কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া কলেজের ইতিহাস বিভাগের সম্মান দ্বিতীয় বর্ষের ছাত্রী ও নাট্যকর্মী সোহাগী জাহান তনু হত্যাকাণ্ডের পাঁচ দিন পেরুলেও আইনশৃঙ্খলা বাহিনী জড়িতদের কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি। তবে জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এক খন্ড খাস জমি শোকাহত পরিবারটিকে প্রদানের ঘোষণা দিয়েছেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন।
তনুর বিদেহী আত্মার মাগফেরাত কামনা করে শোক সন্তপ্ত পরিবারের প্রতি সমবেদনা জ্ঞাপন করার জন্য বৃস্পতিবার সকালে তার পরিবারে কাছে ছুটে যান মুরাদনগর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন ও সহকারি কমিশনার (ভূমি) আজগর আলী। এ সময় জেলা প্রশাসক ও মুরাদনগর উপজেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে দশ হাজার করে বিশ হাজার টাকা তার পরিবারের কাছে হস্তান্তর করেন তারা এবং জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এক খণ্ড খাস জমি শোকাহত পরিবারটিকে প্রদানের ঘোষণা দেন উপজেলা নির্বাহী অফিসার মোহাম্মদ মনসুর উদ্দিন। পরে তনুর কবর জিয়ারত করেন উপজেলা প্রশাসনের কর্মকর্তারা।
এদিকে তনুর খুনিদের বিচার দাবিতে উত্তাল হয়ে উঠছে গোটা কুমিল্লা জেলা। মাঠে নেমে এসেছে ভিক্টোরিয়া কলেজের ৩০হাজার শিক্ষার্থী। বৃহস্পতিবার শিক্ষার্থীরা নগরীর কেন্দ্রস্থল কান্দিরপাড় পূবালী চত্বরে বিক্ষোভ করে। একই সাথে জেলার বিভিন্ন উপজেলায়ও বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। এদিকে সোহাগীর গ্রামের বাড়ি জেলার মুরাদনগর উপজেলার মির্জাপুর গ্রামে চলছে শোকের মাতম। কান্না থামছে না পুরো গ্রামে।
বৃহস্পতিবার বেলা ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত নগরীতে বিক্ষোভ করে শিক্ষার্থীরা। এ সময় নগরীতে যান চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। তাদের সাথে যোগ দেয় কুমিল্লা সরকারি কলেজ, কুমিল্লা সরকারি মহিলা কলেজ, বিভিন্ন শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থী ও সাংস্কৃতিক সংগঠন। পরে তারা জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের নিকট স্মারকলিপি প্রদান করেন।
গত কয়েকদিন ধরে কুমিল্লা জেলা সদরসহ জেলার সর্বত্র ক্ষোভের আগুনে জ্বলছে। সবার একই বক্তব্য অবিলম্বে সোহাগী জাহান তনুর খুনীদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে হবে।
কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারী কলেজের সাবেক অধ্যক্ষ ও বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ প্রফেসর আমীর আলী চৌধুরী বলেন, এটা অত্যন্ত দুঃখজনক ঘটনা। ভিক্টোরিয়া কলেজের দীর্ঘ ইতিহাসে এমন ঘটনা আর ঘটেনি। মাত্র কয়েকদিন আগে নারী দিবস পালন করে নারী মুক্তির ব্যাপারে বিভিন্ন কথা শুনলাম অথচ এর মাত্র ১২ দিনের মাথায় জীবন দিতে হল তনুকে। তিনি অবিলম্বে তনুর হত্যাকারীদের গ্রেফতারের দাবি জানান।
