বৃহস্পতিবার ৫ নভেম্বর ২০২৬

‘নৌকায় ভোট না দিলে কেউ ভোট কেন্দ্রে যাবেন না’

up_election_7312আওয়ামী লীগ নেতাদের হুমকি আর উত্তপ্ত বক্তব্যে ‘কাঁপছে’ জামায়াত-বিএনপি অধ্যুষিত যশোরের মনিরামপুর উপজেলা। প্রথম ধাপের নির্বাচনের শেষদিকে এসে জেলা আওয়ামী লীগ নেতাদের বক্তব্যে সুষ্ঠু নির্বাচন নিয়ে শংকা প্রকাশ করেছে বিএনপি। নৌকায় ভোট না দিলে নির্বাচনের দিন ভোট কেন্দ্রে না যেতে হুমকি দেয়া হচ্ছে বলেও অভিযোগ করেছেন স্থানীয় বিএনপি নেতারা।

মনিরামপুর উপজেলা বিএনপির সভাপতি শহীদ ইকবাল বলেন, নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে ততই সুষ্ঠু পরিবেশ নষ্ট করছেন জেলা আওয়ামী লীগের নেতারা। তিনি বলেন, বুধবার খেদাপাড়া ইউনিয়নের একটি পথসভায় জেলার শীর্ষ নেতারা নৌকায় ভোট না দিলে ২২ মার্চ ভোট কেন্দ্রে না যাওয়ার হুমকি দেন। এমন বক্তব্যে অন্য প্রার্থীরা ভয় পেয়েছেন। এ বিষয়ে প্রশাসনের উচিত হবে নির্বাচনী মাঠে যে ভীতির সঞ্চার হয়েছে তা প্রশমিত করে ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ গড়ে তোলা।

মনিরামপুর উপজেলা চেয়ারম্যান ও উপজেলা আওয়ামী লীগের বিদায়ী কমিটির যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আমজাদ হোসেন লাভলুর বক্তব্যের এক মিনিট ৫৩ সেকেন্ডের একটি ভিডিও যুগান্তরের হাতে এসেছে। এতে কয়েকটি ইউনিয়নে পথসভায় উত্তেজনাকর বক্তব্য দিতে দেখা যায় তাকে। মশ্মিমনগর ইউনিয়নের একটি পথসভায় বলতে শোনা যায়, ‘যে স্বপ্ন নিয়ে ইউপি চেয়ারম্যান প্রার্থীদের হাতে নৌকা তুলে দেয়া হয়েছে সে স্বপ্ন ২২ তারিখের নির্বাচনে বাস্তবায়ন করতে হবে। আওয়ামী লীগের প্রত্যেকটি কেন্দ্রে দুর্গ গড়ে তুলুন। আমাদের প্রত্যেক কর্মী ভোটের মাঠ দখল করে, ভোট করে দেখিয়ে দেবেন।’ অপর একটি অডিও রেকর্ডে বলতে শোনা যায়, ‘নৌকায় ভোট না দিলে ২২ তারিখ কেউ ভোটকেন্দ্রে যাবেন না।’

এ বিষয়ে জানতে আমজাদ হোসেন লাভলুর মোবাইলে এ প্রতিবেদক বারবার ফোন করলেও কেউ রিসিভ করেননি। পরিচয় দিয়ে ক্ষুদেবার্তা পাঠানো হলেও কোনো উত্তর মেলেনি। তবে যশোর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক শাহীন চাকলাদার বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, আওয়ামী লীগ নেতাদের বিরুদ্ধে হুমকি-ধমকি দেয়ার অভিযোগ সঠিক নয়। কারণ নির্বাচনে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় থাকুক সেটা আমরাও চাই। নির্বাচন সুষ্ঠু হলে মনিরামপুরের প্রতিটি ইউনিয়নে বিপুল ভোটে বিজয়ী হবে আওয়ামী লীগ।

