ভয়াল পঁচিশে মার্চের সে কালরাত আজ। মুক্তিযুদ্ধ শুরুর মুহূর্তে ১৯৭১ সালের এই পঁচিশে মার্চের কালরাতেই পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশে পৃথিবীর ইতিহাসের ভয়াবহতম গণহত্যা সংঘটিত হয়। সে রাতে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী ঢাকাসহ এ দেশের বড় শহরগুলোতে নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালিয়ে কমপক্ষে ৫০ হাজার ঘুমন্ত বাঙালিকে হত্যা করে। এই মর্মন্তুদ গণহত্যা আজও বিশ্বের মানুষের কাছে ঘৃণ্যতম ও তমসাচ্ছন্ন এক অধ্যায়।
পঁচিশ মার্চের সেই ভয়াল রাতে গণহত্যার নীল নকশা ‘অপারেশন সার্চলাইট’ বাস্তবায়নে পাকিস্তানি হানাদার বাহিনী মেতে উঠেছিল বাঙালি নিধনযজ্ঞে। অন্যদিকে এ নিষ্ঠুরতা ও নির্মমতার বিরুদ্ধে অসম সাহসী বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তুললে মুক্তিযুদ্ধের আনুষ্ঠানিক সূচনাও ঘটে। পাকিস্তানি সেনাদের হাতে গ্রেফতারের আগমূহূর্তে ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দেন।
শুরু হয় বাঙালির সশস্ত্র স্বাধীনতা সংগ্রাম। সারাদেশে ছড়িয়ে পড়ে আন্দোলন-প্রতিরোধের অগি্নস্ফুলিঙ্গ। সাধারণ মানুষের পাশাপাশি হানাদারদের প্রতিরোধে এগিয়ে আসেন সেনা ও পুলিশ
বাহিনীর বাঙালি সদস্যরাও। জাতির অস্তিত্ব রক্ষার এ লড়াইয়ের ধারাবাহিকতায় নয় মাসের রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম আর ৩০ লাখ শহীদের সুমহান আত্মত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর জন্ম নেয় স্বাধীন-সার্বভৌম রাষ্ট্র বাংলাদেশ।
একাত্তরের পঁচিশে মার্চের সকাল থেকেই অজানা আশঙ্কায় দিন কেটেছে বাঙালির। দিনভর অশান্ত উদ্বেল পরিস্থিতি ছিল পুরো দেশজুড়ে। এমনি এক পরিস্থিতিতে একসময় বেতারের প্রচার বন্ধ করে দেওয়া হয়। সরকারি কোনো ঘোষণাও প্রচারিত হয়নি সেদিন। সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত অবধি মিছিল-মিটিং-স্লোগানে মুখরিত প্রাদেশিক রাজধানী ঢাকাবাসীর প্রায় সবাই ঘুমিয়ে পড়েন এক সময়।
নিরীহ-নিরস্ত্র মানুষের কেউই ঘুণাক্ষরে জানতে পারেনি, ততক্ষণে খুলে গেছে নরকের দরজা। রাত সাড়ে ১১টায় ঢাকা ক্যান্টনমেন্ট থেকে প্রথম রাস্তায় নেমে আসে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। তারা প্রথমে ঢাকার রাজারবাগ পুলিশ লাইন এবং পরে একে একে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, ধানমণ্ডি ও পিলখানা পূর্ব পাকিস্তান রাইফেলস (ইপিআর) সদর দপ্তরসহ রাজধানীর সর্বত্র আক্রমণ চালিয়ে নৃশংস হত্যাযজ্ঞ শুরু করে। একই সময়ে তাদের নিধনযজ্ঞ চলে চট্টগ্রামসহ দেশের কয়েকটি বড় শহরেও।
রাজারবাগ পুলিশ সদর দপ্তর পাকিস্তানি সেনাদের সাঁড়াশি আক্রমণের মুখেও বাঙালি পুলিশ সদস্যরা আত্মসমর্পণ করেননি। রাইফেল তাক করে প্রতিরোধ গড়ে তোলেন তারা। কিন্তু শত্রুর ট্যাঙ্ক আর ভারী মেশিনগানের ক্রমাগত গুলির মুখে এক সময় গুঁড়িয়ে যায় সব ব্যারিকেড প্রতিরোধ। গ্যাসোলিন ছিটিয়ে আগুনে ভস্মীভূত করা হয় পুলিশ সদর দপ্তর। সেখান থেকে ঘাতক বাহিনী এগোতে থাকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার দিকে। পরে রাতভর পুরো রাজধানীতেই নিরীহ নিরস্ত্র ঘুমন্ত বাঙালির ওপর পৈশাচিক উন্মত্ততায় ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনারা।