সচেতন নাগরিক কমিটি কুমিল্লার সভাপতি ও বিশিষ্ট মানবাধিকার সংগঠক আলী আকবর মাসুম বলেছেন, তনুর হত্যার মধ্যে দিয়ে প্রমাণ হলো এখন আর আমরা কেউ ঘরে বাহিরে নিরাপদ নই। এখন সময় এসেছে প্রশাসন, রাজনীতিবিদ, নাগরিক সমাজসহ সবাইকে ঐক্যবদ্ধ হয়ে এর পরিত্রাণের উপায় খুঁজে বের করার জন্য নীতি ঠিক করা। নতুবা আজ সোহাগী জাহান তনু কাল আমার মেয়ে বা বোন পরশু আরেক জনেরও একই অবস্থা হবে।
কুমিল্লার বিশিষ্ট নারী নেত্রী দিলনাশী মোহসেন বলেছেন, আর কত তনুদেরকে এভাবে অকালে ঝরে যেতে হবে। আমাদের সমাজ রাষ্ট্রের কি কিছুই করার নেই। আমরা নারী মুক্তির কথা বলি, নারী স্বাধীনতার জয়গান গাই অথচ তনুদের নিথর দেহ পড়ে থাকে রাস্তার ধারে। এখনি যদি এর বিহিত করা না হয় তাহলে আমরা কেউ রক্ষা পাব না।
বৃহস্পতিবার সকালে শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে এসে দুঃখ প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ইমতিয়াজ আহমেদ, কোতয়ালী মডেল থানার ওসি আবদুর রব। তারা দ্রুত অপরাধীদের শনাক্ত করার আশ্বাস দেন।
শিক্ষার্থীদের সাথে সংহতি জানান, সাংস্কৃতিক সংগঠক শহীদুল হক স্বপন, দক্ষিণ জেলা যুবদল সভাপতি আমিরুজ্জামান আমির, দক্ষিণ জেলা ছাত্রদল সভাপতি উৎবাতুল বারী আবু, মহানগর ছাত্রলীগ সভাপতি আবদুল আজিজ সিহানু, ছাত্রলীগ নেতা রোকন উদ্দিন ও শাওন প্রমুখ।
ভিক্টোরিয়া কলেজ থিয়েটারের সাবেক সভাপতি আল-আমিন বলেন, সোহাগী আমাদের সংগঠনের সদস্য ছিলো। তার হত্যার বিচার না হওয়া পর্যন্ত আন্দোলন চলবে। সন্ধ্যায় নগরীর কান্দিরপাড়ে প্রদীপ প্রজ্জ্বলনের মাধ্যমে হত্যাকাণ্ডের প্রতিবাদ জানানো হয়।
বিকালে পূবালী চত্বরে প্রতিবাদী মঞ্চ বিক্ষোভ সমাবেশ করে সোহাগী জাহান তনুর হত্যাকারীদের বিচার দাবি করেন।
নিহতের পরিবারের সূত্র জানায়, গত রোববার সন্ধ্যায় টিউশনি করে বাসায় ফেরার পথে কুমিল্লা সেনানিবাস এলাকায় পাশবিক নির্যাতনের পর হত্যা করা হয় সোহাগী জাহান তনুকে। পরে রাত সাড়ে ১০টার দিকে ময়নামতি সেনানিবাসের অভ্যন্তরে পাওয়ার হাউসের পানির ট্যাংক সংলগ্ন স্থানে সোহাগীর মৃতদেহ পাওয়া যায়। কালভার্টের পাশে ঝোপের ভেতর মাথা থেতলানো সোহাগীর অর্ধনগ্ন মৃতদেহ পড়েছিলো। সোমবার নিহতের বাবা ইয়ার হোসেন কুমিল্লা কোতয়ালী মডেল থানায় অজ্ঞাতদের নামে হত্যা মামলা দায়ের করেন। হত্যাকাণ্ডের চারদিনেও কাউকে গ্রেফতার বা হত্যার রহস্য উদ্ধার করতে পারেনি পুলিশ।
শোকের মাতন তনুর বাড়িতে:
এদিকে, মুরাদনগর উপজেলার বাঙ্গরা পশ্চিম ইউনিয়নের মির্জাপুর গ্রামে নিহত সোহাগী জাহান তনুর বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সোহাগীর বাবা-মা, ভাই-বোনের কান্নায় মুরাদনগরের আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠছে।
সোহাগীর বাবা ইয়ার হোসেন জানান, তনুকে যখন পাই— তখন মাথার পেছন দিকে আঘাতের চিহ্ন ছিল, মুখ দিয়ে রক্ত বের হচ্ছিল। তিনি আরো জানান, পরিবার পরিজন নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছি। তাই আমরা গ্রামের বাড়িতে আশ্রয় নিয়েছি। আমার মেয়ে তনুর হত্যাকাণ্ডের রহস্য উদঘাটন ও খুনিদের গ্রেফতার করে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাচ্ছি।
ঘটনার ৫দিন পেরিয়ে গেলেও এ পর্যন্ত ঘাতকদের শনাক্ত করতে না পারায় পরিবারের সদস্যরা ক্ষোভ প্রকাশ করেন। সোমবার সন্ধ্যায় মির্জাপুর বাজার মোড়ে জানাজা শেষে মির্জাপুর কবরস্থানে তার লাশ দাফন করা হয়।


