‘শপথ লঙ্ঘনের শাস্তি কি?’ দুই মন্ত্রীর আদালত অবমাননার শুনানির একপর্যায়ে আপিল বিভাগ গত ২১শে মার্চ এই প্রশ্ন তুলেছিলেন। গতকাল আইন ও বিচারমন্ত্রী আনিসুল হক দাবি করেছেন যে, ‘দুই দণ্ডিত মন্ত্রী শপথ ভঙ্গ করেননি। সংবিধান লঙ্ঘন হয়নি।’ অনেকেই এই মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছেন। তারা স্মরণ করছেন যে, এর আগে শুনানিকালে আপিল বিভাগ বলেছেন, দুই মন্ত্রীর মন্তব্যে সংবিধানের লঙ্ঘন ঘটেছে। বিচারকে বাধাগ্রস্ত করা হয়েছে। আইন বিশ্লেষকরা বলছেন, সংবিধান লঙ্ঘন আর শপথের লঙ্ঘনকে আলাদা করা যাবে না। কারণ বিচার বিভাগের স্বাধীনতা সংবিধানের মৌলিক কাঠামো। আর মন্ত্রীরা সংবিধান রক্ষণ, সমর্থন ও নিরাপত্তাবিধানের শপথ নেন।
অনেক পর্যবেক্ষক প্রশ্ন তুলেছেন, আইনমন্ত্রীর এই দাবি ঠিক হলে এর আগে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা যা বলেছেন তার ই বা তাৎপর্য কি হবে? শপথ বা সংবিধান লঙ্ঘনের কোনো ঘটনাই যদি না ঘটে থাকে, তাহলে প্রধানমন্ত্রী নিজেই কেন উষ্মা প্রকাশ করলেন। আর আদালত অবমাননার দায়ে দোষী সাব্যস্ত হওয়ার মানে তাহলে আমজনতা কি বুঝবেন? কি করে তারা বুঝবেন যে, দুই মন্ত্রীর শপথ ঠিক আছে, আবার আদালত অবমাননার দায়ে দণ্ডিত হয়েছেন সেটাও ঠিক আছে। এই দুটি পরস্পরবিরোধী বিষয় একসঙ্গে ঠিক হয় কী করে?
আদালত অবমাননা অনেক প্রকারের আছে। পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ গিলানি আদালতের আদেশ অমান্য করেছিলেন। তাঁকে বলা হয়েছিল সুইস কোর্টে প্রেসিডেন্ট আসিফ জারদারির বিরুদ্ধে চালু থাকা বিচারাধীন মামলার শুনানি পুনরায় শুরু করতে। সেই আদেশ তিনি তামিল করেননি, কিন্তু তর্ক সত্ত্বেও তার একটা যুক্তি ছিল। কারণ পাকিস্তানের সেই বিধান বাংলাদেশ সংবিধানেও আছে যে, কর্মরত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে কোনো ফৌজদারি প্রসিডিংস চলবে না। কিন্তু সেসব বিধান থাকা সত্ত্বেও পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী আদালতের মর্যাদা ক্ষুণ্ন হয়, প্রকাশ্যে এমন কোনো মন্তব্য করেননি। তার পক্ষে পাকিস্তানের অ্যাটর্নি জেনারেল বলেছেনও যে, সব ধরনের আদালত অবমাননাই কিন্তু শপথ ভঙ্গের কারণ সৃষ্টি করে না। কারণ প্রধানমন্ত্রী নিজেও সংবিধান রক্ষার শপথ নিয়েছিলেন, আর সেই সংবিধানে স্পষ্ট লেখা ছিল যে, কর্মরত প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে ফৌজদারি মামলা চালু করা যাবে না। সেকারণে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রীর শপথ রক্ষা করার প্রচেষ্টা বা তার যা দাবি সেটা কিন্তু বিশেষজ্ঞরা এককথায় নাকচ করে দেননি।
