‘মাননীয় আদালত, আমি আমার স্বামীর হত্যাকারীদের বিচার চাই। ন্যায়বিচার চাই। সর্বোচ্চ সাজা চাই। যারা আমাকে বিধবা করেছে, আমার সন্তানদের পিতৃহারা করেছে এবং সাতটি পরিবারকে শেষ করে দিয়েছে, তাদের সর্বোচ্চ শাস্তি চাই। আমার স্বামী ছিল বঙ্গবন্ধুর আদর্শের সৈনিক এবং একজন কেন্দ্রীয় নেতা (যুবলীগের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য)।’ সাত খুনের মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার সকালে নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতে সাক্ষ্য দিতে গিয়ে এসব কথা বলেন নিহত কাউন্সিলর নজরুল ইসলামের স্ত্রী সেলিনা ইসলাম বিউটি। আবেগঘন বক্তব্য রেখে তিনি কান্নায় ভেঙে পড়েন।
নারায়ণগঞ্জের জেলা ও দায়রা জজ আদালতের বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেনের আদালতে গতকাল সকাল সাড়ে ১০টার দিকে সাক্ষ্য গ্রহণ শুরু হয়। এর পর আসামিপক্ষের আইনজীবীরা সেলিনা ইসলাম বিউটিকে জেরা করেন। গতকাল ৩২ আসামির পক্ষ থেকে তাকে জেরা করা হয়েছে। বাকি তিন গুরুত্বপূর্ণ আসামি র্যাব-১১-এর সাবেক অধিনায়ক তারেক সাঈদ মোহাম্মদ, সাবেক উপ-অধিনায়ক এম এম রানা ও নূর হোসেনের পক্ষে তাকে জেরা করার জন্য ১০ মার্চ দিন ধার্য করা হয়েছে। এর আগে ৭ মার্চ আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করবেন সাত খুন মামলার অন্যতম বাদী নিহত আইনজীবী চন্দন সরকারের মেয়ের জামাই ডা. বিজয় কুমার পালকে।
সাংবাদিকদের উপস্থিতিতে সাক্ষ্য-জেরা :সাত খুন মামলায় গতকাল বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের .উপস্থিতিতে সাক্ষ্য-জেরা করা হয়েছে। এ সময় মামলার প্রধান আসামি নূর হোসেনসহ কারাগারে
আটক ২৩ আসামি আদালতে উপস্থিত ছিলেন। আদালতে সাংবাদিকদের জন্য আলাদা বসার ব্যবস্থা ছিল। গত সোমবার এ মামলায় সাক্ষ্য গ্রহণ শুরুর আগে আসামিপক্ষের আইনজীবীদের সঙ্গে একজোট হয়ে সরকারি কেঁৗসুলি (পিপি) সাংবাদিকদের আদালত কক্ষ থেকে বের করে দেন। তবে গতকাল আদালত কক্ষের সামনে সাদা কাগজে লেখা ছিল, ‘আদালত কক্ষে ক্যামেরা ও মোবাইল ফোনসেট ব্যবহার নিষেধ।’
সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবির আবেদন খারিজ :গতকালও সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবি রাখতে আসামিপক্ষের আবেদন খারিজ করে দেন বিচারক সৈয়দ এনায়েত হোসেন। তারেক সাঈদ মোহাম্মদের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সুলতান-উজ জামান বলেন, ‘এ মামলার চার্জ গঠনের বিরুদ্ধে উচ্চ আদালতে একটি পিটিশন করা হয়েছে। পিটিশনটি উচ্চ আদালতের ৩৪২ কার্যতালিকায় রয়েছে। যে কোনো সময় সেটির শুনানি হবে।’ সে পর্যন্ত মামলার সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবি রাখার আবেদন করা হয় আদালতে। তবে উচ্চ আদালত থেকে এ-সংক্রান্ত কোনো কাগজপত্র না আসায় আদালত আবেদনটি খারিজ করে দিয়ে সাক্ষ্য গ্রহণের নির্দেশ দেন।’
বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট সাখাওয়াত হোসেন বলেন, ‘সাক্ষ্য গ্রহণ মুলতবি রাখতে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা আবেদন করলে আদালত তা নাকচ করেন।’
