শুক্রবার ৬ নভেম্বর ২০২৬

মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে হিন্দু বাড়িতে হামলা: আসামী ১৫

Sylhet-Hamla2জমি সংক্রান্ত বিরোধের জের ধরে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুরের ঘটনা ঘটেছে। এসময় ওই বাড়ির নারী ও শিশুকে মারধর করারও অভিযোগ ওঠেছে।

শনিবার রাতে সিলেটের গোলাপগঞ্জ উপজেলার বারকোট গ্রামে এ ঘটনা ঘটে। বাড়িঘরে হামলা ও মারধরের ঘটনায় রোববার গোলাপগঞ্জ থানায় ১৫ জনকে আসামী করে একটি মামলা দায়ের করা হয়েছে।

শনিবার রাতের এ ঘটনায় রবিবার গোলাপগঞ্জ থানায় ১৫ জনের নাম উল্লেখ করে মামলা দায়ের হলেও সোমবার পর্যন্ত এ ঘটনায় কাউকে গ্রেফতার করতে পারেনি পুলিশ।

এ ঘটনায় এলাকায় উত্তেজনা বিরাজ করছে। বিশেষত হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। পরিস্থিতি মোকাবেলা পুলিশ তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেয়নি বলে অভিযোগ ওঠেছে। তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে গোলাপগঞ্জ থানার ওসি জানিয়েছেন, পরিস্থিতি এখন নিয়ন্ত্রণে রয়েছে।

ওসি বলেন, ঘটনাটি খুবই স্পর্শকাতর। আমি ও উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ঘটনাস্থল পরিদর্শন করেছি। পরিস্থিতি এখন শান্ত রয়েছে।

স্থানীয় সূত্রে জানা যায়, বারকোট এলাকার বাসিন্দা নগেন্দ্র দেবের ছেলে রিপন দেবর সাথে প্রতিবেশি আকবর আলী গংয়ের দীর্ঘদিন ধরে জমিসংক্রান্ত বিরোধ চলছিলো। এনিয়ে আদালতে মামলাও চলমান রয়েছে।

এই বিরোধের জের ধরে শনিবার বিকেলে দু’পক্ষের মধ্যে কথা কাটাকাটি ও হাতাহাতির ঘটনা ঘটে।

এরপর রাতে এশার নামাজের পর স্থানীয় মসজিদে আকবর আলী পক্ষ এ নিয়ে মিটিং করে। মিটিংয়ের পর মাইকে ঘোষণা দিয়ে রিপন দেবের বাড়িতে হামলা চালায় স্থানীয় বাসিন্দারা। হামলা চালিয়ে তার ঘরে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়।

গোলাপগঞ্জ উপজেলা হিন্দু বৌদ্ধ খৃষ্টান ঐক্য পরিষদের আহ্বায়ক কাজল দাশ বলেন, মসজিদের মাইকে হামলার ঘোষণা দেওয়ার পর রিপন দেব ভয়ে বাড়ি থেকে পালিয়ে যান। এরপর হামলাকারীরা বাড়িতে ঢুকে তাঁর স্ত্রী ও শিশু সন্তানকে মারধর করে।

তিনি বলেন, মাইকে হামলার ঘোষণার দেওয়ার পর রিপন দেব মোবাইল ফোনে পুলিশকে এ খবর জানালেও পুলিশ তাৎক্ষণিক কোনো ব্যবস্থা নেয়নি।

কাজল বলেন, রোববার সকালে আমরা ঘটনাস্থলে গিয়ে অগ্নিসংযোগকৃত বাড়ির ধ্বংসস্তূপ দেখতে পাই। এসময় হামলায় আহত নারী ও শিশুর জন্য শুকনো খাবারেরও ব্যবস্থা করি।

অপরদিকে আকবর আলী পক্ষের লোকজনের অভিযোগ, রিপন দেব শনিবার মসজিদের ভেতরে ঢুকে তাদের মারধর করেন। এই ঘটনায় এলাকার লোকজন বিক্ষুব্ধ হয়ে তার বাড়িতে হামলা চালায়।

