বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

১/১১ কুশীলবদের বিচারের দাবি তীব্রতর হচ্ছে

one-eleven_jugantor_5595এক-এগারোর কুশীলবদের চিহ্নিত করা এবং তাদের বিচারের দাবি ক্রমেই তীব্রতর হচ্ছে। ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, এর শরিক দলের নেতা, অন্যান্য রাজনৈতিক দল এমনকি সুশীল সমাজের অনেকের পক্ষ থেকেও এ দাবি তোলা হচ্ছে।

তবে অনেকেই বলছেন, শুধু বক্তৃতা দিয়ে ও তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়ে শাসক দলের নেতারা দায় এড়াতে পারবেন না। যেহেতু তারা সরকারে আছেন তাই তদন্ত কমিশন গঠনের উদ্যোগ তাদেরই নিতে হবে।

আর এ ধরনের কমিটি গঠন করতে চাইলে যে কোনো দিন করা সম্ভব। শুধু প্রয়োজন দ্রুত সিদ্ধান্ত গ্রহণ। তারা মনে করেন, ষড়যন্ত্রকারী কুশীলবদের চিহ্নিত করা ও বিচারের ক্ষেত্রে দ্রুত সিদ্ধান্ত নিয়ে সরকারকেই তার আন্তরিকতা প্রমাণ করতে হবে। আর তা না করে শুধু এভাবে বক্তৃতা দিতে থাকলে জনগণের কাছে ভিন্ন বার্তা যাবে।

শুক্রবার আওয়ামী লীগের স্থানীয় সরকারবিষয়ক মনোনয়ন বোর্ডের বৈঠকে এক-এগারোর দুই কুশীলবের কথা আলোচনায় উঠে আসে। এক-এগারো সরকারের উপদেষ্টা ব্যারিস্টার মইনুল হোসেন এবং ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনামের বিভিন্ন ভূমিকা নিয়ে বৈঠকে আলোচনা হয়।

এছাড়া রোববার সংসদে এক-এগারোর কুশীলবদের বিচার ও সব ঘটনা উন্মোচনে তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম, ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেননসহ কয়েকজন সংসদ সদস্য।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে মোহাম্মদ নাসিম সোমবার , ‘এক-এগারোর কুচক্রীদের বিচার হওয়া দরকার। ওই সময়ে কার কি ভূমিকা ছিল সেটাও সবার জানা উচিত। আর তারা দেশকে নিয়ে যে বিরাজনীতিকরণের ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিলেন সেটার জন্যও তাদের শাস্তি হওয়া দরকার। এজন্যই তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানিয়েছি। প্রয়োজনে দলের ভেতরেও আলোচনা করব।’ সরকারে থেকে কার কাছে এমন দাবি করছেন এমন প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘আমি একাই সরকার না, সবাই মিলেই সরকার। আগে দাবিটা উত্থাপিত হতে হবে। আমি সেটাই করেছি।’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য ওয়ান-ইলেভেনের সময় নির্যাতিত নেতা ড. খন্দকার মোশাররফ হোসেন , ওয়ান-ইলেভেনের ষড়যন্ত্রের সঙ্গে যারা সরাসরি জড়িত ছিলেন তাদের অবশ্যই বিচার করতে হবে। ওইসব কুশীলবদের আগে বিচার করে তারপর সাংবাদিকসহ অন্য কেউ জড়িত থাকলে তাদের বিচার করা যায়। তিনি বলেন, ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবরা কে কি করছেন এটার প্রমাণ আছে। এজন্য কমিশন গঠনের প্রয়োজন নেই। যারা বিদেশে পালিয়ে গেছেন তাদের দেশে ফিরিয়ে এনে বিচারের উদ্যোগ নিলেই হয়।

ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের বিচার নিয়ে সরকারের আন্তরিকতার অভাব রয়েছে দাবি করে বিএনপির এ সিনিয়র নেতা আরও বলেন, ২০০৮ সালে ক্ষমতায় আসার পর আওয়ামী লীগের কিছু নেতা কুশীলবদের বিচারের দাবিতে সংসদে সোচ্চার হন। কিন্তু অজ্ঞাত কারণে কিছুদিন পর ওইসব বক্তব্য দেয়া বন্ধ হয়ে যায়। দীর্ঘ ৭ বছর সরকার কোনো ব্যবস্থা নেয়নি। কিন্তু হঠাৎ ওয়ান-ইলেভেনের কুশীলবদের নিয়ে তাদের আবার সোচ্চার হওয়ার পেছনে কোনো দুরভিসন্ধি কিংবা অন্য কোনো এজেন্ডা রয়েছে। তবে তিনি মনে করেন, কুশীলবদের বিচারে সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে।

এ প্রসঙ্গে বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টির (সিপিবি) সভাপতি মুজাহিদুল ইসলাম সেলিম , এক-এগারোর সময় কি কি ঘটেছিল তা সবার জানা দরকার। কারা নেপথ্য ভূমিকা পালন করেছিল, কারা দেশকে বিরাজনীতিকরণ করতে চেয়েছিলেন এসব উন্মুক্ত হওয়া দরকার। রাষ্ট্রের সঙ্গে এত বড় অপরাধের অবশ্যই বিচার হতে হবে। সেজন্য একটি তদন্ত কমিশন গঠন করতে হবে। আর তা হতে হবে নিরপেক্ষ। প্রশাসন বাদ দিয়ে বিশ্বাসযোগ্য কেউ বা বিশিষ্ট কোনো নাগরিকের নেতৃত্বে তদন্ত কমিশন হলে ভালো হবে।

আর এজন্য সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে উল্লেখ করে সেলিম বলেন, আওয়ামী লীগ নেতারা এ নিয়ে প্রকাশ্যে বক্তৃতা-বিবৃতি দিচ্ছেন। এখন একটি তদন্ত কমিশন গঠন করে তাদের এ বিষয়ে আন্তরিকতার প্রমাণ দিতে হবে। কেননা কোনো উদ্যোগ না নিলে জনগণ এটাকে ফাঁকা বুলি মনে করবেন।

ক্ষমতাসীন ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি ও বিমানমন্ত্রী রাশেদ খান মেনন , অবশ্যই এক-এগারোর ঘটনার বিচার হতে হবে। জাতির জানতে হবে, সে সময়ে কি হয়েছিল, কারা এ ষড়যন্ত্র করে দেশকে বিরাজনীতিকরণ করার ষড়যন্ত্রে মেতে উঠেছিলেন। তিনি রোববার সংসদে এবং আগেও এ নিয়ে দাবি তুলেছেন উল্লেখ করে বলেন, আশা করি, প্রধানমন্ত্রী এ বিষয়ে ইতিবাচক উদ্যোগ নেবেন। প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে ব্যক্তিগতভাবেও এক-এগারোর কুশীলবদের বিচারের দাবিতে তিনি আলাপ করবেন বলে যুগান্তরকে জানান। এক প্রশ্নের জবাবে মেনন বলেন, অবশ্যই সরকারকেই উদ্যোগ নিতে হবে, আর সে দাবি জানাতেই তিনি প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথা বলবেন।

ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ শুক্রবারের বৈঠকে দুই কুশীলবের ভূমিকা নিয়ে আলোচনা হওয়ার কথা যুগান্তরের কাছে স্বীকার করেন। তিনি বলেন, মইনুল হোসেনের টকশোর একটি বক্তব্যকে ঘিরে এ আলোচনার সূত্রপাত হয়। তখন তার এবং মাহফুজ আনামের ভূমিকা কী ছিল তা নিয়ে বোর্ডের সদস্যরা তাদের বক্তব্য তুলে ধরেন। তবে সেখানে সবাই ক্ষোভ প্রকাশ করলেও বিচারের উদ্যোগ নিয়ে কোনো কথা হয়নি বলে উল্লেখ করেন।

সরকার বিচারের উদ্যোগ নেবে কিনা জানতে চাইলে তিনি বলেন, দেশে আইন-আদালত আছে, দেখি আদালত কি করেন?