বিউটির সাক্ষ্য :সেলিনা হোসেন বিউটি সাক্ষ্যে জানান, তার স্বামী নজরুল ইসলাম নারায়ণগঞ্জ সিটি করপোরেশনের প্যানেল মেয়র এবং ২ নম্বর ওয়ার্ডের কাউন্সিলর ছিলেন। নূর হোসেনের আতঙ্কে নজরুল ঢাকা গিয়ে থাকতেন। ঘটনার দিন ২০১৪ সালের ২৭ এপ্রিল সকাল ১০টার দিকে তার স্বামী ও চার সহযোগী তাজুল ইসলাম, লিটন, স্বপন জামিন নিতে নারায়ণগঞ্জ আদালতে যান। ওই দিন দুপুর পৌনে ২টার দিকে নজরুলের মোবাইল ফোনে যোগাযোগ করা হলে তিনি ফোন বন্ধ পান। পরে জানতে পারেন, খানসাহেব ওসমান আলী স্টেডিয়ামের সামনে থেকে দুটি হাইয়েস মাইক্রোবাসে করে আসা ১৫-২০ দুর্বৃত্ত র্যাব পরিচয় দিয়ে তার স্বামী ও অন্য সহযোগীদের অস্ত্রের মুখে তুলে নিয়ে যায়। বিউটির সঙ্গে তার স্বামীর সর্বশেষ কথা হয় ওই দিন দুপুর দেড়টার দিকে। বিউটি স্বামীর মোবাইল ফোন বন্ধ পাওয়ার বিষয়টি তার দেবর আবদুস সালামকে জানান। এর পর তা নারায়ণগঞ্জ পুলিশ সুপার এবং র্যাব-১১-এর কর্মকর্তাদের জানানো হয়। ২৮ এপ্রিল রাতে বিউটি ফতুল্লা মডেল থানায় নূর হোসেন, ইয়াছিন মিয়া, আমিনুল ইসলাম রাজু, আনোয়ার হোসেন, ইকবাল হোসেন, শাহজালাল বাদল, হাসমত আলী হাসুসহ অজ্ঞাত আরও কয়েকজনের বিরুদ্ধে মামলা করেন। ৩০ এপ্রিল টিভি চ্যানেলের মাধ্যমে তিনি জানতে পারেন, শীতলক্ষ্যা নদীর শেষ মোহনায় বন্দর থানার শান্তির চরে সাতজনের লাশ ভেসে উঠেছে। পরে তারা সেখানে গিয়ে লাশ শনাক্ত করেন। তিনি দাবি করেন, নূর হোসেনের সহযোগিতায় র্যাব সদস্যরা এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছেন। একপর্যায়ে নূর হোসেনের আইনজীবী নারায়ণগঞ্জ জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অ্যাডভোকেট খোকন সাহাকে ইঙ্গিত করে বিউটি বলেন, ‘আপনি কীভাবে খুনির পক্ষে গেলেন? আপনি তো আমাকে আইনি সহায়তা দেবেন!’
আসামিপক্ষের আইনজীবীদের জেরা :সাক্ষ্য শেষে বিউটিকে আসামিপক্ষের আইনজীবীরা জেরা করেন। এ সময় ৩২ আসামির মধ্যে ২০ জন আদালতে উপস্থিত ছিলেন। র্যাবের সাবেক কর্মকর্তা আরিফ হোসেনের পক্ষে জেরা করে অ্যাডভোকেট আবদুর রশিদ ভূঁইয়া। তিনি বিউটির কাছে জানতে চান, ‘নজরুল ইসলামের বিরুদ্ধে ধানমণ্ডি থানায় অ্যাডভোকেট বাবর হত্যা মামলা ছিল। ওই মামলায় তিনি মৃত্যুদণ্ডাদেশপ্রাপ্ত আসামি ছিলেন?’ উত্তরে বিউটি বলেন, ‘পরে উচ্চ আদালত থেকে তিনি খালাস পেয়েছিলেন।’ আইনজীবী জানতে চান, ‘নজরুলের বিরুদ্ধে সিদ্ধিরগঞ্জসহ বিভিন্ন থানায় সাতটি জিডি ও ১৩টি মামলা রয়েছে, আপনি জানেন?’ জবাবে বিউটি বলেন, ‘তিনি রাজনীতি করতেন। এসব ছিল রাজনৈতিক মামলা। ‘
আসামি মিজানুর রহমান দীপুর পক্ষে বিউটিকে জেরা করেন অ্যাডভোকেট খোকন সাহা। তিনি বিউটির কাছে জানতে চান, এজাহারে দীপুর নাম ছিল কি না। জবাবে বিউটি বলেন, ‘না।’ আইনজীবী প্রশ্ন করেন, ‘দীপুর সঙ্গে অতীতে নিহত নজরুলের কোনো মামলা-মোকদ্দমা হয়েছিল কি-না?’ জবাবে বিউটি বলেন, ‘আমার জানা নেই।’
প্রশ্ন :নজরুলের সঙ্গে আপনার ছোট বোনের জামাইয়ের পাওয়ার স্টেশন নিয়ে ঝামেলা ছিল।
সেলিনার উত্তর :এসব ছোটখাটো ঝামেলা ছিল।
প্রশ্ন :নজরুলের গ্রেফতার ও ফাঁসির দাবিতে তার শ্বশুরই মানববন্ধন করেছে।
উত্তর :এটা আমার জানা নেই।
প্রশ্ন : নজরুলের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়েও দরখাস্ত দেওয়া হয়েছিল।
উত্তর :এটা নূর হোসেন করিয়েছে।
বিউটিকে আসামিপক্ষের মোট ১২ জন আইনজীবী জেরা করেন।


