দশম সংসদ নির্বাচনের পর আন্দোলন ও অন্য নির্বাচনে যখন বিএনপি খাবি খাচ্ছে, তখন মহাসচিবের দায়িত্ব পেলেন রাজনৈতিক পরিমণ্ডলে সজ্জন ব্যক্তি হিসেবে পরিচিত ফখরুল, ৬৮ বছর বয়সে যাকে নানা অসুস্থতার সঙ্গেও যুদ্ধ করতে হচ্ছে।
মধ্য ডানপন্থি দল থেকে ক্রমে আরও ডানে ঝুঁকে পড়া বিএনপির মহাসচিব পদে বসাতে আবার বাম রাজনীতি থেকে উঠে আসা একজনকেই বেছে নিলেন দলের চেয়াপারসন খালেদা জিয়া।
ষষ্ঠ কাউন্সিলের ১১ দিন পর বুধবার বিএনপির নতুন মহাসচিব হিসেবে মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীরের নাম ঘোষণা করা হয়, যিনি গত পাঁচ বছর ধরে ভারপ্রাপ্ত হিসেবে এই দায়িত্ব পালন করে আসছিলেন।
বিশ্ববিদ্যালয় জীবনে বাম ধারার সংগঠন ছাত্র ইউনিয়ন করে আসা ফখরুলের আগে যিনি বিএনপির মহাসচিব ছিলেন সেই খোন্দকার দেলোয়ার হোসেনও একই সংগঠন করতেন।
ন্যাপ ভাসানী হয়ে বিএনপিতে এসেছিলেন দেলোয়ার। ২০১১ সালে তার মৃত্যুর পর থেকে ভারপ্রাপ্ত মহাসচিবের দায়িত্বে ছিলেন ফখরুল।
জরুরি অবস্থার সময় ২০০৭ সালে সংস্কারপন্থি আবদুল মান্নান ভূইয়াকে বহিষ্কার করে দেলোয়ারকে মহাসচিব পদে এনেছিলেন খালেদা। পরে কাউন্সিলে দেলোয়ার পদটিতে স্থায়ী হন।
দেলোয়ারের মতো মান্নান ভূইয়াও ছিলেন ন্যাপ ভাসানী থেকে আসা। ছাত্রজীবনে তিনিও ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় নেতা ছিলেন। মওলানা ভাসানীর দলেও ছিলেন নেতৃস্থানীয়।
মান্নান ভূঁইয়া, দেলোয়ার, ফখরুল- ষাটের দশকে এই তিনজনই ছিলেন ছাত্র ইউনিয়নের চীনপন্থি অংশো, যার নেতৃত্বে ছিলেন বর্তমান আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন সরকারের মন্ত্রী রাশেদ খান মেনন।
চীনপন্থি বামদের আধিক্য যেমন বিএনপিতে, তেমনি মস্কোপন্থি বামদের আধিক্য রয়েছে আওয়ামী লীগে। ছাত্র ইউনিয়নের মস্কোপন্থি অংশের নেতা মতিয়া চৌধুরীও বর্তমান মন্ত্রিসভায় মেননের সঙ্গী।
সেনাপ্রধান থেকে রাষ্ট্রক্ষমতা দখলের পর জিয়াউর রহমান ১৯৭৮ সালে বিএনপি গঠনের পর মহাসচিব পদে এনেছিলেন আওয়ামী লীগ পরিবারের সদস্য এ কিউ এম বদরুদ্দোজা চৌধুরীকে। চিকিৎসক থেকে সেটাই তার রাজনীতিতে প্রবেশ।
দীর্ঘ সময় বিএনপিতে থাকার পর দলটি তাকে দেশের রাষ্ট্রপতি পদেও বসিয়েছিল। পরে খালেদার বিরাগভাজন হয়ে রাষ্ট্রপতির পদ ছাড়ার পর বিএনপি ছেড়ে বিকল্প ধারা গঠন করেন বদরুদ্দোজা। বর্তমানে দলটি বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটে না থাকলেও তাদের অনুসরণ করে চলে।
জিয়ার মৃত্যুর পর বিএনপির হাল ধরে খালেদা ১৯৮৬ সালে বদরুদ্দোজাকে সরিয়ে অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তা মুস্তাফিজুর রহমানকে মহাসচিবের দায়িত্বে এনেছিলেন।
পরের বছর মহাসচিব করেন আওয়ামী লীগ থেকে আসা রাজনীতিক কে এম ওবায়েদুর রহমানকে।
১৯৮৮ সালে ওবায়েদকে বহিষ্কারের পর ব্যারিস্টার আবদুস সালাম তালুকদারকে মহাসচিব করেন খালেদা।
