বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির চাঞ্চল্যকর ঘটনায় শুধু শক্তিশালী বিদেশী সিন্ডিকেট নয়, দেশীয় প্রভাবশালী চক্রও জড়িত। চক্রটি কেন্দ্রীয় ব্যাংক ঘিরে দীর্ঘদিন থেকেই সক্রিয়। এরা এতটাই প্রভাবশালী যে, বাংলাদেশ ব্যাংকের অনেকেই তাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়া তো দূরের কথা, মুখ পর্যন্ত খুলতে ভয় পান। বেসরকারি ব্যাংকের শীর্ষ পদগুলোতেও এদের লোকজন শক্ত জায়গা করে নিয়েছে। প্রকারান্তরে এরা কেন্দ্রীয় ব্যাংকের অনেক কিছুই নিয়ন্ত্রণ করে থাকেন। আর তাদের আশ্রয়-প্রশ্রয় দেয়ার জন্য দেশে এবং বিদেশে প্রভাবশালীদের লম্বা হাতও কাজ করে। যে কারণে এভাবে অর্থ চুরির বিষয়টি প্রথম থেকেই ধামাচাপা দেয়ার চেষ্টা করা হয়। কিন্তু বিষয়টি মিডিয়াতে ব্যাপকভাবে চলে আসায় এখন কেউ কেউ ‘শাক দিয়ে মাছ ঢাকা’র ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছেন। যাতে শক্তভাবে তদন্ত হতে না পারে সেজন্য অনেকে পর্দার আড়াল থেকে নানাভাবে প্রভাব খাটানোর চেষ্টাও করছেন।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট কয়েকজন প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ এবং সাবেক খ্যাতনামা একজন ব্যাংকার যুগান্তর প্রতিবেদককে এমন সব বিস্ময়কর তথ্য জানিয়েছেন। নাম প্রকাশ না করার শর্তে তারা এও বলেন, বিষয়টি এমন যে, যারা চুরি প্রক্রিয়ায় নেপথ্যে থেকে সহায়তা ও সমর্থন জুগিয়েছেন তারাই এখন ঘটনাটিকে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের গাফিলতি ও হ্যাকারদের কাজ বলে চালিয়ে দিতে চাইছেন। অবাক হওয়ার বিষয়, তদন্তের সঙ্গে কেউ কেউ এরই মধ্যে ‘চোরদের’ পক্ষে অবস্থান নিয়েছেন।
তবে আশার কথা, সরকারের শীর্ষ পর্যায় থেকে কঠোর হুশিয়ারি দিয়ে বলা হয়েছে, এই ঘটনার সঙ্গে যে বা যারাই জড়িত থাকুক না কেন তাদের ছাড় দেয়া হবে না। ফলশ্রুতিতে আইনশৃংখলা বাহিনীর একটি গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা কোমর বেঁধে মাঠে নেমেছেন। এরই মধ্যে সন্দেহভাজন ১২ জনের একটি প্রাথমিক তালিকা প্রস্তুত করা হয়েছে। যাদের গতিবিধি নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। আজ-কালের মধ্যে এই তালিকা থেকে কয়েকজনকে আটক দেখানো হতে পারে।
তদন্ত সংশ্লিষ্ট সূত্র আরও জানায়, দেরিতে হলেও এরই মধ্যে বেশকিছু গুরুত্বপূর্ণ ক্লু পেয়েছে আইনশৃংখলা বাহিনীর সংশ্লিষ্ট সংস্থাটি। ওই তথ্যের ভিত্তিতে চক্রটির আদ্যোপান্ত উদ্ধার করার চেষ্টা চলছে। শনিবার পর্যন্ত বাংলাদেশ ব্যাংকের দুই কর্মকর্তাকে নিবিড় নজরদারির মধ্যে রাখা হয়েছে। আরও ১০ জনের গতিবিধি অনুসরণ করা হচ্ছে। এছাড়া সার্ভার সংশ্লিষ্টদের পাশাপাশি নজরদারিতে আছেন আরও কয়েকজন শীর্ষ কর্মকর্তা। এসব শীর্ষ কর্মকর্তার অতীত কর্মকাণ্ড পর্যালোচনা করছেন গোয়েন্দারা। তাদের দেশে ও বিদেশে সহায়-সম্পত্তির খোঁজখবরও নেয়া হচ্ছে। কারও কারও লাইফস্টাইল পর্যালোচনা করে দেখা গেছে, তাদের বেতনের সঙ্গে বাস্তব খরচের কোনো মিল নেই।