তখনও মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকসহ স্বাধীনতার দাবিতে বাঙালির বিক্ষোভে উত্তাল জনপদের খবর সংগ্রহ করতে ঢাকায় আসা বিদেশি সাংবাদিকরা অবস্থান করছিলেন শাহবাগের হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে (বর্তমান হোটেল শেরাটন)। এ হোটেলের বারোতলায় দেহরক্ষীদের কড়া পাহারায় ঘুমুচ্ছিলেন পাকিস্তানি পিপলস পার্টি প্রধান জুলফিকার আলী ভুট্টো। রাত পৌনে ১২টায় পাকিস্তানি সেনারা হোটেলটি ঘিরে ফেলে কেউ বেরোলেই গুলির নির্দেশ দেয়। এভাবেই বাইরের পৃথিবী থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেওয়া হয় ঢাকাকে।
এর পরপরই রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে নগরজুড়ে ভেসে আসতে শুরু করে পাকিস্তানি সেনাদের ট্যাঙ্ক, মেশিনগান ও রিকয়েললেস রাইফেলের গুলি এবং মর্টারের শব্দ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ইকবাল হল ও জগন্নাথ হলসহ সব হলেই নির্মম হত্যাযজ্ঞ চালায় তারা। পাকিস্তানি হায়েনাদের কবল থেকে রক্ষা পাননি রোকেয়া হলের ছাত্রীরাও। একরাতে তিন শতাধিক ছাত্রছাত্রী শহীদ হন। নৃশংসভাবে শাহাদাত বরণ করতে হয় ড. গোবিন্দ চন্দ্র দেব, ড. জ্যোতির্ময় গুহ ঠাকুরতা, অধ্যাপক সন্তোষ ভট্টাচার্য. ড. মনিরুজ্জামানসহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন বিভাগের নয়জন শিক্ষককে।
মানুষের আর্তনাদে ভারি হয়ে ওঠে আকাশ-বাতাস। মর্মন্তুদ সে আর্তনাদ ছাপিয়ে চারপাশে তখন কেবলই আগুনের লেলিহান শিখা ও ধ্বংসযজ্ঞ। রাত বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে বড় হয়েছে লাশের স্তূপ। এক সময় গোটা নগরীই পরিণত হয় লাশের শহরে। পরে স্তম্ভিত বিশ্ব অবাক হয়ে দেখেছে বর্বর পাকিস্তানি সেনাদের নিষ্ঠুর সে হত্যাযজ্ঞ।
অবশ্য এ পরিস্থিতিতেও রাস্তায় রাস্তায় ব্যারিকেড দিয়ে প্রতিরোধ গড়ে তুলেছিলেন বাঙালি ছাত্র-জনতা। ঢাকার ফার্মগেট থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয় এলাকার চারপাশেই এ প্রতিরোধ ছিল। প্রতিরোধ ছিল চট্টগ্রামেও। কিন্তু রক্তের নেশায় উন্মত্ত পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর নৃশংস বর্বরতার মুখে সেদিন কিছুই করতে পারেনি অকুতোভয় বাঙালি।
এর আগের দিন ২৪ মার্চ প্রেসিডেন্ট হাউসে চলমান মুজিব-ইয়াহিয়া বৈঠকের অংশ হিসেবে আয়োজিত আওয়ামী লীগ ও পাকিস্তান সরকারের উপদেষ্টাপর্যায়ের মধ্যকার বৈঠকও কার্যত ব্যর্থতায় পর্যবসিত হয়। বৈঠক শেষে সেদিন বিকেলেই পশ্চিম পাকিস্তানের অধিকাংশ নেতাই পিআইএর একটি ফ্লাইটে ঢাকা ত্যাগ করেন। আলোচনার নামে ধূর্ত পাকিস্তানিরা যে কোনো ষড়যন্ত্রের জাল বুনছিল, তা বোঝা যাচ্ছিল কয়েকদিন ধরেই। ২৫ মার্চ মধ্যরাতে সে নীলনকশা স্পষ্ট হয়ে ওঠে।
মুক্তিযুদ্ধের উত্তাল দিনগুলোতে গোটা বাংলাদেশই হয়ে উঠেছিল বধ্যভূমি। নৃশংস ও বর্বরোচিত এ হত্যাযজ্ঞে পাকিস্তানি সেনাদের সঙ্গে যোগ দিয়েছিল তাদের এ দেশীয় দোসর ঘাতক দালাল রাজাকার, আলবদর ও আলশামস বাহিনীর সদস্যরা।
জাতি আজ গভীর শ্রদ্ধার সঙ্গে স্মরণ করবে পঁচিশে মার্চের কালরাতে নির্মম হত্যাযজ্ঞের শিকার সব মানুষকে। রাজধানীতে বিভিন্ন রাজনৈতিক-সামাজিক-সাংস্কৃতিক ও পেশাজীবী সংগঠন ‘কালরাত্রি’ স্মরণে নানা কর্মসূচি হাতে নিয়েছে। এর আগে ২৫ মার্চের প্রথম প্রহর গতকাল বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে মোমবাতি প্রজ্বালনের মধ্য দিয়ে গণহত্যার শিকার মানুষগুলোকে স্মরণ করেছে বিভিন্ন দল ও সংগঠন। আজ শুক্রবার দিনভর থাকছে আলোচনা সভা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, আলোকচিত্র প্রদর্শন, বইমেলা প্রভৃতি।


