বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

প্রাণ পাচ্ছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার ‘মৃত’ গণতন্ত্র

democracy_in_asia_6749২ মার্চ ১৯৬২। মিয়ানমারের (তৎকালীন বার্মা) জেনারেল নে উইন এক অভ্যুত্থান ঘটিয়ে সামরিক স্বৈরতন্ত্র প্রতিষ্ঠা করলেন। সামরিকতন্ত্রের সেই ঘানি টানতে হল ২০১০ সাল পর্যন্ত। মিয়ানমারের দেখাদেখি এক দশকের মাথায় ফিলিপিন্সে মার্শাল ল’ জারি করলেন ফার্ডিন্যান্ড মার্কোস। সামরিক আইনবলে ১৯৮৬ সাল পর্যন্ত তিনি ক্ষমতায় থাকলেন। ফিলিপিন্সের গণতন্ত্র মৃত্যুর মাত্র কয়েক বছর আগে ১৯৬৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর সেনাবাহিনীর অভ্যন্তরে এক বিদ্রোহ ও কয়েকজন সেনা কর্মকর্তা নিহতের জের ধরে ক্ষমতা দখলে নিল সেনাবাহিনী। আর সারা দেশে শুরু হল কমিউনিস্টদের ধরে ধরে হত্যা। মিয়ানমার, ফিলিপিন্স ও ইন্দোনেশিয়া- দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার এই তিনটি দেশের গণতন্ত্রের মৃত্যুর এটাই রাজনৈতিক ইতিহাস।

দীর্ঘকাল পরে এক এক করে আবার প্রাণ ফিরে পাচ্ছে সেই মৃত গণতন্ত্র। কিন্তু গণতন্ত্রের মৃত্যুতে কেমন মূল্য দিয়েছে দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া? ১৯৬২ সালের অভ্যুত্থানের পর পুরো মিয়ানমারের নিয়ন্ত্রণ নেয় সেনাবাহিনী। কিন্তু বিভিন্ন নৃতাত্ত্বিক বিদ্রোহীগোষ্ঠীর সঙ্গে গৃহযুদ্ধ রোধ করতে পারেনি। বিদ্রোহীদের সঙ্গে সেই সংঘাত আজও চলছে। পুরো মিয়ানমারে যখন একক রাজনৈতিক শক্তি হিসেবে সেনাবাহিনী প্রতিষ্ঠিত হল, ১৯৮৮ সালে তাদের চ্যালেঞ্জ করে ছাত্রজনতা। কিন্তু সেই ছাত্রবিক্ষোভ নৃশংসভাবে দমন করে সেনাবাহিনী।

১৯৯০ সালে একটি নির্বাচনের আয়োজন করলেও তার ফল মেনে নেয়নি জান্তা সরকার। উল্টো বিজয়ী দল ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসির (এনএলডি) নেতা অং সান সুচিসহ শীর্ষস্থানীয় নেতাদের গণহারে আটক শুরু করে। ২০১০ সালে আধাসামরিক সরকার গঠনের মাধ্যমে রাজনৈতিক কিছু সংস্কার সাধিত হয়। রাজনৈতিক বন্দিদের মুক্তি দেয়া হয়। গণমাধ্যমের ওপর নিয়ন্ত্রণ অবমুক্ত করা হয়। অবশেষে ২০১৫ সালে একটি অবাধ নির্বাচনের মাধ্যমে ৫৪ বছর পর গণতন্ত্রকে জীবিত করা হয়েছে। গত ৫০ বছর ধরে মিয়ামনার কেন অনুন্নত দেশ হয়ে পড়ে রইল? অনেক বিশ্লেষকই মনে করেন এর বড় কারণ গণতন্ত্রের মৃত্যু। ইয়াঙ্গুন হেরিটেজ ট্রাস্টের নির্বাহী পরিচালক ইতিহাবিদ থান্ট মিন্ট উ তার ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘১৯৬২ সালে অভ্যুত্থানের সময় মিয়ানমার দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ার অপেক্ষাকৃত উন্নত দেশ ছিল।

তখন মিয়ানমারদের মাথাপিছু আয় ইন্দোনেশীয়দের চেয়ে তিন গুণ ও থাইদের তুলনায় দ্বিগুণ বেশি ছিল। দক্ষিণ কোরিয়ার মানুষদের মতোই জীবনমান ছিল মিয়ানমারে। কিন্তু পরবর্তীতে মিয়ানমারবাসী তাদের মৌলিক স্বাধীনতা ও অধিকার কুরবানি দিয়েও জীবনমানের উন্নতি করতে পারেনি।’ অর্থাৎ সেনাবাহিনী কেবল গণতন্ত্রকে হত্যা করেনি, উন্নয়নকেও থামিয়ে দিয়েছে।

অন্যদিকে ফিলিপিন্সের অবস্থাও একইরকম। ১৯৭২ সালে মার্কোসের ক্ষমতা নেয়ার পর থেকে দেশে আর উন্নয়ন হয়নি। কমিউনিস্ট জুজুর ভয় দেখিয়ে নিজের ক্ষমতাকে তিনি পাকাপোক্ত করেছিলেন। তার অভ্যুত্থান দিবসকে ‘জাতীয় ধন্যবাদ দিবস’ হিসেবে পালন করা হয়েছিল। কিন্তু অধিকাংশ ফিলিপিন্সের মতে ওই দিন ছিল ‘গণতন্ত্রের মৃত্যু দিবস’। জনগণ মনে করে, তাদের দরিদ্র রেখে ফিলিপিন্সের অর্থভাণ্ডার বিদেশে পাচার করেছিল শাসকগোষ্ঠী। ১৯৮৬ সালে এক শান্তিপূর্ণ গণঅভ্যুত্থানের মাধ্যমে মার্কোসের পতন ঘটে।

ইন্দোনেশিয়ার ক্ষেত্রে সামরিক শাসনের সময়কালে বিভিন্ন সহিংসতায় দেশজুড়ে প্রায় ১০ লাখ মানুষ নিহত হয়। সেই কঠিন সময়ের ঘটনাবলি খুব বেশি আলোচিত হয় না। শুধু উঠে আসে জেনারেল সুহার্তোর নাম। সুকর্নকে হটিয়ে তিনি ক্ষমতা দখল করে টিকেছিলেন ১৯৯৮ সাল পর্যন্ত।

গণতন্ত্রের এই বাঁচা মরার মধ্যেই দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়ায় বেসামরিক সরকার প্রতিষ্ঠা পেয়েছে। কিন্তু উন্নয়নের গতিধারা বাড়েনি। থাইল্যান্ডে ২০১৪ সালের মে মাসে সেনাবাহিনী ক্ষমতা দখল করে নিয়েছে। মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাকের দুর্নীতির বিরুদ্ধে ফুঁসে উঠছে বিরোধী জোট। মানবাধিকার, মতপ্রকাশের স্বাধীনতা এখনও সেখানে প্রশ্নবিদ্ধ। মিয়ানমারে নতুন গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার পর অং সান সুচি শাসনকার্যে কতটা সফল হবেন সেটাই এখন দেখার বিষয়।

আরও পড়ুন