাহলে কতটুকু  গ্রহণযোগ্য হতে পারে? কিংবা সরকার কর্তৃক  নির্বাচন বৈধতার প্রশ্ন কতটুকু যুক্তিসঙ্গত?

পর্যবেক্ষক মহলের দৃষ্টিতে ৫ জানুয়ারী যে নির্বাচন হয়েছে তাকে একটি সঠিক নির্বাচন বলা যেতে পারে না।  ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সফলভাবে সম্পন্ন হয়েছে একথাও ঠিক নয়। একটি দেশের জাতীয় নির্বাচন যেভাবে হওয়ার কথা সেভাবে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন হয়নি। এই চির সত্যকে সরকার পক্ষকে মেনে নিতেই হবে। সেদিনের সেই নির্বাচনে যারা এম পি হওয়ার সুযোগ পেয়েছেন তাদের অনেকেরই নির্বাচন সঠিকভাবে অনুষ্ঠিত হলে জামানত হারাতে হতো বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। এধরনের একটি নির্বাচন হওয়ার কারণেই তারা আজ এম পি হওয়ার সাধ গ্রহণ করছেন। তাদের এই সুযোগের কথা নিশ্চই প্রধানমন্ত্রী নিজেও ভালো করে জানেন এবং বুঝেন। আজকের সংসদের অনেক এমপিরা এমপি হতে পারতেন না যদি অন্যান্য বিরোধী দল নির্বাচনে অংশগ্রহন করতো। অনেকে বলেন এসকল কিছু কিছু এমপিদের কারণেই দেশে আজ সরকারকে বিভিন্ন সময় বেকায়দায় পড়তে হচ্ছে। শুধু এমপি কেন এমনকি বর্তমান সরকারে কয়েকজন মন্ত্রীও আছেন যাদের নির্বাচনে জয়ী হওয়ার বেপারে প্রশ্ন আসার যথেষ্ট কারণ রয়েছে। এই কারণেই বিরোধী পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে এই সংসদ অবৈধ, এই সরকার অবৈধ। বিরোধী পক্ষের এই দাবি কি তাহলে সঠিক? ঠিকমত নির্বাচন হলে কি এসকল এমপিরা কখনো জয়ী হতে পারতেন? অবশ্যই না। সুতরাং ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের বৈধতা নিয়ে সরকার যত কথায় বলুক না কেন দেশের সাধারণ মানুষ এই নির্বাচনকে কখনই সঠিক নির্বাচন বলবে না। কারণ এই নির্বাচন নির্বাচনের মত হয়নি। এ নির্বাচনে কোনো প্রতিদন্দিতা ছিল না। হয়েছে শুধু এক পক্ষের নির্বাচন।

এখন স্বাভাবিক ভাবেই প্রশ্ন আসতে পারে যে সকল কারণে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনের বৈধতা দিতে বিরোধী দলগুলো আপত্বি করছে তাদের এই দাবি কি যুক্তিসঙ্গত? নির্বাচনের মত নির্বাচন না হওয়ার জন্য তাহলে দায়ী কে? ৫ জানুয়ারির নির্বাচন বিমুখ পরিস্থিতি কে সৃষ্টি করেছিল? কেন হতে পারেনি সেদিন সঠিক নির্বাচন? এপ্রসঙ্গে বার বার শুধু একটা নামই সামনে আসবে আর তা হলো বিএনপি জামায়াত জোট। তাদের কারণেই সেদিন বাংলাদেশে সঠিক নির্বাচন হতে পারেনি বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। ২০১৪ সালের ৫ জানুয়ারীর পূর্বে বিএনপি জামায়াত জোটের নেতৃত্বে ঘটে যাওয়া সেই ভয়াল, বীভৎস ও ভয়ঙ্কর দৃশ্যের কথা কি দেশের মানুষ কখনো ভুলতে পারবে? গণতন্ত্রের নামে নির্বাচন বানচালের লক্ষে সেদিন বিএনপি জামায়াত জোটের সকল অগণতান্ত্রিক ত্রাসের রাজত্ব বাংলাদেশের রাজনীতির ইতিহাসে আর কখনো ঘটেনি। নির্বাচন ও সাথে দেশকে ধংশ করার জন্য যা কিছু দরকার সবই করেছে বিএনপি জামায়াত জোট। তাদের এই মারানাত্বক কার্যকলাপ বাংলাদেশের ইতিহাসে চিরদিন কলংক হয়ে থাকবে।