তদন্তে নিয়োজিত গোয়েন্দা সংস্থার সূত্রগুলো জানায়, বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃপক্ষ তাদের জানিয়েছে অর্থ চুরির ঘটনাটি কোনো এক ছুটির দিন হয়েছে। সেক্ষেত্রে ২৯ জানুয়ারি যারা সার্ভারের দায়িত্ব পালন করেছেন তাদের মাধ্যমে এ অপরাধ সংঘটিত হওয়ার আশংকা সবচেয়ে বেশি। আর ওইদিন যারা দায়িত্বে ছিলেন তাদের নাম রয়েছে সন্দেহভাজন ১২ জনের তালিকায়। এদের মধ্যে দু’জনকে যে কোনো মুহূর্তে আটক বা গ্রেফতার করা হতে পারে। শেষ খবর পাওয়া পর্যন্ত তালিকায় থাকা সংশ্লিষ্ট সবার পাসপোর্ট ও ন্যাশনাল আইডি কার্ড জব্দ করা হয়েছে।
এদিকে তথ্যপ্রযুক্তির মাধ্যমে আরও কিছু বিষয় নিশ্চিত হতে গোয়েন্দা সংস্থার কর্মকর্তারা সন্দেহভাজনদের টেলিফোন কললিস্ট খতিয়ে দেখছেন। এরই মধ্যে তাদের ব্যবহৃত কম্পিউটার ও সার্ভার সংশ্লিষ্ট ডাটা পরীক্ষা করা হয়েছে। তারা পাসওয়ার্ডসহ বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থসংক্রান্ত সব তথ্য জানেন। বাংলাদেশ ব্যাংকে থাকা শক্তিশালী চক্রের হয়ে এরাই এ ধরনের অপরাধ করতে পারেন বলে প্রাথমিকভাবে নিশ্চিত সংস্থাটির কর্মকর্তারা।
একজন তথ্যপ্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ জানান, সার্ভারের প্রয়োজনীয় সব ডাটা পর্যালোচনা করে যে তিনটি আইডি শনাক্ত করা গেছে, তা থেকেই অর্থ চুরির রহস্য উন্মোচন করা সম্ভব। বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে প্রথমে বলা হচ্ছিল যে, ভেতরের লোক জড়িত না-ও থাকতে পারে। কিন্তু প্রযুক্তি তাদের নতুন করে চোখ খুলে দিয়েছে। প্রাপ্ত তথ্য থেকে বিষয়টি অনেকটা স্পষ্ট যে, কাজটি ভেতর থেকেই করা হয়েছে। যদি হ্যাকার প্রবেশ করে থাকে তবে সেই সুযোগ ভেতর থেকে কেউ না কেউ করে দিয়েছেন। সবমিলে এ কাজটির সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবে যেসব কর্মকর্তা জড়িত তাদের দায় এড়ানোর কোনো সুযোগ নেই।
সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ তানভীর হাসান জোহা বলেন, সার্ভারের সব ডাটার ফরেনসিক পরীক্ষা করা হয়েছে। এখন পর্যালোচনা করা হচ্ছে। সন্দেহজনক আইডি শনাক্ত হয়েছে। এখন কে বা কারা এই আইডি ব্যবহার করতেন তাকে ধরতে পারলেই রহস্য বেরিয়ে আসবে। তিনি বলেন, এতটুকু নিশ্চিত করে বলা যায়- ব্যাংকের ভেতরের চ্যানেলের লোক ছাড়া শুধু বাইরে থেকে কারও পক্ষে এ বিশাল অর্থ চুরি করা সম্ভব নয়।