তিনি অভিযোগ করেন, বিভিন্ন স্থানে আওয়ামী লীগ নেতাকর্মীরা হামলা-মামলার শিকার হচ্ছেন। তিনি দাবি করেন, বুধবার চালুয়াহাটি ইউনিয়নে প্রতিপক্ষের হামলায় হাত ভেঙেছে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল ইসলামের। এ ঘটনায় মামলা হয়েছে আওয়ামী লীগ নেতাদের আসামি করে। এক প্রশ্নের জবাবে জেলা আওয়ামী লীগের এ নেতা বলেন, সরকারি দল হিসেবে প্রভাব বিস্তার করা হলে আওয়ামী লীগ নেতারা মার খেতেন না এবং তাদের বিরুদ্ধে মামলাও হতো না। এতেই বোঝা যায়, নির্বাচন উপলক্ষে প্রশাসন নিরপেক্ষ ভূমিকা পালন করছে। আরেক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, বুধবার খেদাপাড়া ইউনিয়নে কিছু নেতাকর্মী উত্তেজনাকর বক্তব্য দিলেও তা কি আর বাস্তয়নবায়নের সুযোগ আছে?

বিএনপিসহ বিভিন্ন স্বতন্ত্র প্রার্থীদের ভোটের সুষ্ঠু পরিবেশ নিয়ে অভিযোগ সম্পর্কে জানতে চাইলে যশোরের জেলা প্রশাসক ড. হুমায়ুন কবীর বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, সুষ্ঠু নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করতে প্রশাসন থেকে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে। নির্বাচনের আগের দিন কম্বাইন্ড অপারেশন চলবে। যে কোনো মূল্যে অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করে সাধারণ মানুষের ভোটাধিকার প্রয়োগের সুযোগ করে দেয়া হবে। তিনি বলেন, বিজিবি, র‌্যাব, পুলিশসহ অন্যান্য বাহিনীর পর্যাপ্ত সদস্য মোতায়েন থাকবে। আশা করি, মানুষ তার ভোট নিজের পছন্দের প্রার্থীকে দেয়ার সুযোগ পাবেন।

মনিরামপুরে হুমকি-ধমকি দেয়া সম্পর্কে তিনি কিছু জানেন না বলে জানান। জেলা প্রশাসক বলেন, অভিযোগ পেলে অবশ্যই এ বিষয়ে ব্যবস্থা নেয়া হবে।
জানতে চাইলে মনিরামপুর থানার ওসি তাহেরুল ইসলাম বৃহস্পতিবার রাতে বলেন, ‘বুধবার রাতে আওয়ামী লীগ প্রার্থী আবুল ইসলামের পথসভায় জেলার শীর্ষ নেতারা বক্তব্য রাখেন। জেলার নেতারা ওই প্রার্থীর পক্ষে কথা বলায় পথসভার পর আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী ও নৌকা প্রতীকধারী দু’পক্ষের সংঘর্ষ হয়।

এতে উভয়পক্ষের অন্তত ২০ জন আহত হয়েছেন।’ তিনি বলেন, ‘আবুল ইসলাম দাবি করেছেন তার হাত ভেঙে গেছে। এ বিষয়ে ডাক্তারি পরীক্ষা ছাড়া বলা যাচ্ছে না আসলে তার হাত ভেঙেছে কিনা। তবে এ ঘটনায় বৃহস্পতিবার উভয়পক্ষই পাল্টাপাল্টি মামলা দায়ের করেছেন।’

জানা গেছে, মনিরামপুরকে এক সময় জামায়াত অধ্যুষিত এলাকা বলা হলেও এখন সেখানে স্বাধীনতাবিরোধী এ দলটির প্রভাব অনেকটা কমে এসেছে। দলটির ১০ জন প্রার্থী স্বতন্ত্র হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। সাধারণ ভোটাররা মনে করছেন, আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দল আর বিএনপির প্রার্থীদের কোণঠাসা করে রাখার অভিযোগ- ফলে ভালো নেই বৃহৎ এ দুটি দলের কোনো প্রার্থীই। আওয়ামী লীগ প্রার্থীরা ফুরফুরে মেজাজে থাকলেও স্থানীয় এমপির সমর্থন না থাকায় ভোটের ফল নিয়ে ভেতরে ভেতরে শংকা কাজ করছে। আর বিএনপির প্রার্থীরা এলাকায় দাঁড়াতেই পারছেন না বলে অভিযোগ করেছেন স্থানীয় নেতারা।