সেদিন বিএনপি জামায়াত জোটের আগুন সন্ত্রাসের লেলিহান শিখায় সারা দেশ দাউ দাউ করে জ্বলে উঠেছিল। এভাবেই গণতান্ত্রিক অধিকারের নামে তারা সৃষ্টি করে এক দুঃসহ যন্ত্রণার ইতিহাস। ৫ জানুয়ারী বাংলাদেশের মানুষের স্মৃতির মধ্যে এক দুঃসহ যন্ত্রণা চিরদিন স্মরণীয় থাকবে। সহিংস রাজনীতির ধারক বাহক বিএনপি জামায়াত জোটের সেই ভয়ংকর রূপের কথা জনগণ কখনই ভুলতে পারবে না। তাদের এই জালাও পড়াও সন্ত্রাসীর কারণেই মূলত ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সঠিকভাবে হতে পারেনি বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। যেভাবে নির্বাচন হওয়ার কথা সেভাবে নির্বাচন যাতে না হতে পারে তার জন্য সব ধরনের পন্থা বিএনপি জামায়াত জোট অবলম্বন করেছিল। জনগণ সেদিন তাদের ভয়ে ভোট কেন্দ্রে যেতে সাহস করেনি। অনেক স্থানে ভোট কেন্দ্রের আসে পাশে বোমা ফাটিয়ে আতংক পর্যন্ত সৃষ্টি করা হয়েছিল। এই কারণেই ভোট অংশগ্রহনে স্বত স্ফুর্তভাবে ভোটাররা অংশগ্রহন করতে পারেনি। দেশের এই পরিস্থিতিকে রাজনৈতিকভাবে কাজে লাগিয়ে বিএনপি জামায়াত জোট এখন বলতে চায় এই নির্বাচন অবৈধ, এই সরকার অবৈধ।

এদিকে নির্বাচন বানচালের শেষ চেষ্টা করা সত্বেও দেশের অনেকে ভোটে অংশগ্রহন করেছেন। জীবনের ঝুকি নিয়ে ভোট প্রধান করেছেন। তবে একথা সত্য যে ভোট অংশগ্রহনের সংখা ততটা বেশি ছিল না। শুধুমাত্র এই কারণেই বলা যেতে পারে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সঠিক ভাবে হয়নি। অর্থাত নির্বাচনের মতো নির্বাচন সেদিন হয়নি। তবে জামায়াতকে রক্ষা করা থেকে বিরত থেকে বিএনপি যদি সেদিন এই সহিংসতা ছেড়ে দিয়ে নির্বাচনে অংশগ্রহন করতো তাহলে তাদের অবস্থা আজকের মত হতনা। অন্তত জয়ী হয়ে ক্ষমতায় যেতে না পারলেও সংসদে তাদের শক্ত অবস্থানে থাকার একটা বড় সুযোগ ছিল বলে পর্যবেক্ষকমহল মনে করেন। ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে অংশগ্রহন না করে বিএনপি জামায়াতকে সাথে নিয়ে যে ধংসাত্বক পন্থা অবলম্বন করেছিল জনগণ তাতে সমর্থন দেয়নি। ঘরে বসে থেকে তারা বিএনপি জামায়াতের এধরনের ধংসাত্বক কার্যকলাপের বিরোধিতা করেছে, নিন্দা করেছে। বিএনপি জামায়াত মনে করেছিল নির্বাচন বানচাল করতে পারলে আওয়ামী লীগ সরকার বিশ্বের সমর্থন হারাবে। তাদের অপপ্রচারে বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সহযোগিতায় এগিয়ে আসবে এবং শেখ হাসিনার সরকারের সাথে সকল সম্পর্ক ছিন্ন করবে। কিন্তু বাস্তবে তা হয়নি। তাই এখন দলের ভেতর থেকেই কথা আসছে ৫ জানুয়ারির নির্বাচনে বিএনপি অংশগ্রহন না করে জামায়াতকে সাথে নিয়ে এধরনের ধংসাত্মক কার্যকলাপ করে ভুল করেছে। এখন তাদের সংসদের ভেতর ও বাহিরে কথাও কোনো রাজনৈতিক কর্মসূচি নেই। জামায়াতকে রক্ষা করতে গিয়ে বিএনপি এখন নিজেই বিলীন হতে চলছে।

