অর্থমন্ত্রী আবুল মাল আবদুল মুহিত বলেছেন, রিজার্ভ থেকে অর্থ চুরির ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের কর্মকর্তারা অবশ্যই জড়িত। তাদের যোগসাজশ ছাড়া এ কাণ্ড হতে পারত না। গতকাল বৃহস্পতিবার একটি জাতীয় দৈনিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি একথা বলেন। সাক্ষাৎকারে উঠে আসে সাবেক গভর্নর আতিউর রহমানের পদত্যাগের পটভূমি, ব্যাংক ব্যবস্থাপনার অদক্ষতা ও অনিয়মের চিত্র।
রিজার্ভ চুরির ঘটনা জানার পর বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর পদত্যাগ করতে বাধ্য হলেন। ডেপুটি গভর্নরদেরও সরিয়ে দিলেন। খুব ত্বরিত ব্যবস্থা নিলেন বলে মনে হচ্ছে।
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ। কিন্তু আমি খুব অবাক হয়েছি। আতিউর রহমান সংবাদ সম্মেলন করেছেন। তিনি একটুও লজ্জিত হননি।
সংবাদ সম্মেলন করেছেন, না ব্যাখ্যা দিয়েছেন?
অর্থমন্ত্রী: ব্যাখ্যা না, সংবাদ সম্মেলনই করেছেন। বাড়িতে করেছেন এবং দুই দফা। একবার পদত্যাগের আগে, আরেকবার পদত্যাগের পর। এ ছাড়া প্রধানমন্ত্রীর কাছে তিনি ইনিয়ে-বিনিয়ে অনেক কথা বলেছেন। দুজন ডেপুটি গভর্নরের চাকরি গেছে তার কারণে। বোঝাতে চাইলেন যে তিনি একা দায়ী নন। দুজনের বাইরে আরও কয়েকজনের চাকরি খাওয়ার চেষ্টা করেছিলেন। তা আর হয়নি, হবেও না।
নতুন গভর্নর তো নিয়োগ দিলেন। টাকা উদ্ধারে কী পদক্ষেপ নিচ্ছেন?
অর্থমন্ত্রী: টাকা আসলে উদ্ধার হবে কি না, আমি নিশ্চিত না। কিছু টাকা পাওয়া গেছে বরং শ্রীলঙ্কার কল্যাণে।
চুরির ঘটনা জানার পর আতিউর রহমান কী করেছিলেন বলে আপনি শুনেছেন?
অর্থমন্ত্রী: কী বলব। তিনি সংকটটির গভীরতাই বুঝতে পারেননি। আমার মনে হয়, তিনি চিন্তাই করতে পারেননি যে এটা একটা বড় ঘটনা। খবর পেয়েও তিনি দেশের বাইরে বাইরে ঘুরেছেন।
দিল্লির বৈঠকে তো আপনারও যাওয়ার কথা ছিল।
অর্থমন্ত্রী: এটা মূলত অরুণ জেটলির (ভারতের অর্থমন্ত্রী) দাওয়াত ছিল। আমাকেও দাওয়াত দিয়েছিলেন তিনি। যাব চিন্তা করেও পরে যাইনি।
আতিউর রহমানের সাফল্যও তো কিছু কম নয়…
অর্থমন্ত্রী: কেন্দ্রীয় ব্যাংকে তার অবদান প্রায় শূন্য (অলমোস্ট জিরো)। তিনি খালি পৃথিবী ঘুরে বেড়িয়েছেন আর লোকজনকে অনুরোধ করেছেন বক্তৃতা দেওয়ার জন্য তাকে সুযোগ দিতে ও দাওয়াত দিতে। এখন বেরোচ্ছে এগুলো।
গ্রিন ব্যাংকিং, কৃষকদের জন্য ১০ টাকার হিসাব খোলার সুযোগ ইত্যাদি তো সাফল্যই।
অর্থমন্ত্রী: এগুলো স্লোগান। তিনি খালি পিআরের (জনসংযোগ) কাজ করেছেন। এসব নিয়ে বাজারে অনেক কথাও আছে।
আতিউর রহমান বলার চেষ্টা করেছেন যে বেসিক ব্যাংক, হল-মার্ক কেলেঙ্কারির ব্যাপারে ব্যবস্থা নিতে তিনি অর্থ মন্ত্রণালয়ে সুপারিশ করেছিলেন।
অর্থমন্ত্রী: না, না। এগুলো ইতিমধ্যে বহুল আলোচিত বিষয়। বেসিক ব্যাংক পুরোনো বিষয়। বেসিক ব্যাংকের ওপর প্রথম নিরীক্ষা প্রতিবেদনটা ভালো ছিল। তারপর তো বাংলাদেশ ব্যাংকই সব ধামাচাপা দিয়ে দিল।
আপনি কিন্তু বলেছিলেন বেসিক ব্যাংকের সাবেক চেয়ারম্যান আবদুল হাই বাচ্চুর বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেবেন, পরে আর নেননি।
অর্থমন্ত্রী: হ্যাঁ, বলেছিলাম। ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। এখনো হয়নি। যাই হোক। রাজনৈতিক ব্যাপার-স্যাপার সব আলাপ করা যায় না। তবে ব্যবস্থা ঠিকই নেওয়া হবে। দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) বিষয়টা ঠিকভাবে দেখভাল করতে পারেনি। যখন আদালতে যাবে, আদালত ঠিকই সব জানতে চাইবে এবং তখন ওই লোকটার বিরুদ্ধেও ব্যবস্থা হবে।
রিজার্ভের অর্থ চুরির বিষয়টি নিয়ে সরকারকে যতটা সোচ্চার হতে দেখা গেছে, ব্যাংক খাত থেকে যে হাজার হাজার কোটি টাকা লুটপাট হয়েছে, সেগুলোর ক্ষেত্রে অতটা সোচ্চার হতে দেখা যায়নি, কেন?
অর্থমন্ত্রী: আসলে অন্য লুটপাট ধরার বিষয়ে কোনো নির্দেশক (ইনডিকেটর) নেই, যার মাধ্যমে তথ্য পেতে পারি।
রিজার্ভ চুরির ঘটনায় যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হলো, তাদের মধ্যে নির্দোষ কেউ আছেন কি না…
অর্থমন্ত্রী: একমাত্র আসলাম আলম নির্দোষ। ওএসডি (বিশেষ ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা) হলো। সামান্য শাস্তি, কিন্তু বদনাম তো হলো। আমি আগের দিনই আসলামকে ডেকেছিলাম। বলেছি, তোমার ওপর খড়্গ আছে। কিন্তু তোমার কোনো দোষ নেই।
নতুন গভর্নর সম্পর্কে কিছু বলুন।
অর্থমন্ত্রী: ভালো। তিনি আমার অর্থসচিব ছিলেন। আমি তাকে জানি। শিগগিরই কেন্দ্রীয় ব্যাংক চালানোও তিনি শিখে ফেলবেন।


