সদ্য হয়ে যাওয়া বিএনপির জাতীয় সম্মেলনে খালেদা জিয়া যে রূপকল্প ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করেছেন, তা নিয়ে আগে দলের কোনো ফোরামে আলোচনা হয়নি। দলের নেতাদের মতে, কেবল ক্ষমতায় গিয়েই এ রূপকল্প বাস্তবায়ন সম্ভব। কিন্তু বর্তমান পরিস্থিতিতে জরুরি হলো দলকে সংগঠিত করা। ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনে সাংগঠনিক ও রাজনৈতিক কর্মসূচির বিষয়ে কোনো দিকনির্দেশনা না দিয়ে কেবল ‘ভিশন ২০৩০’ ঘোষণা করায় দলের অনেকে বিস্মিত হয়েছেন।
এ বিষয়ে দলটির বেশ কয়েকজন নেতার সঙ্গে কথা হয়। তাঁরা বলেন, সার্বিকভাবে ষষ্ঠ জাতীয় সম্মেলনের মধ্য দিয়ে দলের নেতা-কর্মীদের মধ্যে একটা প্রাণচাঞ্চল্য এসেছে। বিশেষ করে দীর্ঘদিন পর সম্মেলনকে কেন্দ্র করে রাজধানীতে একটা বড় সমাবেশ হওয়ায় নেতা-কর্মীদের মধ্যে উচ্ছ্বাস দেখা গেছে। তবে ভিশন ২০৩০ সম্পর্কে জানতে চাইলে দলের স্থায়ী কমিটির দুজন সদস্যসহ কয়েকজন কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, বিএনপির চেয়ারপারসন যে এই রূপকল্প ঘোষণা করবেন, তা তাঁরা আগে জানতেন না। দলীয় কোনো ফোরামে এ আলোচনা হয়নি। এমনকি দলের সর্বশেষ স্থায়ী কমিটির সভায়ও এ নিয়ে কিছু বলা হয়নি। সম্মেলনেই তাঁরা প্রথম এ ব্যাপারে জানতে পেরেছেন।
তাঁরা বলেন, দলীয় চেয়ারপারসন কিছু পরামর্শকের সঙ্গে কথা বলে হয়তো এই রূপকল্প তৈরি করেছেন।
এসব নেতা বলেন, এই রূপকল্প বাস্তবায়ন করতে হলে বিএনপিকে সংসদের দুই-তৃতীয়াংশ আসনে জিতে ক্ষমতায় যেতে হবে। তার আগে আন্দোলনের মাধ্যমে শেখ হাসিনার সরকারের পতন ঘটাতে হবে। কারণ, সর্বশেষ শনিবার দলের জাতীয় সম্মেলনের শেষ অধিবেশনেও বিএনপির চেয়ারপারসন বলেছেন, আগামী নির্বাচন হবে ‘হাসিনামুক্ত’। এ অবস্থায় নির্বাচনকালীন নির্দলীয় সরকারের দাবি আদায়ের বিকল্প নেই। কিন্তু ২০১১ থেকে আন্দোলন করেও এই দাবি আদায়ে সফল হতে পারেনি বিএনপি। উল্টো সারা দেশে মামলা ও গ্রেপ্তারের মুখে নেতা-কর্মীরা বিপর্যস্ত। এই পরিস্থিতিতে দলকে সংগঠিত করা এবং পরবর্তী রাজনৈতিক কর্মসূচি বা আন্দোলনের রূপরেখা নিয়ে দিকনির্দেশনা প্রত্যাশিত ছিল। সেটার পরিবর্তে রূপকল্প ঘোষণা করে ভবিষ্যতে ক্ষমতায় গেলে বিএনপি কীভাবে দেশ পরিচালনা করবে, সে বিষয়টি তুলে ধরেন খালেদা জিয়া।
বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ বলেন, পরে বিস্তারিত আলোচনার মাধ্যমে এই রূপরেখা নিয়ে কর্মপরিকল্পনা গ্রহণ করা হবে। এ জন্য দুই-তৃতীয়াংশ আসন পেতে হবে, তা নয়। বিরোধী দলের সঙ্গে আলাপ করেও এসব পরিবর্তন সম্ভব।
রূপকল্প না আন্দোলন আগে—এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য খন্দকার মোশররফ হোসেন বলেন, তাঁদের কাছে অগ্রাধিকার একটি নিরপেক্ষ নির্বাচন আদায়। নিরপেক্ষ নির্বাচন হলে বিএনপি ক্ষমতায় যাবে এবং এসব বাস্তবায়ন করবে। তিনি বলেন, এটি রূপকল্প নয়, এটি বিএনপির অঙ্গীকার। এটি নিয়ে তাঁরা কাজ করছেন। বিএনপির চেয়ারপারসন তাঁদের বলেছেন, ‘ভিশন ২০৩০’ এখনো খসড়া পর্যায়ে। বিস্তারিত পরিকল্পনায় এর বাস্তবায়ন পদ্ধতি ও পরিকল্পনা উল্লেখ থাকবে।