অদ্ভুত ব্যাপার হলো, তিন সদস্যের পাকিস্তান সুপ্রিম কোর্ট বেঞ্চ, যার আদেশে প্রধানমন্ত্রী অপসারিত হলেন, তারাও কিন্তু স্বীকার করেন যে, পার্থক্য একটা আছে। সব আদালত অবমাননাই গর্হিত নয়। বা আদালতকে ‘রিডিকুল’ বা হাস্যকর করে তোলার প্রচেষ্টা নেই। সেখানে আসিফের বিরুদ্ধে সুইস কোর্টে শুনানি না করতে দিতে পিপিপির একটি দলীয় সিদ্ধান্তও ছিল। হয়তো সেকারণে ৩ সদস্যের বেঞ্চ আরও মনে করিয়ে দিয়েছেন যে, তাকে এক মিনিটের জন্য দণ্ডিত করে প্রথম যে ৭ সদস্যের বেঞ্চ রায় দিয়েছিলেন, তারা কিন্তু প্রধানমন্ত্রীর বিরুদ্ধে আদালতকে ‘রিডিকুল’ করার অভিযোগ তুলেননি। তিন সদস্যের বেঞ্চ বরং বারবার একথা স্মরণ করিয়ে দিয়েছে যে, প্রধানমন্ত্রীর উচিত ছিল রায় হওয়া মাত্রই তার বিরুদ্ধে আপিল করা।
তারা আপিলের শুনানিতে এসব যুক্তিতর্ক তুলে ধরতে পারত। কিন্তু প্রধানমন্ত্রী আপিল না করার ফলে এখন সেই রায়টি ‘ফাইনালিটি’ বা চূড়ান্ত রূপ নিয়েছে। আর তদুপরি লক্ষণীয় যে, এরপরেও ইউসুফ গিলানি কেন আদালতের আদেশ অমান্য করেছেন সেজন্য তার শপথ লঙ্ঘন ঘটেছে বলেই গণ্য করা হয়। সুতরাং প্রধান বিচারপতি যেহেতু প্রশ্নটি তুলেছিলেন, তাই এই বিষয়ে আদালতের কোনো অভিমত বা অবিটার ডিকটা পূর্ণাঙ্গ রায়ে মেলে কিনা, সেটা একটা দেখার বিষয়। কিন্তু আইনমন্ত্রী গতকাল বলে দিয়েছেন যে, শপথের লঙ্ঘন নেই। সংবিধানের লঙ্ঘন নেই।
কিন্তু বাংলাদেশে দুই মন্ত্রী বিচারাধীন মামলা সম্পর্কে যা বলেছেন, সে বিষয়ে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম নিজেই বলেছেন যে, এটা সংবিধান সম্মত হয়নি। অ্যাটর্নি জেনারেল বোধগম্য সংবেদনশীলতা বজায় রেখেই যে মন্তব্য করেছেন তাতে এটা পরিষ্কার যে, রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ আইন কর্মকর্তা মনে করেন দুই মন্ত্রী সংবিধানের লঙ্ঘন ঘটিয়েছেন।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা সাফ বলে দিয়েছেন যে, মীর কাসেম আলীর মামলার বিষয়ে দুই মন্ত্রী যা বলেছেন তা সরকারের বক্তব্য নয়। প্রধানমন্ত্রী এবং অ্যাটর্নি জেনারেল ছাড়াও সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের জনসমক্ষে পরিষ্কার করেছেন যে, দুই মন্ত্রী যা বলেছেন তা সমীচীন হয়নি। তাই পর্যবেক্ষকদের অনেকেই প্রশ্ন তুলছেন যে, এতকিছু করার পরেও যদি মন্ত্রীদের শপথ ভঙ্গ না ঘটে তাহলে আর কিসে শপথ ভঙ্গ হবে।
উল্লেখ্য যে, মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে সরকারি কর্মকর্তা এবং কংগ্রেস সদস্যদের জন্য ‘ওথ অব অফিস’ লঙ্ঘনের বিরাট শাস্তি ধার্য আছে। শপথ লঙ্ঘন একটি ফেডারেল অপরাধ। ১৯১৮ সালের আইনে কেবল যে অফিস থেকে অপসারণ তাই নয়, জেল ও জরিমানা দুটোই আছে।