২২ মার্চের প্রথম ধাপের নির্বাচনে যশোর জেলার ৮ উপজেলার মধ্যে একমাত্র মনিরামপুরের ১৭ ইউনিয়নের মধ্যে ১৬টিতে নির্বাচন অনুষ্ঠিত হচ্ছে। উচ্চ আদালতের আদেশে হরিহরনগর ইউনিয়নের নির্বাচন স্থগিত রয়েছে। সর্বশেষ ২০১১ সালের ইউপি নির্বাচনে বিএনপি সমর্থিত প্রার্থীরা ১৩ ইউনিয়নে জয়লাভ করে। এর মধ্যে খেদাপাড়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান ওমর ফারুক মারা যাওয়ার পর উপনির্বাচনে আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থী মুজিবুর রহমান জয়ী হন। অপর চারটি ইউনিয়নের মধ্যে দুটিতে আওয়ামী লীগ সমর্থিত এবং দুটিতে জামায়াত সমর্থিত চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন। এবারের নির্বাচনে বর্তমান চেয়ারম্যানদের মধ্যে ১০ জন ধানের শীষ প্রতীক নিয়ে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। অপর ছয় ইউনিয়নে নতুন মুখ বিএনপির। তবে ধানের শীষ প্রতীক না পেয়ে হরিদাসকাঠি ইউনিয়নে বিএনপির একজন বিদ্রোহীও প্রার্থী হয়েছেন।

অন্যদিকে আওয়ামী লীগ ১৬টি ইউনিয়নেই প্রার্থী দিয়েছে। এর মধ্যে চারটিতে বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। এছাড়া স্থানীয় এমপি স্বপন ভট্টাচার্য গত সংসদ নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করে মনিরামপুর থেকে নির্বাচিত হন। ওই সময় দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে যাওয়ায় তাকে জেলা আওয়ামী লীগের কোষাধ্যক্ষ পদ থেকে বহিষ্কার করা হয়। এরপর আর তাকে দলে ফিরিয়ে নেয়া হয়নি। এবারের ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আওয়ামী লীগের ১৬ প্রার্থীর মধ্যে ৭ জন স্বপন ভট্টাচার্যের আস্থাভাজন হিসেবে পরিচিত। বাকি ইউনিয়নগুলোতে বিদ্রোহী প্রার্থীকে তিনি সমর্থন দিয়েছেন বলে এলাকার লোকজন বলাবলি করছেন। ফলে সুষ্ঠু নির্বাচন হলে জয়-পরাজয় কোন দিকে মোড় নেয় তা কেউই বলতে পারছেন না।

জানতে চাইলে এমপি স্বপন ভট্টাচার্য বলেন, মনের কষ্ট কারও কাছে শেয়ার করতে পারছি না। সবাই সময় এবং সুযোগের অপেক্ষায়। তিনি বলেন, বঙ্গবন্ধু ও জননেত্রী শেখ হাসিনার নেতৃত্বাধীন আওয়ামী লীগের ঐতিহ্যবাহী নৌকা প্রতীক বিতর্কিত কয়েকজনের কাঁধে তুলে দেয়ায় ইমেজ নষ্ট হয়েছে। তারা এলাকার মানুষের কাছে অনেক বিতর্কিত। বারবার নির্বাচিত এবং জনপ্রিয় চেয়ারম্যানদের বাদ দিয়ে বিতর্কিতদের নৌকা প্রতীক দেয়ায় এলাকার মানুষ ভালোভাবে নেয়নি। এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘দল আমাকে ফিরিয়ে না নিলেও আমার কোনো বিকল্প চিন্তা নেই। এমনকি দলের কোনো ক্ষতি আমার দ্বারা হবে না।’

এদিকে দৃশ্যত জামায়াতের কোনো কার্যক্রম মনিরামপুরে না থাকলেও দলটির ১০ জন স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মাঠে নেমেছেন। তাই বিএনপির ভাগ্যে কি আছে তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন উপজেলা বিএনপির সভাপতি অ্যাডভোকেট শহীদ ইকবাল। তিনি বলেন, জামায়াতের প্রার্থীদের কারণে বিএনপি প্রার্থীদের কিছুটা ক্ষতি হওয়ার আশংকা রয়েছে। কারণ ভোট দুই ভাগ হয়ে যাবে। তারপরও সুষ্ঠু নির্বাচন হলে আমরা অন্তত ১২টি ইউনিয়নে জয়ী হওয়ার আশা করছি।

আরও পড়ুন