বিএনপি নেত্রী বেগম খালেদা জিয়া এখন বলছেন ৫ জানুয়ারীর নির্বাচনে ১৫৪ এমপি বিনা ভোটে নির্বাচিত হয়েছে। ভোট ছাড়া নির্বাচিত এমপিদের কীভাবে জনপ্রতিনিধি বলা যায়? তাই এই সরকার অবৈধ, এই সংসদও অবৈধ। কথাটা আংশিক সত্য হলেও এর গ্রহণযোগ্যতা আছে বলে পর্যবেক্ষক মহল মনে করেন না। কারণ নির্বাচনের পূর্বে নির্বাচন বিমুখী পরিবেশ সৃষ্টি করার জন্য তো তিনি নিজেই দায়ী। তিনি কেন সেদিন নির্বাচনে অংশগ্রহন না করে জামায়াতকে সাথে নিয়ে এমন ধ্বশাত্মক কাজে নেমেছিলেন? তিনি কেন সেদিন ভোটারদের মাঝে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছিলেন? তিনি কেন সেদিন সহিংসতার পথ বেছে নিয়েছিলেন? বাংলাদেশে সেদিন নির্বাচনের মত নির্বাচন না হওয়ার জন্য কি দেশের মানুষ  বেগম খালেদা জিয়াকে দায়ী করতে পারে না? তিনি কি এই দায় নিতে অস্বিকার করতে পারবেন? এছাড়া বর্তমান নির্বাচন কমিশনকে তিনি মেরুদণ্ডহীন বলেও মন্তব্য করেছেন। এই মেরুদণ্ডহীন নির্বাচন কমিশন দিয়ে নাকি কোনো নিরপেক্ষ নির্বাচন করা সম্ভব নয়। যদি তাই হয়ে থাকে তাহলে বিএনপি কেন মেয়র ইলেকশনে অংশগ্রহন করলো? এখন কেন বিএনপি আবার পৌর নির্বাচনে অংশগ্রহন করছে? নির্বাচন কমিশনে তো কোনো পরিবর্তন আনা হয়নি। সেই একই নির্বাচন কমিশন এখনো বহাল। শেষ পর্যন্ত এই নির্বাচন কমিশনের অধীনে নির্বাচনে যখন গেলেনই তাহলে কেন এই সহিংস রাজনৈতিক খেলা বেগম খালেদা জিয়া সেদিন খেলেছিলেন? সেদিন খালেদা জিয়ার এই সহিংসতায় যাদের জীবন গিয়েছে তাদের আত্মা হয়তো আজ বলছে, হায়রে মেডাম, নির্বাচনই যদি করবেন তাহলে কেন সেদিন আমাদের সহিংসতায় বেবহার করলেন?

পরিশেষে বলা যেতে পারে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন ছিল গনতন্ত্র ও শাসনতন্ত্র রক্ষার নির্বাচন। শত প্রতিবন্ধকতা আসা সত্তেও নির্বাচন কমিশন সেদিন নির্বাচন সম্পন্ন করতে বাধ্য ছিল। সুতরাং এই নির্বাচন কখনো অবৈধ নির্বাচন ছিল না। এই কারণে  বর্তমান সরকারকেও কখনো অবৈধ সরকার বলা ঠিক হবে না। নির্বাচন ও বাংলাদেশের বর্তমান  সরকার যদি অবৈধ হতো তাহলে আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশ বাংলাদেশ সরকারের সাথে পারস্পরিক সহযোগিতা ও বানিজ্যিক সম্পর্ক বজায় রাখতো না। বিশ্ব জানে ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন সেদিন কি কারণে সঠিকভাবে সম্পন্ন হয়নি। বিশ্ব জানে জামায়াতকে নিয়ে বিএনপির সেই সহিংসতার কথা। বিশ্ব জানে নির্বাচন বানচাল করার জন্য বেগম খালেদা জিয়ার নেতৃত্বে সেদিন কিভাবে ধংসাত্মক কাজ পরিচালনা করা হয়েছিল। এখানেই রাজনীতিতে বিএনপির পরাজয় হয়েছে। জামায়াতকে রক্ষা করতে গিয়ে এখন বিএনপি যায় যায় অবস্থায় এসে দাড়িয়েছে। সুতরাং ৫ জানুয়ারির নির্বাচন যেমন সারা বিশ্বে পেয়েছে বৈধতা তেমনি প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার সরকারও পেয়েছে গ্রহণযোগ্যতা। এখন ৫ জানুয়ারীর নির্বাচন নিয়ে আর চিত্কার না করে বিএনপির দৃষ্টি দেওয়া  উচিত ২০১৯ নির্বাচনের দিকে।

লেখক: সুইডিশ লেফট পার্টি স্টকহলম হেসেলবি-ভেলেংবি ব্রাঞ্চের সভাপতি

আরও পড়ুন