রোববার জাতীয় সংসদে এক-এগারোর ঘটনার তদন্তে কমিশন গঠনের আহ্বান জানান সরকারের দুই মন্ত্রী ও কয়েকজন সংসদ সদস্য। সংসদে ওয়ার্কার্স পার্টির সভাপতি রাশেদ খান মেনন এক-এগারোর সব ঘটনা উন্মোচন করা এবং দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার জন্য সুপ্রিমকোর্টের একজন অবসরপ্রাপ্ত বিচারপতিকে দিয়ে তদন্ত কমিশন গঠনের দাবি জানান।

এ প্রসঙ্গে তিনি ২০০৮ সালের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আন্দোলন নিয়ে শিক্ষা মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটির সভাপতি হিসেবে করা তদন্ত ও সুপারিশের কথা উল্লেখ করেন। তিনি বলেন, ওই ঘটনায় এক-এগারোর কুশীলবদের সম্পৃক্ততা পেয়েছিলেন এবং তাদের শাস্তির সুপারিশ করেছিলেন, কিন্তু সেটা বাস্তবায়িত হয়নি।

আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিম বলেন, এক-এগারোয় কার কি ভূমিকা ছিল সেটা বের করতে একটা তদন্ত কমিশন হওয়া উচিত। তিনি এক-এগারোর অন্যতম কুশীলব হিসেবে ডেইলি স্টার সম্পাদক মাহফুজ আনাম এবং ড. ইউনূসের বিচার দাবি করেন।

আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও সংসদ সদস্য আ ফ ম বাহাউদ্দিন নাছিম তদন্তের মাধ্যমে এক-এগারোর নেপথ্যে ভূমিকা পালনকারীদের চিহ্নিত করার দাবি জানান। ড. ইউনূস, মাহফুজ আনাম এবং মইনুল হোসেনের নাম উল্লেখ করে নাছিম এদের বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান।

অবশ্য এ প্রসঙ্গের প্রথম অবতারণা করেন প্রয়াত আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল জলিল। ২০০৯ সালের ২৯ জানুয়ারি জাতীয় সংসদে রাষ্ট্রপতির ধন্যবাদ প্রস্তাবের ওপর আলোচনায় অংশ নিয়ে তিনি এক-এগারোর কুশীলবদের বিচার দাবি করেন। সামরিক গোয়েন্দা সংস্থা ডিজিএফআইয়ের কাজ নির্দিষ্ট করা এবং এক-এগারোর সময় ওই সংস্থা দ্বারা তাকে নির্যাতনের বিচার দাবি করেন তিনি।

এ লক্ষ্যে একটি সংসদীয় তদন্ত কমিটি করার আহ্বান জানিয়ে তিনি বলেন, ডিজিএফআই সে সময়ে রাজনীতিবিদদের চরিত্র হরণ করাসহ সম্মান নষ্ট এবং তাদের ওপর অমানুষিক অত্যাচার করেছিল। তার বক্তব্যের ধারাবাহিকতায় আওয়ামী লীগের তৎকালীন প্রেসিডিয়াম সদস্য ড. মহীউদ্দীন খান আলমগীরও ডিজিএফআইয়ের বিচার দাবি করে একটি তদন্ত কমিশন গঠনের আহ্বান জানিয়েছিলেন।

এদিকে ২২ ফেব্রুয়ারি আওয়ামী লীগ আয়োজিত ভাষা দিবসের আলোচনা সভায় প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এক-এগারোর সময় তাকে নির্জন কারাগারে রাখা এবং তার সঙ্গে অন্যায়-অনাচারের চিত্র তুলে ধরে বক্তব্য দেন। এরপর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য মোহাম্মদ নাসিম, যুগ্ম সম্পাদক মাহবুবউল আলম হানিফ, প্রচার সম্পাদক ড. হাছান মাহমুদ বিভিন্ন অনুষ্ঠানে এক-এগারো কুশীলবদের বিচার চেয়ে একাধিকবার বক্তব্য দেন।

এদিকে রোববার শেরপুর জেলা জাতীয় পার্টির সম্মেলনে দলটির চেয়ারম্যান হুসেইন মুহম্মদ এরশাদও এক-এগারোর কুশীলবদের বিচার দাবি করেন।

আরও পড়ুন