বিএনপির নেতারা বলেছেন, খালেদার রূপকল্পে অনেক বিষয় থাকলেও এর মূল কথা হলো, রাষ্ট্র পরিচালনায় প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনা। এটি কীভাবে বাস্তবায়ন করা হবে, সে ব্যাপারে বিএনপির একটি নিজস্ব চিন্তা আছে। সম্মেলনে সেটা উত্থাপন না করাটা একটা কৌশল। এ নিয়ে আলোচনায় কারও ভিন্নমত থাকলে তা যেন উঠে আসে, সেটি চেয়েছে বিএনপি।
বিএনপির রাজনীতিতে নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এমাজউদ্দীন আহমদ। তিনি বলেন, প্রধানমন্ত্রীর ক্ষমতায় ভারসাম্য আনাটা জরুরি। দ্বিকক্ষবিশিষ্ট সংসদ থাকলে এটি সহজ হবে। নিম্নকক্ষ দলীয় থাকে। ৭০ অনুচ্ছেদের কারণে দলের সাংসদেরা প্রধানমন্ত্রীর মনোভাবের বাইরে কিছু বলতে পারেন না। এ ক্ষেত্রে উচ্চকক্ষ রাখার প্রস্তাব করেছেন খালেদা জিয়া। অর্থাৎ, কোনো আইন দলীয় কারণে যদি নিম্নকক্ষে পাস হয়, সেটা উচ্চকক্ষে প্রশ্নের সম্মুখীন হতে পারে। উচ্চকক্ষ গঠিত হবে সমাজের গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের নিয়ে। নিয়ম হবে, দুই কক্ষ একমত না হলে কোনো আইন হবে না। একইভাবে রাষ্ট্রপতি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানে নিয়োগ দেবেন। এখানে প্রধানমন্ত্রীর কোনো হস্তক্ষেপ থাকবে না।
‘এক নেতা এক পদ’: কাউন্সিল অধিবেশনে ‘এক নেতা এক পদ’ করার সিদ্ধান্ত হয়েছে। এটি সময়োপযোগী বলে উল্লেখ করেছেন দলটির বিভিন্ন স্তরের নেতারা। তাঁরা বলেছেন, কেন্দ্রীয় নেতারা একজন একাধিক পদ আঁকড়ে থাকেন। এতে নেতৃত্ব বিকশিত হতে পারে না। তা ছাড়া, একজন অনেক পদে থাকলে তাঁর পক্ষে সব কাজ ভালোভাবে করাও সম্ভব হয় না।
এ বিষয়ে স্থায়ী কমিটির সদস্য মাহবুবুর রহমান বলেন, এটি একটি ভালো সিদ্ধান্ত। বিগত সময়ে এটি করার চেষ্টা হয়েছিল।
মহাসচিব ঘোষণা না হওয়ায় প্রশ্ন: মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরই বিএনপির পরবর্তী মহাসচিব হচ্ছেন—এটা অনেকটা নিশ্চিত বলে দলের নীতিনির্ধারণী পর্যায়ের কয়েকজন নেতা জানিয়েছেন। কিন্তু তারপরও শনিবার ষষ্ঠ সম্মেলনে মহাসচিব পদে কারও নাম ঘোষণা না করায় দলের মধ্যে নানা আলোচনা হচ্ছে।
চেয়ারপারসন ও সিনিয়র ভাইস চেয়ারম্যান পদের পর দলের তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ পদ মহাসচিব। দলের একাধিক কেন্দ্রীয় নেতা বলেন, অতীতে কোনো জাতীয় সম্মেলনে মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হয়নি। পরে ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু এবার প্রত্যাশা ছিল, কারণে দীর্ঘদিন ভারপ্রাপ্ত মহাসচিব দিয়ে কাজ চলছিল।
বিএনপির নীতিনির্ধারণে ভূমিকা রাখেন এমন একাধিক ব্যক্তি জানান, শিগগিরই দলের স্থায়ী কমিটি ও মহাসচিবের নাম ঘোষণা করা হবে। ১৯ সদস্যের স্থায়ী কমিটির বেশির ভাগ সদস্যই পরবর্তী কমিটিতে থাকছেন। স্থায়ী কমিটির তিনজন সদস্য মারা গেছেন, ওই তিনটি পদ পূরণ করা হবে। এ ছাড়া এক বা দুজন অসুস্থ থাকায় সেই স্থানে নতুনরা আসবেন। নির্বাহী কমিটি পূর্ণাঙ্গ করতে সময় লাগতে পারে।