ওবায়েদ আলাদা বিএনপি গঠন করে হালে পানি না পেয়ে বিএনপিতে আবার ফিরেছিলেন। তার মেয়ে শামা ওবায়েদ এখন দলটিতে সক্রিয়।
১৯৯৬ সালের সাধারণ নির্বাচনে বিএনপির ভরাডুবির পর সালাম তালুকদার পদত্যাগ করলে মহাসচিব পদে আসেন মান্নান ভূইয়া।
মূলত ডান ও চীনা বামদের নিয়ে জিয়া যে বিএনপি গঠন করেন, তা মধ্য ডানপন্থি দল হিসেবেই পরিচিতি পায়। তবে গত এক দশকে দলটির আরও ডানে ঘেঁষা নজরে এসেছে রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।
বর্তমানে বিএনপি যে জোটটির নেত্বত্ব দিচ্ছে, তার প্রায় সব দলটি ডানপন্থি। তাদের মধ্যে কট্টর ডানপন্থি দলও রয়েছে। বামপন্থি হিসেবে যে একটি দল এই জোটে রয়েছে, তার তৎপরতা নেই বললেই চলে।
বিএনপিকে আরও ডানে সরিয়ে নেওয়ার তৎপরতার বিপরীতে যে অংশটি রয়েছে, তাদের একজন ধরা হয় নতুন মহাসচিব ফখরুলকে।
১৯৬৬-৬৭ সালে ছাত্র ইউনিয়নের ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখার সভাপতি ফখরুল পরে মেনন সমর্থক ছাত্র ইউনিয়নের কেন্দ্রীয় যুগ্ম সাধারণ সম্পাদকও ছিলেন।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে অর্থনীতিতে স্নাতকোত্তর ডিগ্রি নিয়ে শিক্ষকতাকে পেশা হিসেবে বেছে নিলেও বেশ পরে রাজনীতিতে আসেন তিনি।
ফখরুলের স্ত্রী রাহাত আরা একটি বেসরকারি বীমা কোম্পানির কর্মকর্তা। দুই মেয়ে, বড় জন অস্ট্রেলিয়ার সিডনির একটি বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা করেন।
স্বাধীনতার আগে থেকে শিক্ষকতায় থাকা ফখরুল ঢাকা কলেজ, দিনাজপুর সরকারি কলেজে অধ্যাপনার পর সত্তরের দশকের শেষ দিকে জাতিসংঘের সহযোগী সংস্থা ইউনেস্কোতে কয়েক বছর চাকরি করেছিলেন।
জিয়ার আমলের মৎস্য ও পানিসম্পদমন্ত্রী এস এ বারী এটির একান্ত হিসেবে কাজ করেছিলেন ফখরুল। জিয়ার মৃত্যুর পর আবার শিক্ষকতায় ফিরে যান ঠাকুরগাঁও কলেজে। এইচ এম এরশাদের শাসনামলে ১৯৮৪ সালে শিক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক হিসেবে কাজ করেন তিনি।
১৯৮৮ সালে সরকারি চাকরি থেকে ইস্তফা দিয়ে বিএনপিকে যুক্ত হয়ে ঠাকুরগাঁও পৌরসভায় চেয়ারম্যান নির্বাচিত হন ফখরুল। তার বাবা মির্জা রুহুল আমিন (চখা মিয়া) একাত্তরে শান্তি কমিটির সদস্য ছিলেন, পরে এরশাদ আমলে মন্ত্রী হন।
২০০১ সালের সংসদ নির্বাচনে ঠাকুরগাঁও-১ আসন থেকে সংসদ সদস্য নির্বাচিত হয়ে খালেদা সরকারের প্রতিমন্ত্রী হন ফখরুল। প্রথমে কৃষি মন্ত্রণালয়ে এবং পরে বেসামরিক বিমান ও পর্যটন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ছিলেন তিনি।
গত ১৯ মার্চ বিএনপির পঞ্চম কাউন্সিলে অনেকটা অপ্রত্যাশিতভাবেই জ্যেষ্ঠ যুগ্মমহাসচিব পদে ফখরুলকে নিয়ে আসেন খালেদা, যে পদটিতে আগে ছিলেন তার ছেলে তারেক রহমান।
দলের ভবিষ্যৎ কাণ্ডারি তারেকের আস্থায়ই এই পদে ফখরুল এসেছিলেন বলে বিএনপি নেতারা জানান। তবে সরকারবিরোধী গত আন্দোলনে তার ভূমিকা নিয়ে তারেকের অসন্তুষ্টি প্রকাশ পেলেও তার উপরই ভরসা করেছেন খালেদা।


