বাঙালির স্বাধীন দেশ হিসেবে ৪৫ বছরে পা রাখলো বাংলাদেশ। ২৬ মার্চ। আজ স্বাধীনতা দিবস।
তেইশ বছরের শোষণ থেকে বাঙালির মুক্তির আন্দোলনের শ্বাসরোধ করতে ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চ রাতে এ দেশের নিরস্ত্র মানুষের ওপর ঝাঁপিয়ে পড়ে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। ‘অপারেশন সার্চলাইট’ নামের সেই অভিযানে কালরাতের প্রথম প্রহরে ঢাকায় চালানো হয় গণহত্যা।
২৬ মার্চ প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি বাহিনীর হাতে গ্রেপ্তার হওয়ার আগে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে যান।
অবশ্য তার আগেই ৭ মার্চ ঢাকার তৎকালীন রেসকোর্স ময়দানে এক জনসভায় বাঙালির অবিসংবাদিত এই নেতা বলেন, “এবারের সংগ্রাম আমাদের মুক্তির সংগ্রাম- এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।”
কার্যত সেটাই ছিল বাংলাদেশের স্বাধীনতার ঘোষণা, যার পথ ধরে কালরাতের পর শুরু হয় বাঙালির প্রতিরোধ পর্ব।
নয় মাসের যুদ্ধে ত্রিশ লাখ শহীদের আত্মদান, আড়াই লাখ মা-বোনের সম্ভ্রমহানি এবং জাতির অসাধারণ ত্যাগের বিনিময়ে ১৬ ডিসেম্বর অর্জিত হয় চূড়ান্ত বিজয়। বিশ্বের মানচিত্রে বাংলাদেশ নামের একটি স্বাধীন সার্বভৌম রাষ্ট্রের অভ্যুদয় ঘটে।
শনিবার স্বাধীনতা দিবসে বাঙালি জাতি গভীর শ্রদ্ধায় স্মরণ করবে মুক্তিযুদ্ধের বীর শহীদদের। সাধারণ ছুটির দিনে সরকারি-বেসরকারি পর্যায়ে নানা অনুষ্ঠানে পালিত হবে গৌরবের সেই দিন।
ঢাকায় ভোরে ৩১ বার তোপধ্বনির মাধ্যমে দিবসের আনুষ্ঠানিক সূচনার পর সূর্যোদয়ের সঙ্গে সঙ্গে রাষ্ট্রপতি আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা জাতীয় স্মৃতিসৌধে ফুল দেবেন।
প্রতি বছরের মতো এবারো রাজনৈতিক, সামাজিক, সাংস্কৃতিক সংগঠন আর সর্বস্তরের মানুষের শ্রদ্ধার ফুলে ফুলে ভরে উঠবে সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধ।
স্মৃতিসৌধের আনুষ্ঠানিকতার পর বঙ্গবন্ধু জাতীয় স্টেডিয়ামে হবে শিশু-কিশোর সমাবেশ। প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা এতে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত থাকবেন।
‘কার্যকর হবে বুদ্ধিজীবী হত্যার বিচারের রায়’
রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ দেশবাসী ও ও প্রবাসে বসবাসরত বাংলাদেশিদের স্বাধীনতা ও জাতীয় দিবসের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন।
এক বাণীতে তিনি বলেন, স্বাধীনতার মূল লক্ষ্য অর্জনে আমাদের আরও অনেক দূর যেতে হবে। এজন্য প্রয়োজন দলমত নির্বিশেষে সকলের আন্তরিক ও ঐক্যবদ্ধ প্রয়াস।
“সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি আমাদের ঐতিহ্য। এ দেশের জনগণ জঙ্গিবাদ, সন্ত্রাসবাদসহ কোনো ধরনের সহিংসতা সমর্থন করে না। তারা সবসময় শান্তি ও সহাবস্থানের পক্ষে।
“গণতন্ত্র বিকাশের পূর্বশর্ত হলো গণতান্ত্রিক রীতি-নীতির অব্যাহত চর্চা, পরমতসহিষ্ণুতা এবং পারস্পরিক শ্রদ্ধাবোধ। এ জন্য জাতীয় জীবনে আমাদের আরও ধৈর্য, সংযম ও সহনশীলতার পরিচয় দিতে হবে। অন্যের মতামতের প্রতি শ্রদ্ধাশীল থাকতে হবে। মুক্তিযুদ্ধের অবিনাশী চেতনা ও অসাম্প্রদায়িক মূল্যবোধকে জাগ্রত করতে হবে।”
দেশের সামগ্রিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক অগ্রযাত্রাকে আরও বেগবান করতে সকলকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করার আহ্বান জানান তিনি।
