হ্যাকিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশ ব্যাংকের আট কোটি ডলার লোপাটের প্রেক্ষাপটে গভর্নরের পদ ছাড়লেন আতিউর রহমান। বিষয়টি নিয়ে দেশজুড়ে আলোচনার মধ্যে তিনি মঙ্গলবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে পদত্যাগপত্র দেন। এর আগে সকালে গুলশানে নিজের বাসায় কয়েকজন সাংবাদিককে আতিউর রহমান বলেন, ‘প্রধানমন্ত্রী চাইলে’ তিনি পদত্যাগের জন্য প্রস্তুত আছেন।
“আমি অপেক্ষা করছি, প্রধানমন্ত্রী কী বলেন। আমি পদত্যাগ করলে যদি বাংলাদেশ ব্যাংকের ভালো হয়, দেশের ভালো হয়, তাহলে পদত্যাগ করতে আমার দ্বিধা নাই। আমি পদত্যাগপত্র লিখে বসে আছি। প্রধানমন্ত্রী বলার সঙ্গে সঙ্গে আমি পদত্যাগ করব।”
এ সময় গভর্নরের হাতে পদত্যাগপত্র দেখা যায়।
রিজার্ভের টাকা খোয়ার যাওয়ার ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর ড. আতিউর রহমান দেশবাসীর কাছে অনুরোধ করেছেন, তারা যেন তাকে ভুল না বোঝেন।
মঙ্গলবার তার বাসভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি সব সময় দেশের স্বার্থের জন্য কাজ করেছি। দেশের ভালো ছাড়া মন্দ কখনও ভাবিনি। দেশবাসীর কাছে আমার অনুরোধ তারা যেন আমাকে ভুল না বোঝেন।’
ড. আতাউর বলেন, ‘আমি এ দেশের মাটির মানুষ। আমি সাত বছর ধরে গভর্নরের দায়িত্ব পালন করে আসছি। এ সময় আমি চেষ্টা করছি দেশের ব্যাংকি খাতকে এগিয়ে নিতে। আমি সাধারণ মানুষ এমনকী পথশিশুদের ব্যাংকি সুবিধার মধ্যে নিয়ে এসেছি।’
তিনি বলেন, ‘বঙ্গবন্ধুর আদর্শে অনুপ্রাণিত হয়ে সব সময় দেশের মানুষের অর্থনৈতিক মুক্তি চেয়েছি। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেশ গড়ার কাজে তার পরামর্শ অনুসারে কাজ করেছি।’
এক পর্যায়ে আবেগে আপ্লুত হয়ে গভর্নর বলেন, ‘আমি সারাজীবন সততার সঙ্গে চলেছি। নিজের বাড়ি বিক্রি করে সন্তানদের পড়াশুনা করিয়েছি।’
২০০৮ সালে নবম সংসদ নির্বাচনে জয়ী হয়ে আওয়ামী লীগ সরকার গঠনের চার মাস পেরিয়ে ১ মে বাংলাদেশ ব্যাংকের দশম গভর্নর হিসাবে চার বছরের জন্য দায়িত্ব নেন আতিউর। এরপর তাকে আরও এক মেয়াদের জন্য গুরুত্বপূর্ণ এ দায়িত্বে রাখার সিদ্ধান্ত জানায় সরকার। ২০১৬ সালের ২ অগাস্ট তার দ্বিতীয় মেয়াদ শেষ হওয়ার কথা ছিল।
আতিউরের মেয়াদকালে দেশে মূল্যস্ফীতি কমার পাশাপাশি বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ কয়েকগুণ বেড়ে ২৮ বিলিয়ন ডলারে পৌঁছেছে।
যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভে সঞ্চিত বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাট হওয়ার খবর প্রকাশের পর সমালোচনার মধ্যে পদ ছাড়লেন আতিউর।
ফিলিপিন্সের ডেইলি ইনকোয়ারারে ২৯ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বাংলাদেশ ব্যাংকের ৮১ মিলিয়ন ডলার লোপাটের খবর এলে আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে আলোচনার ঝড় ওঠে।
তদন্তে জানা যায়, গত ৪ ফেব্রুয়ারি সুইফট মেসেজিং সিস্টেমে হ্যাংকিংয়ের মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রের ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে সঞ্চিত বাংলাদেশ ব্যাংকের ওই অর্থ ফিলিপিন্সের একটি ব্যাংকে সরিয়ে ফেলা হয়।
শ্রীলঙ্কার একটি ব্যাংকে আরও ২০ মিলিয়ন ডলার সরানো হলেও বানান ভুলের কারণে সন্দেহ হওয়ায় শেষ মুহূর্তে তা আটকে যায়।
বাংলাদেশ ব্যাংক শুরুতেই বিষয়টি টের পেলেও কর্মকর্তারা তা গোপন করে যাওয়ায় অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিতকে এক মাস পর তা পত্রিকা পড়ে জানতে হয়।
অর্থ লোপাটের বিষয়টি চেপে গিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংক যেভাবে তা সামাল দেওয়ার চেষ্টা করেছে তাকে ‘অযোগ্যতা’ আখ্যায়িত করে ‘ক্ষুব্ধ’ মুহিত রোববার বলেছিলেন, এই ‘স্পর্ধার’ জন্য ‘অবশ্যই ব্যবস্থা নেওয়া হবে’।
অর্থ লোপাট এবং তার তদন্ত নিয়ে মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন আহ্বান করেছিলেন অর্থমন্ত্রী। তবে গভর্নরের পদত্যাগের খবরের পর তা বাতিলের ঘোষণা এসেছে।
গভর্নরের দায়িত্ব পালনকালে দেশ-বিদেশে বেশ কয়েকটি পুরস্কার পান আতিউর রহমান। গত বছর লন্ডনভিত্তিক প্রভাবশালী পত্রিকা দি ফাইন্যান্সিয়াল টাইমস তাকে এশিয়া প্যাসিফিক অঞ্চল থেকে ‘সেন্ট্রাল ব্যাংকার অব দ্য ইয়ার’ ঘোষণা করে। এর আগে ফিলিপিন্সের গুসি শান্তি পুরস্কার পান তিনি।
আতিউর রহমান জন্মগ্রহণ করেন ১৯৪৯ সালের ২৮ নভেম্বর, জামালপুরে।
মির্জাপুর ক্যাডেট কলেজ থেকে মাধ্যমিক ও উচ্চ-মাধ্যমিক পাসের পর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতক ও স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি নেন তিনি। পিএইচডি ডিগ্রি পান ১৯৮৩ সালে৷
মাস্টার্স পড়ার সময়ই ১৯৭৫ সালে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনে প্ল্যানিং অফিসার হিসেবে কর্মজীবন শুরু করেন আতিউর রহমান। ১৯৮৩ সালে যোগ দেন বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অফ ডেভেলপমেন্ট স্টাডিজে (বিআইডিএস)৷ এছাড়া ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যাপনা করেছেন।
বাংলাদেশের অর্থনৈতিক উন্নয়ন এবং ক্ষুদ্রঋণ বিপ্লব নিয়ে অনেক গবেষণামূলক লেখা রয়েছে তার। প্রবন্ধের জন্য এ বছর বাংলা একাডেমি পুরস্কার পেয়েছেন তিনি, যা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন আওয়ামী লীগের এক নেতা।