এ ব্যাপারে গোলাপগঞ্জ থানার ওসি ফজলুল হক শিবলী বলেন, রিপন দেবের বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও ভাংচুর করা হয়েছে। তারা অনেক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এ ব্যাপারে ১৫ জনকে আসামী করে রিপনের বাবা নগেন্দ্র দেব একটি মামলা দায়ের করেছেন। তবে এখন পর্যন্ত কাউকে গ্রেফতার করা হয়নি।

তিনি বলেন, প্রতিপক্ষের অভিযোগ, রিপন মসজিদে ঢুকে তাদের মারধর করেছেন।

ঘটনার বর্ণনা দিয়ে স্থানীয় ইউপি সদস্য মকদিল আলী বলেন, সন্ধ্যার পর মসজিদের মাইকে এলাকার সবাইকে জড়ো হতে বলা হয়। এতে আড়াই থেকে তিনশ’ লোক জড়ো হন। আমিও যাই। গিয়ে শুনি লিপন দেব মসজিদে ঢিল ছুঁড়েছে ও নামাজ পড়তে আসা এক ব্যক্তিকে মারতে চেয়েছে। এসময় আমি বিষয়টি থানা পুলিশকে জানাতে বলি। কিন্তু কেউ আমার কথা শুনেনি। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে আমি সাথেসাথেই গোলাপগঞ্জ থানার ওসিকে ফোনে বিষয়টি জানাই। তবে পুলিশ আসার আগেই লিপনের বাড়িতে ভাংচুর করে উত্তেজিত জনতা।

Sylhet-Hamlaমসজিদে ঢিল ছোড়ার অভিযোগ প্রসঙ্গে লিপন চন্দ্র দেবের স্ত্রী সঞ্জু রানী দেব বলেন, স্থানীয় আকবর আলীর সাথে আমাদের জমি সংক্রান্ত বিরোধ রয়েছে। শনিবার বিকেলে এই বিরোধকে কেন্দ্র করে আকবর আলী ও আমার স্বামীর মধ্যে ঢিল ছোঁড়াছুড়ি হয়। উপস্থিত স্থানীয় বাসিন্দারা এসময়ে উভয় পক্ষকে নিবৃত করলে যে যার ঘরে চলে যায়। কিছুক্ষণ পরে এই ঢিল ছুড়াকে পার্শ্ববর্তী মসজিদের দিকে ঢিল ছুড়া হয়েছে বলে এলাকায় প্রচার করে আকবরের সঙ্গীরা।

শনিবারের ঘটনার বর্ণনা দিয়ে লিপন দেবের বিরোধী পক্ষ অটোরিকশা চালক আকবর বলেন, বিকেলে আমি নামাজ পড়তে মসজিদে এসেছিলাম। এসময় লিপন মসজিদের ভেতরেই দা নিয়ে আমাকে মারতে আসে। এসময় আরো দু’জন মুসল্লি এগিয়ে এসে আমাকে রক্ষা করেন। লিপনের সাথে ধস্তাধস্তিতে তারাও আহত হন।

আকবর আলী বলেন, লিপন আমাকে মারতে না পেরে মসজিদে ঢিল ছুড়তে থাকে। এতে এলাকাবাসী ক্ষুব্ধ হয়ে রাতে মসজিদের মাইকে ঘোষণা দিয়ে সবাইকে জড়ো করেন। এসময় আলাপ আলোচনার এক পর্যায়ে কিছু উত্তেজিত জনতা লিপনের বাড়িতে হামলা চালিয়ে ভাংচুর করে।

তবে এসময় অগ্নিসংযোগের কোনো ঘটনা ঘটেনি দাবি করে আকবর আলী বলেন, লিপন এবং তাঁর স্ত্রীই কাঠখড় জড়ো করে নিজেদের ঘরে আগুন লাগিয়ে দেয়।

এ ব্যাপারে লিপন দেব বলেন, গত বৃহস্পতিবার আকবর আলী আমার উপর হামলা চালায়। শনিবার বিকেলে পুনরায় সে আমার উপর ঢিল ছুঁড়ে। এসময় আমিও তাঁর উপর ঢিল ছুঁড়ি। এ-ঘটনাকে মসজিদে ঢিল ছুঁড়েছি বলে প্রচার করে আকবর আলী ও তাঁর লোকজন।

আরও পড়ুন