স্বাধীনতা দিবস উপলক্ষে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা তার বাণীতে জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমান, মুক্তিযুদ্ধের শহীদ, সম্ভ্রমহারা মা-বোন, এবং জাতীয় চার নেতাসহ সকল মুক্তিযোদ্ধার প্রতি শ্রদ্ধা জানিয়েছেন।
তিনি বলেছেন, “লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে অর্জিত স্বাধীনতা বাঙালি জাতির শ্রেষ্ঠ অর্জন। এই অর্জনকে অর্থপূর্ণ করতে সবাইকে মুক্তিযুদ্ধের প্রকৃত ইতিহাস জানতে হবে, স্বাধীনতার চেতনাকে ধারণ করতে হবে। প্রজন্ম থেকে প্রজন্মান্তরে পৌঁছে দিতে হবে।”
একাত্তরের মানবতাবিরোধী যুদ্ধাপরাধীদের বিচারের রায় কার্যকর শুরুর কথা উল্লেখ করে সরকারপ্রধান বলেন, বুদ্ধিজীবী হত্যাকারীদের বিচারের রায়ও কার্যকর হবে।
“স্বাধীনতাবিরোধী সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠী এবং গণতন্ত্রবিরোধী অপশক্তি এখনও দেশের গণতন্ত্র ও সরকারের অব্যাহত উন্নয়নের ধারা বানচাল করতে ষড়যন্ত্রে লিপ্ত রয়েছে। এ সকল অপশক্তির যে কোনো অপতৎপরতা ঐক্যবদ্ধভাবে মোকাবিলা করার জন্য আজকের এ দিনে আমি দেশবাসীর প্রতি আহ্বান জানাই।”
দিনের কর্মসূচি
স্বাধীনতা দিবস উপলেক্ষে ঢাকা ও দেশের বিভিন্ন শহরের প্রধান সড়ক ও সড়কদ্বীপগুলো ইতোমধ্যে সাজানো হয়েছে জাতীয় পতাকা ও অন্যান্য পতাকায়। বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবন ও স্থাপনায় আগের রাতেই আলোকসজ্জা করা হয়েছে।
শনিবার সকালে সকল সরকারি, আধা সরকারি, স্বায়ত্তশাসিত ও বেসরকারি ভবনে উত্তোলন করা হবে জাতীয় পতাকা।
দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে এদিন সংবাদপত্রগুলো বিশেষ ক্রোড়পত্র প্রকাশ করবে এবং বিশেষ নিবন্ধ, সাহিত্য সাময়িকী প্রকাশ করবে। বিটিভি, বাংলাদেশ বেতার, বেসরকারি বেতার/টিভি চ্যানেলগুলো প্রচার করবে বিভিন্ন অনুষ্ঠানমালা।
মুক্তিযুদ্ধ বিষয়ক মন্ত্রণালয়, সংস্কৃতি বিষয়ক মন্ত্রণালয় স্বাধীনতা ও মুক্তিযুদ্ধ সম্পর্কিত সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, সংবর্ধনা অনুষ্ঠান ও আলোচনা অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হবে।
প্রতিচ্ছবি ও প্রামাণ্যচিত্রে বঙ্গবন্ধুর স্বাধীনতার ডাক থেকে আজকের বাংলাদেশের পথপরিক্রমা তুলে ধরতে পরিকল্পনা মন্ত্রণালয়ের উদ্যোগে শুক্রবার সন্ধ্যায় জাতীয় সংসদের দক্ষিণ প্লাজায় শুরু হয়েছে দুই দিনের থ্রিডি ভিডিও ম্যাপিং ‘সময় এখন আমাদের, সময় এখন বাংলাদেশের’।
মুক্তিযুদ্ধের স্মৃতি স্মরণে স্বাধীনতা দিবসে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর আয়োজন করেছে ৩৬ মাইল পদযাত্রার। ভোরে কেন্দ্রীয় শহীদ মিনার থেকে শুরু হয়ে সন্ধ্যায় সাভারের জাতীয় স্মৃতিসৌধে পৌঁছাবে এই পদযাত্রা।
দেশের সব শিশু পার্ক, চিড়িয়াখানা, জাতীয় জাদুঘর, মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘর এদিন সবার জন্য উন্মুক্ত থাকবে। সব ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানে হবে দেশের শান্তি ও অগ্রগতি কামনায় বিশেষ দোয়া ও উপাসনার আয়োজন।
মুক্তিযোদ্ধা কেন্দ্র, হাসপাতাল, জেলখানা, সরকারি শিশুসদনসহ অনুরূপ প্রতিষ্ঠানে উন্নতমানের খাবার পরিবেশন করা হবে।
জেলা ও উপজেলা পর্যায়ে এবং বিদেশে অবস্থিত বাংলাদেশ দূতাবাসেও দিবসের তাৎপর্য তুলে ধরে বিভিন্ন কর্মসূচি গ্রহণ করা হয়েছে।


