চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে গত মঙ্গলবার আত্মহত্যা করেছেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র তারেক আজিজ সোহাগ (২৮)। তার এই মৃত্যুতে কৃষক পিতার সব স্বপ্ন ভেঙে চুরমার হয়ে গেছে। সোহাগের মৃত্যুতে তার পরিবারের কান্না থামছে না।
সোহাগ ঝিনাইদহ জেলার কালীগঞ্জ উপজেলার একতারপুর গ্রামের আবদুল খালেকের একমাত্র ছেলে ছিলেন।
মা সাদিয়া বেগম ও যশোর এমএম কলেজে রাষ্ট্রবিজ্ঞানে অনার্স পড়ুয়া বোন শারমীন জুথিকে নিয়ে ছিল তাদের স্বপ্নের সংসার।
পরিবারের স্বপ্ন ছিল, সোহাগ ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে পড়ালেখা শেষ করে ভাল একটি চাকরি করবে। আর্থিক অনটন আর থাকবে না। একমাত্র বোনকে নিয়েও আর ভাবতে হবে না পিতাকে। কিন্তু, সব ভাবনাকে আরও বাড়িয়ে না ফেরার দেশে চলে গেছেন সোহাগ।
সোহাগ একতারপুর মাধ্যমিক স্কুল থেকে এসএসসি পাসের পর যশোর ক্যান্টনমেন্ট কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করেন। এরপর প্রথমে জগন্নাথ বিশ্ববিদ্যালয়ে ইংরেজি ও পরের বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে দর্শন শাস্ত্রে ভর্তি হন এবং স্নাতক ও স্নাতকোত্তর শেষ করেন।
সোহাগ হাজী মুহাম্মদ মুহসীন হলের ৪৪৯ নম্বর রুমে ছিলেন। দীর্ঘদিন ধরে চাকরি না পাওয়ার হতাশা থেকে গত ১০ মার্চ সকালে নিজ বাড়িতে কীটনাশক পান করেন।
ওইদিন দুপুরে তাকে ভর্তি করা হয় কালীগঞ্জ উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে। সেখান থেকে পরের দিন সকাল ৮টার দিকে নেয়া হয় যশোর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে। অবস্থার কোনো উন্নতি না হওয়ায় গত মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ১০টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হলে বেলা ১২টার দিকে তার মৃত্যু হয়।
একতাপুর ও আশপাশের গ্রামের কেউই সোহাগের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছেন না। তারা বলছেন, পরিবারে অভাব ছিল ঠিকই। কিন্তু, ভালবাসার কোনো কমতি ছিল না। তারপরও কেন আত্মঘাতী হলেন সোহাগ?
সোহাগের গ্রামের বাড়িতে গিয়ে দেখা গেল, সুনশান নিরবতা। কারও মুখে কোনো কথা নেই। শব্দ করে কান্নার শক্তিও এখন স্বজনদের নেই।
বুধবার গ্রামের গোরস্থানে যেখানে সোহাগকে দাফন করা হয়েছে, মা সাদিয়া বেগম ছুটে ছুটে যাচ্ছেন সেখানে। বাড়িতে থাকলেও সোহাগের ছবি বুকে আঁকড়ে ধরে সারাক্ষণ কাঁদছেন। পিতা আবদুল খালেক নির্বাক।
ছোট চাচা হাফিজুর রহমান বলেন, স্নাতক তৃতীয় বর্ষের সময় সোহাগ মানসিক ভারসাম্য হারাতে থাকে। সারাক্ষণ নিরব থাকতো, উল্টা-পাল্টা কথা বলতো।
বন্ধুদের সোহাগ বলতো, পড়ালেখা শেষ করে সে ভাল একটি চাকরি করবে। এজন্য অনেক চেষ্টাও করেছে। কিন্তু, কোনো চাকরি হয়নি। পরে বেশ কয়েকটি কোম্পানিতে দরখাস্ত করলেও পরীক্ষা কিংবা সাক্ষাৎকার দেইনি বলে জানান তার বোন শারমীন।
তিনি বলেন, ভাই মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়লে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিকেল বিশ্ববিদ্যালয়, রাজশাহী, যশোর এবং ঝিনাইদহের কালীগঞ্জে মানসিক হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়েছে। কিন্তু, অবস্থার তেমন উন্নতি হয়নি।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে শারমীন বলেন, ঘটনার দিন সকাল থেকে ঘুমিয়ে ছিল তার ভাই। সে এটা করবে আমরা কেউ স্বপ্নেও ভাবেনি। সবাইকে কাঁদিয়ে ভাই এভাবে চলে যেতে পারল, এটা এখনও বিশ্বাস করতে পারছি না।


